শহীদ মোহাম্মদ ওয়াসিম
শহীদ মোহাম্মদ ওয়াসিম

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান

দেয়ালে ওয়াসিমের সেই ফেসবুক স্ট্যাটাস ‘চলে আসুন ষোলোশহর’

ফ্রেমে বাঁধাই করা লাল পটভূমিতে শহীদ মোহাম্মদ ওয়াসিমের ছবি। তার পাশে ‘ওয়াসিম আকরাম’ নামে তাঁর ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট করা জুলাই আন্দোলন–বিষয়ক পাঁচটি স্ট্যাটাস। ফ্রেমে বাঁধিয়ে সেটি ঝোলানো হয়েছে দেয়ালে। ছোট হরফ হলেও পড়তে কষ্ট হলো না। সেখানে জ্বলজ্বল করছিল ওয়াসিমের সর্বশেষ স্ট্যাটাসটিও। তিন শব্দের একটা আহ্বান। যেন আর বেশি কিছু লেখার নেই। যেন তাঁর অনেক তাড়া ছিল। ‘চলে আসুন ষোলোশহর।’ পড়তে গিয়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল দুই বছর পরও। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই এ স্ট্যাটাসটি পোস্ট করার কয়েক ঘণ্টা পর চট্টগ্রামের ষোলোশহরে কোটাবিরোধী আন্দোলনে গুলিতে নিহত হন ওয়াসিম।

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মেহেরনামার বাজারপাড়া এলাকায় উচ্চবিদ্যালয়ের পাশ ঘেঁষে চলে যাওয়া ইট বিছানো সড়কের শেষ বাড়িটি ওয়াসিমদের। পাকা একতলা বাড়ির আশপাশের সড়ক এখনো বন্যার পানিতে ডুবে আছে। গত মঙ্গলবার পানি মাড়িয়ে বাড়িটিতে গেলে কথা বলতে আসেন ওয়াসিমের মা জোসনা বেগম। ড্রয়িংরুমের হাতের ডানে একটি টেবিল। সেই টেবিলে সারি সারি করে সাজানো আছে ১৮-২০টি ক্রেস্ট। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার পক্ষ থেকে ওয়াসিমের বীরত্বপূর্ণ অবদানের দিয়েছে সেসব। সেই ক্রেস্টগুলোর ওপরে হাত রেখে ওয়াসিমের মা বললেন, ‘আজকাল ছেলের কথা খুব বেশি মনে পড়ে। ২০২৩ সালেও এবারের মতো বন্যা হয়েছিল। তখন ছেলে কলে থেকে ছুটে আসে। পানি মাড়িয়ে বাজার–সদাই করা থেকে শুরু করে সবই করেছে সে। এবারের বন্যায় সে নেই।’

টেবিলজুড়ে ক্রেস্ট সাজানো। সেই ক্রেস্ট ছুঁয়ে শহীদ মোহাম্মদ ওয়াসিমের স্মৃতি খুঁজে ফেরেন মা জোসনা বেগম। গত মঙ্গলবার বিকেলে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মেহেরনামা বাজারপাড়ায় মোহাম্মদ ওয়াসিমের গ্রামের বাড়িতে

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটাবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামের ষোলোশহর এলাকায় মোহাম্মদ ওয়াসিম শহীদ হন। তিনি তখন চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। দুই ভাই তিন বোনের মধ্যে ওয়াসিম ছিলেন দ্বিতীয়। ২০১৭ সালে পেকুয়ার মেহেরনামা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ২০১৯ সালে চট্টগ্রামের বাকলিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। পরে অনার্সে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন। মারা যাওয়ার সময় তিনি তৃতীয় বর্ষের ফলপ্রত্যাশী ছিলেন।

ওয়াসিমের মা জোসনা বেগম বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে চট্টগ্রাম থেকে একজন ফোন করে বলেছে, ১৬ জুলাই ওয়াসিমের শাহাদাতবরণ উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান হচ্ছে। সেখানে পরিবারের পক্ষে আমাকে ও তাঁর বাবাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর পর থেকে আমার ছেলের কথা খুব মনে পড়ছে। এ জন্য তাঁর স্মৃতিবিজড়িত ক্রেস্টগুলো হাতে ছুঁয়ে দেখছি।’ ওয়াসিমের ছবি আছে এমন কিছু দেখলেই ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছা করে মায়ের। তবে এরপর ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। সবটাই শূন্য মনে হয়। জোসনা বেগম জানালেন, রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না তিনি। বারবার ঘুম ভেঙে যায়। জেগে উঠে মনে হয় ওয়াসিম এসেছে। আবার ভুল ভাঙে। সারা শরীর যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায় তাঁর।

শহীদ মোহাম্মদ ওয়াসিমের ছবিগুলোই এখন মায়ের বড় সম্পদ

ওয়াসিমের এক বোনের বিয়ে হয়েছে। আরেক বোন সাবরিনা ইয়াসমিন চট্টগ্রামের একটি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। বন্যার আগে বাড়িতে এসে আটকে পড়েন তিনি। সাবরিনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে ওয়াসিমের শহীদ হওয়ার দিনটির প্রসঙ্গে ওঠে। সাবরিনা বলেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর স্টেশনে বিক্ষোভ করার কথা ছিল কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের। সে জন্য সকালেই ভাইয়া ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ছাত্র-জনতাকে ষোলোশহর এলাকায় আসতে অনুরোধ করেন। বেলা সাড়ে তিনটায় ওই কর্মসূচি শুরুর আগেই স্টেশনে অবস্থান নিয়েছিল যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। তাঁদের হাতে ছিল লাঠিসোঁটা, পাথর আর অস্ত্র। সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়ে ভাইয়াসহ তিনজন শহীদ হন। সাবরিনা বলেন, ‘গণতন্ত্রের জন্য আমার ভাই জীবন দিয়েছেন। তাঁর শাহাদাতবরণের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। এখন গণতান্ত্রিক দেশে আমার ভাইয়ের হত্যাকারীদের বিচার চাই।’

শহীদ মোহাম্মদ ওয়াসিমের দেওয়া শেষ স্ট্যাটাস

গত ১৩ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমান ওয়াসিমের কবর জিয়ারত করেছেন এবং ওয়াসিমের মা-বাবাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। ওই সময় মা জোসনা বেগম প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটা দাবিই করেছিলেন, তাঁর ছেলে হত্যার বিচার যেন তাড়াতাড়ি হয়।

ওয়াসিমের মা ও বোনের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন তাঁর বাবা শফিউল আলম দেড় কিলোমিটার দূরে একটি মাছের ঘেরে কাজ করছিলেন। সেখানে গেলে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। শফিউল আলম বলেন, ‘দিনের যেকোনো একটা সময় আমি ওয়াসিমের কবরের পাশে যাই। আমার ছেলের সঙ্গে কথা বলি। তখন তাঁকে ছেড়ে আসতেই ইচ্ছা করে না। আমার ছেলে যেন বলে বাবা আমাকে ছেড়ে যেও না।’ তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে জীবন দিয়ে দেশকে বাঁচিয়ে গিয়েছে। আমাদের গর্বিত করেছে। এখন আমাদের চাওয়া একটাই, ওয়াসিমসহ সব শহীদের হত্যাকারীদের বিচার। এটি হলে আমরা শান্তি পাবো।’