বিয়ের দীর্ঘ ১৬ বছর পার হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তিন কন্যাসন্তানের পর জন্ম নিয়েছিল একমাত্র ছেলে সাজিদ আল নাহিয়ান। তাকে ঘিরে আনন্দের সীমা ছিল না পারভেজ আহমেদ (সুমন) ও সুলতানা আক্তার দম্পতির। কিন্তু তাঁদের সেই আনন্দ বেশি দিন স্থায়ী হলো না। হাম আক্রান্ত হয়ে মাত্র সাত মাস বয়সেই মা–বাবার কোল খালি করে মারা গেছে শিশুটি।
রাজধানী ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ রোববার সাজিদ আল নাহিয়ানের মৃত্যু হয়। শিশুটির বাবা কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মুন্সিরহাট ইউনিয়নের সিংরাইশ গ্রামের বাসিন্দা। একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে চৌদ্দগ্রাম, ফেনী ও ঢাকাসহ ছয়টি হাসপাতাল ঘুরেছে পরিবারটি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ এপ্রিল সাজিদের প্রথম জ্বর ও সর্দি-কাশি দেখা দেয়। তখন চৌদ্দগ্রাম বাজারের একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলে সে কিছুটা সুস্থ হয়। এরপর ১২ মে শিশুটি আবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে দুই দিন চিকিৎসার পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় প্রথমে ফেনীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ঢাকার শিশু হাসপাতাল ও ন্যাশনাল হেলথ কেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সর্বশেষ তেজগাঁওয়ের ইমপালস হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত করেন, সাজিদ হামে আক্রান্ত। সেখানে অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে দ্রুত আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। আজ সকালে সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়।
সন্তানকে হারিয়ে নির্বাক বাবা পারভেজ আহমেদ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিন মেয়ের পর ১৬ বছর অপেক্ষা করে সাজিদ আমাদের কোলে এসেছিল। ঘরে আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ জ্বর-কাশি হওয়ার পর চৌদ্দগ্রাম, ফেনী, ঢাকাসহ সাতটা হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করেও আমার কলিজার টুকরাকে বাঁচাতে পারলাম না। আমার ছেলের মুখে বাবা ডাকও শুনতে পারলাম না। মনে হচ্ছে আমার সবকিছুই হারিয়ে গেছে।’
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রশিদ আহমেদ তোফায়েল বলেন, শিশু সাজিদ হামের উপসর্গ নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছিল। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় দ্রুত তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। আজ সকালে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় আজ সকাল পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৬৬৫ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় ১০৭ জনের শরীরে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ২১৪ জন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ৭২ জন। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাবে চলতি বছরে হামে আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন মিলে জেলায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ জনে। এর মধ্যে ১ জনের মৃত্যু ল্যাব টেস্টে নিশ্চিত এবং বাকি ৭ জনের মৃত্যু হামের সন্দেহে রেকর্ড করা হয়েছে। সাজিদ আল নাহিয়ানের তথ্য যোগ করলে মৃত্যুর সংখ্যা ৯ জনে দাঁড়াবে। এর মধ্যে ৫ জন মারা গেছে ঢাকায়, বাকি চারজন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে।
এ ছাড়া সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে আরও ৩৫ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩২ জন।
আজ বিকেলে কুমিল্লার সিভিল সার্জন আলী নুর মোহাম্মদ বশীর আহমেদ বলেন, চৌদ্দগ্রামের শিশুটির মৃত্যুর তথ্য তাঁদের আগামীকাল সোমবারের হালনাগাদ তালিকায় যুক্ত হবে। এখনো দাপ্তরিকভাবে বিষয়টি জানতে পারেননি। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ হামের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।