
ভাগ্যবদলের আশায় ধারদেনা করে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যুবক কামরুল হাসান (৩৮)। কিন্তু দালালের প্রতারণায় সেই স্বপ্ন থমকে গেছে। পরিবারের দাবি, কামরুলকে জোর করে রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল। পরে সৈন্যশিবির থেকে পালাতে গিয়ে আটক হন ইউক্রেনীয় সেনাদের হাতে। বর্তমানে ইউক্রেনের একটি কারাগারে বন্দী আছেন। আর তাঁর দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন স্ত্রী-সন্তান।
কামরুল হাসান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার লাউরফতেহপুর ইউনিয়নের লাউরফতেহপুর গ্রামের মৃত হাসেম মুন্সীর ছেলে। গ্রামের বাড়িতে স্ত্রী নাজমীন আক্তার ও ছয় বছর বয়সী মেয়ে তায়েব্যা নূর থাকে। স্বামীর ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে তাঁর জীবিত থাকার অনিশ্চয়তায় নাজমীন।
পরিবারের ভাষ্য, ১২ বছর সিঙ্গাপুরে কাজ করার পর গত বছর দেশে ফিরেছিলেন কামরুল। পরে রাশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেখেন। বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করেছিলেন ঢাকার উত্তরার এমএসটিসি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের (মুনিয়া ওভারসিসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান) তৌফায়েল আহমেদের সঙ্গে।
বিজ্ঞাপনে রাশিয়ার সিনোপ্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে ৬০০ থেকে ৭০০ ডলার বেতনে কাজের কথা উল্লেখ ছিল। ৮ লাখ টাকায় চুক্তি করে এমএসটিসি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে তিন মাস প্রশিক্ষণ নেন তিনি। পরে বিভিন্ন খাতে মোট সাড়ে আট লাখ টাকা পরিশোধ করে রাশিয়ায় যান।
২০২৫ সালের ১৭ জুলাই রাশিয়ায় পৌঁছান কামরুল। এ জন্য স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে সুদে আড়াই লাখ টাকা, এক আত্মীয়ের কাছ থেকে এক লাখ টাকা এবং ঢাকায় থাকা স্বজনদের কাছ থেকে আরও এক লাখ টাকা ধার করা হয় বলে দাবি করেন নাজমীন আক্তার। তিনি প্রথম আলোকে জানান, সব মিলিয়ে রাশিয়ায় যেতে কামরুলের খরচ হয় সাড়ে আট লাখ টাকা।
নাজমীনের ভাষ্য, রাশিয়ার একটি পাহাড়ি এলাকায় পাঁচ-ছয় মাস থাকার পর কাজের সন্ধানে মস্কো যান কামরুল। সেখানে এক দালালের প্রতারণার শিকার হয়ে তাঁকে খোলা আকাশের নিচে দুই রাত কাটাতে হয়। পরে আরেক দালাল ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে পাঁচ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। এরপর প্রতারণার মাধ্যমে তাঁকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখানে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে এক বছরের চুক্তিপত্রে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
চলতি বছরের ৩১ মার্চ মুঠোফোনে শেষবারের মতো কামরুলের সঙ্গে কথা হয় বলে জানান নাজমীন। তাঁর ভাষ্য, তখন কামরুল জানিয়েছিলেন, ছয় মাস নিখোঁজ থাকবেন। মেয়ের ঠিকমতো দেখাশোনাও করতে বলেছিলেন। নিখোঁজের কারণ জানতে চাইলে কামরুল জানান, দালাল জোর করে চুক্তিতে সই করিয়ে তাঁদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে পাঠিয়েছে। এ সময় তিনি যুদ্ধের প্রশিক্ষণে থাকবেন।
নাজমীন বলেন, ভিডিও কলে তিনি রুশ সেনাদের পাশাপাশি কয়েকজন বাংলাদেশিকেও সেনাদের পোশাকে দেখেছিলেন। এরপর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রায় দেড় মাস তাঁর স্বামীর কোনো খোঁজ পাননি।
এ সময় ধরে কামরুল নিখোঁজ থাকায় অনেকেই মনে করেছিলেন, তিনি মারা গেছেন। পরে গত ১৩ মে ‘রাশিয়া প্রবাসী (Russia Expatriate)’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপে স্বামীর সন্ধান চেয়ে পোস্ট করেন নাজমীন।
এরপর ১৬ মে রাতে নাজমীনের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করেন এক বিদেশি। তিনি নিজেকে সুইজারল্যান্ডের সাংবাদিক কার্ট পেলডা পরিচয় দিয়ে জানান, কামরুল জীবিত আছেন এবং ইউক্রেনের একটি কারাগারে আছেন। তাঁর দাবি, অস্ত্রবিহীন অবস্থায় কামরুল ও সুমন নামে আরেক বাংলাদেশিকে আটক করেন ইউক্রেনীয় সেনারা। অস্ত্রসহ ধরা পড়লে তাঁদের গুলি করা হতো, অস্ত্র না থাকায় তাঁদের কারাগারে রাখা হয়েছে।
কার্ট পেলডা নাজমীনকে জানান, প্রায় এক মাস অনাহার ও নির্যাতন সহ্য করার পর কামরুল ও আরেক বাংলাদেশি রুশ সৈন্যশিবির থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ওই সময় অস্ত্রবিহীন অবস্থায় ইউক্রেনীয় সেনাদের হাতে আটক হন তাঁরা।
গত ১৭ মে বিকেলে হোয়াটসঅ্যাপে একটি ভিডিও কল পান নাজমীন। কলটি এসেছিল ইউক্রেনের একটি কারাগারের এক কমান্ডারের মাধ্যমে। ওই সময় স্বামীর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলার সুযোগ হয় তাঁর। তখন মনে হয়েছিল, কমান্ডার তাঁর স্বামীকে ভয় দেখিয়ে কোনো তথ্য জানতে চাইছেন।
নাজমীন বলেন, ওই কমান্ডার বারবার দাবি করছিলেন, তাঁর স্বামী ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করতে গিয়েছিলেন। তিনি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। পরে কমান্ডার জানান, কামরুলের কাছে কোনো পরিচয়পত্র বা প্রয়োজনীয় নথি নেই।
নাজমীনের ভাষ্য, পরে আরেকবার অল্প সময়ের জন্য কামরুলের সঙ্গে কথা হয়। তখন কামরুল বলেন, দুশ্চিন্তা না করতে। তিন মাস পর কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পাওয়ার আশা করছেন। এরপর কার্ট পেলডা জানান, কামরুলকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কমান্ডারকেও বদলি করা হয়েছে। এর পর থেকে কামরুলের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।
এসব আলাপের একপর্যায়ে ভেঙে পড়েন নাজমীন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ধার করা টাকার সুদসহ দেনা এখন তিন লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। পাওনাদারেরা টাকা ফেরত চাইছেন। বাবার বাড়ির সহায়তায় সন্তানকে নিয়ে দিন কাটলেও একা বাড়িতে নিরাপত্তাহীনতায় আছেন। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় স্বামীকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এমএসটিসি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের মার্কেটিং বিভাগের কর্মী তৌফায়েল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান এত টাকা নেয়নি। বন্যা বিজয় ওভারসিস-১২১৪ ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে কামরুলকে রাশিয়ার সিনোপ্যাক কোম্পানিতে নির্মাণকাজে পাঠানো হয়েছিল।
তৌফায়েল বলেন, কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী কর্মস্থল ছেড়ে যাওয়া বা পালিয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। কেউ যদি নিজ উদ্যোগে পালিয়ে যান, তার দায় তাঁদের নয়। তাঁদের মাধ্যমে যাওয়া কোনো কর্মী যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন—এমন তথ্য তাঁদের জানা নেই।