শেষ কর্মদিবসে বিদ্যালয়ের আয়া শেফালী বেগমকে ঘোড়ার গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। আজ বুধবার দুপুরে নওগাঁ সদর উপজেলার ফতেপুর উচ্চবিদ্যালয়ে
শেষ কর্মদিবসে বিদ্যালয়ের আয়া শেফালী বেগমকে ঘোড়ার গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। আজ বুধবার দুপুরে নওগাঁ সদর উপজেলার ফতেপুর উচ্চবিদ্যালয়ে

ঘোড়ার গাড়িতে ‘শেফালী খালাকে’ রাজকীয় বিদায় দিলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা

শিক্ষকদের ব্যস্ততা, শিক্ষার্থীদের কোলাহল—বিদ্যালয়ের প্রতিদিনের এই চেনা দৃশ্যের আড়ালে ছিলেন শেফালী বেগম। পদে তিনি ছিলেন আয়া। ৩৪ বছর ধরে সেই দায়িত্ব পালন করতে করতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন ‘শেফালী খালা’। কারও টিফিনের খোঁজ নেওয়া, অসুস্থ শিক্ষার্থীকে আগলে রাখা কিংবা ছোটখাটো ভুলত্রুটি মমতা দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া—বিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা ছিল চাকরির চেয়ে অনেক বেশি।

নওগাঁ সদর উপজেলার ফতেপুর (১ম) উচ্চবিদ্যালয়ে আজ বুধবার ছিল শেফালী বেগমের শেষ কর্মদিবস। তাঁর বিদায় উপলক্ষে বিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের। অনুষ্ঠান শেষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি। ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এমন বিদায় পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শেফালী বেগম। কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেক শিক্ষার্থীও।

বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিদায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নূর-ই-আলম মিঠু। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাজ্জাদুল ইসলাম, পরিচালনা কমিটির সদস্য লিটন হোসেন প্রমুখ।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শেফালী বেগম দীর্ঘ ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিত। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তিনি নিজের সন্তানের মতোই দেখতেন। শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নেওয়া, প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো এবং অসুস্থ হলে যত্ন নেওয়ার কারণে তাঁদের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর সখ্য। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল আন্তরিক। দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন নানা কাজের সঙ্গে তিনি জড়িয়ে পড়েছিলেন।

বিদায় অনুষ্ঠানে শেফালী বেগমকে ক্রেস্টসহ বিভিন্ন উপহারসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। আজ বুধবার দুপুরে নওগাঁ সদর উপজেলার ফতেপুর উচ্চবিদ্যালয়ে

বিদায়ী বক্তব্যে সবার কাছে দোয়া চান শেফালী বেগম। বলেন, ‘এত বছর বিদ্যালয়ে কাজ করতে গিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি, সেটিই আমার জীবনের বড় পাওয়া।’

সভাপতির বক্তব্যে নূর-ই-আলম বলেন, ‘শেফালী বেগম শুধু একজন কর্মচারী ছিলেন না, তিনি বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের একজন আপনজন। ৩৪ বছর ধরে তিনি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যে আন্তরিকতা ও মমতা দিয়ে আগলে রেখেছেন, তা অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার।’

বিদায় অনুষ্ঠানে শেফালী বেগমকে উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় নগদ অর্থ ও বিভিন্ন উপহারসামগ্রী। দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে সম্মান জানানো হয়।

আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনার পরের দৃশ্যটিই সবার নজর কাড়ে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা একটি সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে আসেন। তাতে চড়িয়ে শেফালী বেগমকে বাড়ির উদ্দেশে বিদায় দেওয়া হয়। ঘোড়ার গাড়ি যখন বিদ্যালয় ছাড়ছিল, তখন সেটির পাশে ছিল শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ভিড়। কেউ হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছিল, কেউ চোখ মুছছিল। দীর্ঘদিনের পরিচিত মানুষটিকে বিদায় দিতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি অনেকেই।