
মো. শামসুল ইসলাম জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন। তিনি নেত্রকোনা সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক।
ক্লাসে ঢুকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। কেউ প্রশ্ন করলে মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তারপর উত্তর দেন। প্রয়োজন হলে কম্পিউটার চালান, প্রজেক্টরে পাঠ দেখান। প্রতিদিন তিন থেকে চারটি ক্লাস নেন। দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা তাঁকে শিক্ষকতা থেকে থামাতে পারেনি। বরং প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিদিন পাঠদানের নতুন পথ খুঁজে নেন তিনি।
মো. শামসুল ইসলাম (৩৫) জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন। তিনি নেত্রকোনা সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক। শামসুল ইসলাম মনে করেন, নিজেকে দুর্বল ভাবলে মানুষ নিজের মধ্যেই আটকে যায়। তাই দৃষ্টিশক্তি না থাকাকে তিনি নিজের সামর্থ্যের সীমা হিসেবে দেখেননি।
জামালপুর সদর উপজেলার রণরামপুর গ্রামের কৃষক মো. মোবারক আলী ও গৃহিণী প্রয়াত সাজেদা খাতুনের ছয় সন্তানের মধ্যে তৃতীয় শামসুল ইসলাম। জন্মের পর থেকেই দৃষ্টিশক্তি নেই তাঁর। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েও ফল পাওয়া যায়নি। পরিবারের অর্থাভাবে শামসুলকে ঢাকার একটি মিশনারি স্কুলে এসে পড়তে হয়। সেখানে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। এরপর ভর্তি হন ময়মনসিংহ এডওয়ার্ড ইনস্টিটিউশনে। সেখান থেকে ২০০৬ সালে এসএসসি পাস করে ভর্তি হন ময়মনসিংহ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম কলেজে। উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর শামসুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান। ২০১২ সালে সিজিপিএ–৩.২৯ পেয়ে স্নাতক এবং পরের বছর ৩.৭৬ পেয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি।
৩৬তম বিসিএস থেকে শিক্ষা ক্যাডারে ইতিহাস বিভাগে তৃতীয় হন শামসুল ইসলাম। ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।
দীর্ঘ এই যাত্রা বেশ কঠিন ছিল বলে জানান শামসুল ইসলাম। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পড়াশোনায় বড় ভাই কামরুল হাসান সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছেন বলে জানান তিনি।
তিনি সবকিছু দেখেন মন দিয়ে
শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন শামসুল ইসলাম। তাই অন্য কোনো চাকরিতে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেননি বলে জানান তিনি। তাঁর বিসিএসের প্রস্তুতিও ছিল অন্য রকম। বিশ্ববিদ্যালয়ে জুনিয়ররা তাঁকে বই পড়ে শোনাতেন এবং তা রেকর্ড করে দিতেন। পরে কম্পিউটার ও মুঠোফোনে শুনে শুনে পড়া আত্মস্থ করতেন। লিখিত পরীক্ষায় শ্রুতলেখকের মাধ্যমে তিনি অংশ নেন।
শামসুল ইসলামকে আমরা কখনো তাঁর দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতা দিয়ে বিচার করি না। তিনি যেভাবে নিজের কাজ করেন, তাতে অনেক সময় মনে হয়, তাঁকে সহযোগিতা করার চেয়ে তাঁর কাছ থেকেই আমরা শিখছি।অধ্যাপক মো. কবির উদ্দিন, নেত্রকোনা সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রধান
৩৬তম বিসিএস থেকে শিক্ষা ক্যাডারে ইতিহাস বিভাগে তৃতীয় হন শামসুল ইসলাম। ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে চার বছর শিক্ষকতা করার পর ২০২২ সালের ২৮ আগস্ট থেকে নেত্রকোনা সরকারি কলেজে কর্মরত আছেন। তিনি বলেন, মৌখিক পরীক্ষায় প্রায় ৪০ মিনিট ধরে তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। সদস্যরা শুরুতে তাঁর সক্ষমতা নিয়ে কিছুটা সংশয়ে ছিলেন। পরে তাঁর একাডেমিক ফলাফল ও বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানের গভীরতা দেখে সেই সংশয় কেটে যায়।
২০১২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পাশের গ্রাম শ্রীপুর কুমারিয়ায় আসমা খাতুনকে বিয়ে করেন শামসুল ইসলাম। তাঁদের সংসারে তিন ছেলে আছে। আসমা খাতুন বলেন, ‘সংসারের প্রায় সব কাজই তিনি নিজে করতে পারেন। সন্তানদের প্রয়োজনীয় বেশির ভাগ কাজও তিনি করেন। চোখে দেখতে না পারলেও তিনি মন দিয়ে সবকিছু দেখতে পারেন। তাঁর মেধা প্রখর, চিন্তাভাবনাও ইতিবাচক।’
সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের কাছেও শামসুল ইসলামের আলাদা গ্রহণযোগ্যতা আছে। নেত্রকোনা সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. কবির উদ্দিন বলেন, ‘শামসুল ইসলামকে আমরা কখনো তাঁর দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতা দিয়ে বিচার করি না। তিনি যেভাবে নিজের কাজ করেন, তাতে অনেক সময় মনে হয়, তাঁকে সহযোগিতা করার চেয়ে তাঁর কাছ থেকেই আমরা শিখছি। নিজের সীমাবদ্ধতাকে কখনো অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেন না তিনি।’