
জামালপুরের সড়ক পরিবহনব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে রাজিব পরিবহনের একক আধিপত্যের অভিযোগ আছে। স্থানীয় একাধিক যাত্রীর দাবি, এ কারণে জেলার গুরুত্বপূর্ণ পথে অন্য পরিবহনের বাস চলাচলের সুযোগ নেই বললেই চলে। ফলে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জেলার বাস মালিক সমিতির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত রাজিব পরিবহনের বাসে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। এর প্রতিবাদে পরিবহনটির বাস চলাচল বন্ধের দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন ছাত্রশক্তি, যুবশক্তিসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সেখানে পরিবহনশ্রমিকদের অর্ধশত লোকজন হামলা চালিয়ে প্রতিবাদকারীদের মারধর করেন। এতে কয়েকজন আহত হন।
এর আগে গতকাল সকাল থেকে রাজিব পরিবহনসহ জেলার বিভিন্ন পথে বাস চলাচল বন্ধ করে দেন পরিবহনশ্রমিকেরা। পরে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকেরাও ধর্মঘটে যোগ দেন। ফলে জেলার অভ্যন্তরীণ পরিবহনব্যবস্থাও প্রায় অচল হয়ে পড়ে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ মাসে রাজিব পরিবহনের বাসে অন্তত আটটি সড়ক দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত ও ৩৫ জন আহত হয়েছেন।
সর্বশেষ গত সোমবার রাতে সদর উপজেলার লাহিড়ীকান্দা এলাকায় রাজিব পরিবহনের বাস ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে বাসটির সহকারীসহ চারজন নিহত হন। এর আগে রাজিব পরিবহনের বাসের সঙ্গে অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ভটভটি ও ট্রাকের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
স্থানীয় একাধিক যাত্রীর অভিযোগ, রাজিব পরিবহনের বাসগুলো অতিরিক্ত গতিতে চলাচল করে। যত্রতত্র বাস থামানো, চালকদের দায়িত্বহীনতা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। এসব বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জামালপুর শহরের বাসিন্দা আতিকুর রহমান বলেন, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।
সর্বশেষ দুর্ঘটনার পর রাজিব পরিবহনের বাস চলাচল বন্ধের দাবিতে ‘ছাত্র-জনতা’র ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়। গত বুধবার নান্দিনা বাজার এলাকায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন স্থানীয় লোকজন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটলেও বাস কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
গতকাল দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন চলাকালে পরিবহনশ্রমিকদের অর্ধশত লোকজন সেখানে হামলা করেন বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের মারধর করা হয়। সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এদিকে আন্দোলনের সময় রাজিব পরিবহনের দুটি বাস আটকে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া, চালক ও সহকারীদের মারধর এবং বাস ভাঙচুরের অভিযোগ করেন পরিবহনশ্রমিক নেতারা।
জামালপুর–ঢাকা রুটে ময়মনসিংহ হয়ে রাজিব পরিবহনের ৫৫–৬০টি বাস চলাচল করে। এর বাইরে বিআরটিসি, শেরপুর ট্রাভেলসসহ হাতে গোনা কয়েকটি বাস চলাচল করে। এ ছাড়া আন্তজেলা বাস টার্মিনাল (স্থানীয়ভাবে টাঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ড নামে পরিচিত) থেকে টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকায় বিভিন্ন নামে প্রায় ৫০টি বাস চলে। তবে এসব বাসের অধিকাংশের সেবার মান নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগ আছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এই রুটের পরিবহনব্যবস্থায় রাজিব পরিবহনের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
স্থানীয় যাত্রীদের অভিযোগ, বিকল্প পরিবহনের সুযোগ সীমিত থাকায় রাজিব পরিবহনের ওপরই নির্ভর করতে হয় তাঁদের। এই পরিবহনের প্রভাবের কারণে অন্য পরিবহনগুলোকে চলাচলের অনুমতি ও সুযোগ দেওয়া হয় না। ফলে যাত্রীদের গুটিকয় পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে রাজিব পরিবহনের বাস বন্ধ হয়ে গেলে পুরো জেলার পরিবহনব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ে।
রাজিব পরিবহনের বাসের দুর্ঘটনা ও পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকদের লাইসেন্স ও মাদকাসক্তি পরীক্ষা, যত্রতত্র বাস থামানো বন্ধ এবং নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন।
আরিফুল ইসলাম নামের একজন ফেসবুকে লিখেছেন, অন্য সড়কগুলোতে এত ঘন ঘন বাস দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায় না। অথচ জামালপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে ঢাকায় চলাচলকারী রাজিব পরিবহনের বাসের দুর্ঘটনার খবর যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
রবিউল ইসলাম নামের আরেকজন মন্তব্য করেছেন, আগের সরকারের সময়ও অভিযোগ ছিল, কয়েকজন নেতার নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি পরিবহন সিন্ডিকেটের কারণে রাজিব পরিবহন ছাড়া অন্য বাস চলাচলের সুযোগ দেওয়া হতো না। তাঁর প্রশ্ন, সরকারের পরিবর্তনের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই সিন্ডিকেট কি এখনো সক্রিয়?
আহসান হাবিব নামের একজন লিখেছেন, দুর্ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে সাধারণ ছাত্র-জনতা আন্দোলন করছেন, অথচ উল্টো তাঁদের বিরুদ্ধেই থানায় অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে।
রাজিব পরিবহন বাস পরিচালনা করেন জামালপুর জেলা বাস মালিক সমিতি। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জামালপুর জেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে চালক ও শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আরও যেসব সমস্যা আছে, সেগুলো সমাধান করে রাজিব পরিবহনের আধুনিকায়ন করা হবে।
জামালপুরে আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব বাস সার্ভিস নামানোর পরিকল্পনা ও উদ্যোগ ইতিমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ময়মনসিংহ হয়ে ঢাকায় চলাচলকারী রুটে এসি বাস চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজিব পরিবহনের ফিটনেসবিহীন বাসগুলো বাতিল করা হয়েছে। মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানোও বন্ধ করা হবে। পাশাপাশি বাসে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে নিরাপত্তা ও গতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম আব্দুল্লাহ-বিন-রশিদ বলেন, রাজিব পরিবহনের বাসসেবা নিয়ে পরিবহনশ্রমিক নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। সেখানে যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি উঠে এসেছে। বাসসেবা কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় উঠে আসা অন্য সমস্যাও সমাধানের চেষ্টা করা হবে।