কুষ্টিয়ায় পদ্মার পানিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী

পদ্মা নদীর পানি বাড়ায় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার দুটি ইউনিয়নের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে আশপাশের গড়াই নদসহ বিভিন্ন নদী ও খাল-বিলের পানিও বাড়ছে।

পদ্মার পানি বাড়ার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দৌলতপুর উপজেলার চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের মানুষ। এ দুই ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানরা জানিয়েছেন, দুটি ইউনিয়নের ৩৫টি গ্রামে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ৩৫ হাজার ও চিলমারী ইউনিয়নের ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী আছেন। ইউনিয়ন দুটির অধিকাংশ সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। জরুরি প্রয়োজনে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মানুষকে।

রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ইনসাফনগর গ্রামের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এলাকার সব ডুইবি গিছে। বাড়ির উঠানে ও বাইরে পানি। যেগুলো মাটি তুলি উঁচু করা সেগুলোতে পানি কম ডুকছে। আমাদের বাড়ি উঁচু। কিন্তু চারপাশে পানি। রাস্তাঘাট ভাঙ্গি গিছে। রাতে পানি বেশি বাড়ছে। গত দুই–তিন দিন ধইরি পানি বাইড়িছে।’

পদ্মার পানি ঢুকেছে লোকালয়ে। শুক্রবার কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের চিলমারী ইউনিয়নের চিলমারী এলাকায়

শুক্রবার দুপুরে জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা বলেন, ভারতে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি বেড়ে গেছে। আগামী ২৪ ঘণ্টা আরও একটু পানি বাড়বে। এরপর পানি কমতে পারে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক, শিক্ষা ও আইসিটি এবং উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) মো. মিজানুর রহমান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, পানি বাড়ার কারণে গত কয়েক দিনে ২০টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। প্রতিনিয়ত খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।

কুষ্টিয়ার পাউবো সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল নয়টা থেকে শুক্রবার সকাল নয়টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হার্ডিঞ্জ সেতু পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি বেড়েছে ১৬ সেন্টিমিটার। এখানে পানির উচ্চতা ছিল ১৩ দশমিক শূন্য ২ সেন্টিমিটার। পানির বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ সেন্টিমিটার। বিপৎসীমা থেকে ৭৮ সেন্টিমিটার নিচে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। জরুরি ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত খোঁজ রাখা হচ্ছে। শুকনা খাবার, ওষুধ ও মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত রয়েছে।
অনিন্দ্য গুহ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, দৌলতপুর
পদ্মার পানি বাড়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত। গতকাল বিকেলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর চর এলাকায়

চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানি বাড়ায় বিষধর সাপের উপদ্রব বেড়েছে। ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন অনেকে।
এদিকে পানি বাড়ায় চরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে গুজব ছড়িয়েছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, চরাঞ্চলের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা বা পাঠদান স্থগিত করা হয়নি। এ রকম কোনো সিদ্ধান্তও হয়নি। যে তথ্য ছড়িয়েছে, তা গুজব ও বিভ্রান্তিকর।

শুক্রবার বিকেলে রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ইউনিয়নের ১৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সড়কগুলো ডুবে যাওয়ায় স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক বাড়ির ভেতরে পানি না ঢুকলেও বসতভিটা পর্যন্ত পানি উঠেছে। পানির দুর্ভোগের পাশাপাশি সাপের আতঙ্কেও মানুষ দিশাহারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পানি বেড়ে যাওয়ায় চরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সড়কগুলো তলিয়ে যাওয়ায় নৌকায় ও ভেলায় চলাফেরা করছেন মানুষ। গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। প্লাবিত হয়েছে ফিলিপনগর, মরিচা, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর এলাকার ফসলি জমি। এতে রোপা আমন ধান, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পদ্মা নদীর পানি বেড়ে নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের ফিলিপনগর চর এলাকায়

কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) মো. আসফাউদদৌলা প্রথম আলোকে বলেন, পদ্মার পানি বাড়ছে। আগামীকাল (আজ শনিবার) পর্যন্ত আরেকটু পানি বাড়বে। এর পর থেকে পানি কমতে থাকবে।

যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন প্রস্তুত আছে উল্লেখ করে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। জরুরি ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত খোঁজ রাখা হচ্ছে। শুকনা খাবার, ওষুধ ও মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত রয়েছে।

উপজেলা কৃষি বিভাগের হিসাবে, নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। পানি আরও বাড়লে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন বলেন, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কৃষি পরামর্শ দেওয়া হবে।