রাষ্ট্রপ্রধানের সফর ঘিরে পাল্টে যায় নগরের চেহারা। অনেকটাই নতুনভাবে সাজে। এর সবচেয়ে বেশি ছাপ পড়ে সড়কে। ভাঙা আর গর্তে ভরা রাস্তাঘাটের মেরামত হয় দ্রুত সময়ের মধ্যে। কার্পেটিংয়ের মাধ্যমে দেওয়া হয় নতুন রূপ। ১৯৮৪ সালেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের চট্টগ্রামে আগমন উপলক্ষে নগরে রাস্তাঘাট সংস্কার করা হয়েছিল। এ জন্য যমুনা অয়েল সরবরাহ করেছিল ১ হাজার টনের বেশি বিটুমিন, যার দাম ছিল ৫৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু ৪২ বছর পরেও বিটুমিনের সেই ৫৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা মূল্য পরিশোধ নিয়ে চিঠি–চালাচালি শেষ হয়নি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও যমুনা অয়েলের মধ্যে। বকেয়া পরিশোধ করতে নতুন করে গত ২১ জুলাই সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছে যমুনা অয়েল পিএলসি।
সিটি করপোরেশনের দাবি, তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানের সফর উপলক্ষে এই ১ হাজার মেট্রিক টন বিটুমিন অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়। তাই টাকা পরিশোধের সুযোগ নেই। অন্যদিকে বকেয়া আদায়ে অনড় যমুনা অয়েল একের পর এক চিঠি দিয়ে যাচ্ছে সিটি করপোরেশনকে। প্রতিষ্ঠানের দাবি, সিটি করপোরেশন ৫৭ লাখ টাকার বকেয়া পরিশোধ না করায় যমুনা অয়েল আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বারবার নিরীক্ষা আপত্তির মুখে পড়েছে।
১৯৮৪ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সফর উপলক্ষে যমুনা অয়েল অনুদান হিসেবে বিটুমিন দিয়েছিল। সিটি করপোরেশনের নথিপত্রে তা–ই লেখা আছে। এখন অনুদান হিসেবে পাওয়া বিটুমিনের জন্য কীভাবে টাকা পরিশোধ করব?মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির চৌধুরী, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত), চসিক।
বকেয়া আদায়ের এ লড়াই দুই প্রতিষ্ঠানের চিঠি–চালাচালিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বকেয়ার বিষয়টি নিয়ে যমুনা অয়েল দ্বারস্থ হয়েছিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়; স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে। মন্ত্রণালয় ও বিপিসি বকেয়া পরিশোধের নির্দেশনা দিয়েছিল। আবার বকেয়ার বিষয় সমাধানে বিপিসি, সিটি করপোরেশন ও যমুনা অয়েলের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠন করা হয়েছিল কমিটিও। এসব পদক্ষেপের পরও টাকা পায়নি যমুনা অয়েল।
১৯৮৪ সালে যখন বিটুমিন সরবরাহ করেছিল যমুনা অয়েল, তখনো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন গঠিত হয়নি। তখন নাম ছিল চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন। এরপর সময় গড়িয়েছে ৪২ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে নগরের রাস্তাঘাটের সংস্কার ও নির্মাণে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে সিটি করপোরেশন। কিন্তু বিটুমিনের ৫৭ লাখ টাকা এখনো পায়নি যমুনা। ১৯৯০ সালে মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে সিটি করপোরেশন প্রতি অর্থবছরে চার থেকে পাঁচ কোটি টাকার বিটুমিন কেনে। সড়ক সংস্কার ও উন্নয়নেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে।
সিটি করপোরেশন ও যমুনা অয়েলের নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (তৎকালীন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন) কাছে বিটুমিন বিক্রির জন্য যমুনা অয়েলকে ১৯৮৩ সালের ২ নভেম্বর নির্দেশ দিয়েছিল বিপিসি। এরপর ১৯৮৪ সালে চার দফায় ১ হাজার ৬৮ মেট্রিক টন বিটুমিন সিটি করপোরেশনের কাছে সরবরাহ করা হয়। তখন প্রতি মেট্রিক টন বিটুমিনের দাম ছিল ৫ হাজার ৪০০ টাকা। এতে মোট দাম ছিল ৫৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
যমুনা অয়েল পিএলসি সূত্র জানায়, বিটুমিন সরবরাহের পর থেকে টাকা পরিশোধে গড়িমসি শুরু করে সিটি করপোরেশন। বারবার চিঠি দিলেও কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। এ কারণে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও বিপিসির দ্বারস্থ হয়েছিল কোম্পানি। দুই মন্ত্রণালয়ও অর্থ পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেয়। এরপরও বকেয়া টাকা পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘদিনের বকেয়া পরিশোধের জন্য গত চার বছরে সিটি করপোরেশনকে তিন দফা চিঠি দেয় যমুনা অয়েল। ২০২২, ২০২৪ ও ২০২৬ সালে এসব চিঠি দেওয়া হয়। এসব চিঠির ভাষা প্রায় একই। সর্বশেষ গত ২১ জুলাই চিঠি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যমুনা অয়েল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়া। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ১৯৮৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার দফায় বিটুমিন সরবরাহ করা হয়েছিল। বারবার তাগাদা সত্ত্বেও ৫৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা এখন পর্যন্ত পরিশোধ করেনি সিটি করপোরেশন।
চিঠিতে জানানো হয়, যমুনা অয়েলের বকেয়া পরিশোধের জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও বিপিসিও তাগাদা দিয়েছিল। ২০২২ সালের মার্চে চিঠি দেওয়া হলেও এরপর কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বিপিসি, সিটি করপোরেশন ও যমুনা অয়েলের প্রতিনিধি নিয়ে কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর সর্বশেষ সভা করলেও বকেয়া আদায়ের কোনো সমাধান হয়নি।
বিটুমিনের এই টাকা পরিশোধ না করায় প্রতিবছর নিরীক্ষা আপত্তি এবং কোম্পানিকে নিরীক্ষকের জবাবদিহির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে চিঠিতে জানান ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, বিটুমিন ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশন দীর্ঘদিন ধরে টাকা পরিশোধ না করায় কোম্পানি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে ১৯৮৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ সেকান্দর হোসেন মিঞা যমুনা অয়েলকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন, পৌর করপোরেশনের তহবিলস্বল্পতা ছিল। তাই তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ চট্টগ্রাম শহর পরিদর্শনের সময় বিভিন্ন সড়ক জরুরি ভিত্তিতে মেরামত কাজের জন্য দুই কোটি টাকা এবং যমুনা অয়েল থেকে ৬০ লাখ টাকার বিটুমিন অনুদান হিসেবে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতির নির্দেশনায় অনুদানের মাধ্যমে পাওয়া যমুনা অয়েল থেকে পাওয়া বিটুমিন দিয়ে রাস্তার উন্নয়নের কাজ শেষ করা হয়।
যোগাযোগ করা হলে সিটি করপোরেশনের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘১৯৮৪ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সফর উপলক্ষে যমুনা অয়েল অনুদান হিসেবে বিটুমিন দিয়েছিল। সিটি করপোরেশনের নথিপত্রে তা–ই লেখা আছে। এখন অনুদান হিসেবে পাওয়া বিটুমিনের জন্য কীভাবে টাকা পরিশোধ করব? এই বকেয়া পরিশোধের কোনো সুযোগ নেই।’
দীর্ঘদিনের বকেয়া পরিশোধের জন্য গত চার বছরে সিটি করপোরেশনকে তিন দফা চিঠি দেয় যমুনা অয়েল। ২০২২, ২০২৪ ও ২০২৬ সালে এসব চিঠি দেওয়া হয়। এসব চিঠির ভাষা প্রায় একই। সর্বশেষ ২১ জুলাই চিঠি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যমুনা অয়েল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়া।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের এই দাবির প্রসঙ্গে যমুনা অয়েল পিএলসির মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) মোহাম্মদ হাসান ইমাম প্রথম আলোকে বলেন, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিটুমিন অনুদান বলা হলেও এর কোনো নথিপত্র যমুনা অয়েলের কাছে নেই। প্রতিষ্ঠানের কাছে যে কাগজপত্র আছে, সেটি হচ্ছে ছাড়ের মাধ্যমে সরবরাহ করার। মূল্যছাড় দিয়ে বিটুমিন সরবরাহ করেছিল তাঁদের প্রতিষ্ঠান। তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন যদি অনুদানের কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারত, তাহলে বিষয়টি মিটমাট হয়ে যেত। কিন্তু তারা তা দেখাতে পারেনি। তবে চসিকের কর্মকর্তারা দাবি করেন, অনুদানের কাগজ আছে।’
বিটুমিনের এই বকেয়া টাকার বিষয়টি দুই সংস্থার আরও আগে নিষ্পত্তি করা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন সচেতন নাগরিক কমিটি-টিআইবির চট্টগ্রামের সভাপতি দেলোয়ার মজুমদার। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকার কথা জানিয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৌখিক নির্দেশে নগরের রাস্তাঘাট সংস্কারের জন্য এই বিটুমিন সরবরাহ করেছিল যমুনা অয়েল। স্বৈরাচারী সরকারের সময় যেটি হয়, এ ক্ষেত্রেও তা–ই হয়েছে। রাষ্ট্রপ্রধান মৌখিক নির্দেশ দিলেও কোনো লিখিত নির্দেশনা ছিল না। ফলে যমুনা অয়েল মনে করেছে এটি বিক্রি করা পণ্য। অন্যদিকে চসিক মনে করেছে অনুদান। দেলোয়ার মজুমদার আরও বলেন, ‘পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে দুই প্রতিষ্ঠানের এই ঠান্ডা লড়াই চলছে। বারবার নিরীক্ষা আপত্তি উঠছে। বর্তমানে যমুনা অয়েল লাভজনক প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। তাই এটি বিবেচনা নিয়ে যমুনা অয়েল এই বকেয়া মওকুফ করে দিতে পারে। অবশ্য দুই মন্ত্রণালয়কে এ উদ্যোগ নিতে হবে। এটি আসলে সহজে সমাধানযোগ্য বিষয়। তারপরও হচ্ছে না।’