৩৮ বছর ধরে মাটিই জীবিকা রেজাউলের

এভাবে ঠেলাগাড়িতে করে মাটি এনে বিক্রি করেন রেজাউল ঢালী। গতকাল রোববার খুলনা শহরের নিরালা মোড় এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

বিকেলের শেষ ভাগ। খুলনা শহরের নিরালা মোড় এলাকায় তখন মানুষের ভিড়। সড়কটির একটি বহুতল ভবনের সামনে কাজে ব্যস্ত রেজাউল ঢালী। একটি ঠেলাগাড়িতে ভেজা মাটির চাঁই (টুকরা) থরে থরে সাজানো। সেখান থেকে চাঁইগুলো নামিয়ে বহুতল বাড়িটির নিচতলার গ্যারেজের মধ্যে রাখছিলেন তিনি। এ কাজে কোনো সহযোগী নেই তাঁর।

রেজাউল ঢালীর রোদে পোড়া শরীরটা বেশ জীর্ণশীর্ণ। মুখের কোণে লেগে আছে হাসি। কাজের ফাঁকে কথা বলতে নেই বিরক্তি। ৫৫ বছর বয়সী এই শ্রমজীবী বলেন, ‘৩৮ বছর ধরে এভাবে মাটি বিক্রির কাজ করছি। একসময় অনেকে মিলে এ কাজ করতাম। অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। এখন আমরা মাত্র ১২ জন কাজ করি। সবাই একসঙ্গে মাটি কিনি, একসঙ্গে বিক্রি করি।’

সাধারণত গাছ লাগানো, চুলা ও পূজার প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহৃত হয় এ মাটি। গ্রামের বিভিন্ন বিল থেকে মাটি সংগ্রহ করেন রেজাউল ঢালী ও তাঁর সহকর্মী শ্রমজীবীরা।
২৫ বছর আগে প্রতি চাঁই মাটি ৫০ পয়সা করে বিক্রি করেছেন। এখন প্রতি চাঁই মাটি বিক্রি করছেন পাঁচ টাকায়।

রেজাউল ঢালী বলেন, আগে মাটির ব্যাপক চাহিদা ছিল, অনেকেই মাটির ঘর তৈরি করতে মাটি কিনতেন। এখন সেই চাহিদা নেই। মাটিও কম পাওয়া যায়। এখন গাছ লাগানোসহ বাড়ির টুকটাক কাজ করার জন্য মাটি কেনেন মানুষ।

রেজাউল ঢালীর গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জে। তাঁর বয়স যখন আট বছর, তখন ছেলেমেয়েদের নিয়ে খুলনায় আসেন তাঁর বাবা।

রেজাউল ঢালীর বয়স যখন ১৩ বছর, তখন তাঁর বাবা মারা যান। এরপর বাধ্য হয়ে দিনমজুরি শুরু করেন রেজাউল। কোনো কোনো দিন পেতেন আটআনা, আবার কোনো কোনো দিন এক টাকা। এভাবে চলে গেছে আরও কয়েক বছর। দিনমজুরি করতে করতেই ভিড়ে যান মাটি বিক্রির দলের সঙ্গে। প্রথম দিকে অন্যের সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। পরে নিজেই ঠেলাগাড়ি কিনে তাতে করে মাটি বিক্রি শুরু করেন।

রেজাউল ঢালী বলেন, এক ঠেলাগাড়িতে ৩০০ কোদালের মতো মাটি ধরে। ওই মাটি বিক্রি করে লাভ থাকে ৬০০ টাকা—যা দিয়ে চার ছেলে-মেয়েসহ ছয়জনের সংসার চলে যাচ্ছে।

গতকাল রোববার ঠেলাগাড়িতে যে মাটি নিয়ে এসেছেন, সেটি বটিয়াঘাটা উপজেলার রাঙ্গেমারী বিলের।

তাঁরা ১২ জন বিলের মাটি বিক্রি করেন জানিয়ে রেজাউল ঢালী বলেন, আমন মৌসুমের ধান উঠে যাওয়ার পর অনেকের সেই জমিতে বোরো চাষ করার আগ্রহ থাকে। তখন জমির মালিক জমিতে পানি ধরে রাখার জন্য মাটি কেটে কিছুটা নিচু করে রাখতে চান। সেই সুযোগটিই নেন তাঁরা। যেদিন মাটি কাটা হবে, তার আগের দিন বিকেলে ওই জমি পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর ভোরের দিকে সবাই একসঙ্গে গিয়ে মাটি কেটে ঠেলাগাড়িতে সাজিয়ে শহরে নিয়ে আসেন বিক্রির জন্য। যাঁরা অগ্রিম বলে রাখেন, তাঁদের মাটি সরবরাহ করেন। এ ছাড়া ঠেলাগাড়ি নিয়ে শহরের মধ্যে ঘুরে ঘুরেও মাটি বিক্রি করেন।

দুই মাস আগে রাঙ্গেমারী বিলের এক বিঘা জমির উপরিভাগের মাটি ৮০ হাজার টাকায় কিনেছিলেন তাঁরা ১২ জন। রেজাউল ঢালী বলেন, জমির মালিককে টাকা একবারে দিতে হয় না। মাটি বিক্রি করে ধীরে ধীরে টাকা পরিশোধ করেন। এ কারণে চাপও কম।