পুশ ইন শঙ্কায় কুমিল্লার সীমান্তে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছেন বিজিবির সদস্যরা। মঙ্গলবার কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কটক বাজার এলাকায় গোমতী নদীর পাড়ে
পুশ ইন শঙ্কায় কুমিল্লার সীমান্তে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছেন বিজিবির সদস্যরা। মঙ্গলবার কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কটক বাজার এলাকায় গোমতী নদীর পাড়ে

পুশ ইনের শঙ্কায় কুমিল্লা সীমান্তে বিজিবির বাড়তি সতর্কতা, বেড়েছে টহল-নজরদারি

কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কটক বাজার এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ভারত থেকে প্রবাহিত গোমতী নদী। নদীর এপারে বাংলাদেশ, ওপারে ভারত। বর্ষার আগমনী আবহ থাকলেও নদীতে এখনো পানি কম। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ‘পুশ ইনের’ ঘটনা ঘটায় গোমতীকে ঘিরে টহল বাড়িয়েছে বিজিবি।

মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে কটক বাজার সীমান্তে গিয়ে দেখা যায়, গোমতীর তীরজুড়ে বিজিবি সদস্যদের তৎপরতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। নদীর পাড়, ঝোপঝাড়, চলাচলের সম্ভাব্য পথ—সবখানেই নজরদারি চলছে। কিছুক্ষণ পরপর টহল দল সীমান্ত এলাকা ঘুরে দেখছে। অপরিচিত কাউকে দেখলে পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে। পাশের গাজীপুর সীমান্ত এলাকায় গিয়েও একই দৃশ্য চোখে পড়ল।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ‘পুশ ইনের’ ঘটনা ঘটায় কুমিল্লা সীমান্তেও সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। যদিও এ বছর কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবু সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে বিজিবিকে।

সরেজমিনে গোমতী নদীকে ঘিরেই বিজিবি সদস্যদের সবচেয়ে বেশি সতর্কতা দেখা গেছে। কারণ, কুমিল্লায় বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তের প্রায় সবখানে কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও নদীপথে কোনো বেড়া নেই। নদীতে বর্তমানে পানি কম থাকায় অনেক স্থানে হেঁটেই পার হওয়া সম্ভব। এ জন্য অনুপ্রবেশ বা পুশ ইন ঠেকাতে তৎপর বিজিবি।

কটক বাজারে দায়িত্বরত বিজিবির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সীমান্তের অধিকাংশ স্থানে এখন কাঁটাতারের বেড়া আছে। দিনের বেলায় কাউকে ঠেলে পাঠানো সহজ নয়। কিন্তু নদীর মধ্যে কোনো বাধা নেই। পানি কম থাকায় পারাপারও তুলনামূলক সহজ। এ কারণে দিনে ও রাতে নদীপথের প্রতি বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। শুধু নদীর পাড় নয়, আশপাশের জঙ্গল ও আড়াল হতে পারে—এমন এলাকাতেও বিজিবি সদস্যরা অবস্থান করছেন।

কুমিল্লার ৫টি উপজেলার প্রায় ১২০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা। এর মধ্যে বিজিবির কুমিল্লা ব্যাটালিয়ন (১০ বিজিবি) আদর্শ সদর উপজেলার বড় একটি অংশ এবং কুমিল্লা সদর দক্ষিণ ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলা অংশে দায়িত্ব পালন করে। আদর্শ সদর উপজেলার একাংশ এবং বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা অংশে দায়িত্ব পালন করে সুলতানপুর ব্যাটালিয়ন (৬০ বিজিবি)। বর্তমান পরিস্থিতিতে জেলার পাঁচটি উপজেলার সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

বিজিবির বিবির বাজার বিওপির ইনচার্জ সুবেদার মো. কলিমুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, দিন-রাত এক করে বিজিবি সদস্যরা সীমান্তে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের বিওপির আওতায় তিনটি বিজিবি পোস্ট রয়েছে; সেগুলোর সদস্যরাও পালাক্রমে সীমান্তে দায়িত্ব পালন করছেন। দিনের পাশাপাশি রাতেও তাঁরা সতর্ক থাকছেন। গোমতী নদীর ওপারে সীমান্ত এলাকা হওয়ায় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত পুশ ইনের কোনো চেষ্টা এই এলাকা দিয়ে হয়নি।

কুমিল্লা সীমান্তের সবচেয়ে স্পর্শকাতর এলাকাগুলোর একটি গোলাবাড়ী। গাজীপুর গ্রামের ঠিক বিপরীতে আদর্শ সদর উপজেলার এই গ্রামটি একসময় মাদক পাচারের জন্য পরিচিত ছিল। ২০২৩ সালে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পর পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন আসে। তবে সতর্কতার মধ্যেও ২০২৫ সালের ২২ মে নারী, পুরুষ, শিশুসহ ১৩ জনকে এই সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠায় বিএসএফ। সেই ঘটনার পর থেকেই গোলাবাড়ী সীমান্তকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

গোলাবাড়ী পোস্টে গিয়ে দেখা যায়, বিজিবির সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে দায়িত্ব পালন করছেন। সীমান্তের প্রতিটি গতিবিধি পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।

এদিকে শুধু বিজিবি সদস্যরাই নন, সীমান্তবাসীর মধ্যেও বর্তমান পরিস্থিতিতে একধরনের উদ্বেগ দেখা গেছে। গাজীপুর এলাকার গোমতীপাড়ের বাসিন্দা হারুনুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা শান্তিতে বসবাস করতে চাই। বিভিন্ন জায়গার ঘটনা শুনে মানুষ ভয় পায়। তবে এখন সীমান্তে বিজিবির সদস্যদের তৎপরতা অনেক বেড়েছে। দিন-রাত টহল দিতে দেখি। এতে কিছুটা ভরসা পাই। এরপরও দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকার খবর আমাদের মনে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।’

বিজিবির কুমিল্লা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর আলী এজাজ প্রথম আলোকে বলেন, চলতি বছরে কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে পুশ ইনের ঘটনা ঘটেনি। তবে দেশের বিভিন্ন এলাকার পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। টহল দ্বিগুণ করা হয়েছে। দিনে-রাতে সমান গুরুত্ব দিয়ে নজরদারি পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ জোরদার করা হয়েছে।