
শুক্রবার বিকেলের কুষ্টিয়া শহরের বিআইডিসি হাট। ভিড়ের ভেতর দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছেন এক ব্যক্তি। বাঁ কাঁধে কাচঘেরা লাল টিনের বাক্স, ডান হাতে পানিভর্তি বালতি। গলায় গামছা, মাথার পাকা চুল এলোমেলো হয়ে নেমে এসেছে ঘাড় পর্যন্ত।
হাঁটতে হাঁটতে তিনি কখনো বাক্স খুলে বের করে দিচ্ছেন গমের আটার নরম রুটি, কখনো রসগোল্লা। কেউ পানি চাইলে গ্লাসে করে তুলে দিচ্ছেন ঠান্ডা পানি। কাঁধে ঝোলানো লাল বাক্সই বাবলু হোসেনের (৬৮) জীবনের সঙ্গী। ৪৫ বছর ধরে কাঁধে এই বাক্স ঝুলিয়েই তিনি হাটে হাটে ঘুরে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার লক্ষ্মীধরদিয়াড় গ্রামের বাসিন্দা বাবলু হোসেনের সংসারে স্ত্রী মঞ্জু খাতুন ও দুই ছেলে। বড় ছেলে বিয়ে করে আলাদা হয়েছেন। ছোট ছেলে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। সংসারের ব্যয় আর ছেলের পড়াশোনার খরচ এখনো বাবলুর ব্যবসার ওপরই নির্ভরশীল।
যুদ্ধ দেখেছেন, পড়াশোনা হয়নি
কথা বলতে বলতে বাবলু ফিরে যান কৈশোরে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর স্মৃতিতে এখনো স্পষ্ট। তবে স্বাধীনতার পরও তাঁর অভাবের সংসারে স্বস্তি ফেরেনি। পড়াশোনা তেমন করতে না পারলেও নিজের নামটুকু লিখতে পারেন।
দাদার জমিজমা আছে কিন্তু বাবার অকালমৃত্যুর কারণে সেসবের ভাগ তেমন পাননি। জীবিকার তাগিদে একসময় স্থানীয় একটি হোটেলে কাজ নেন। সারা দিনের পরিশ্রমের বিনিময়ে তখন মজুরি মিলত মাত্র ১০ থেকে ১২ টাকা। সেই টাকায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠেছিল।
অন্যকে দেখে বদলে যায় জীবন
হোটেলে কাজ করার সময় গ্রামের এক ব্যক্তিকে হাটে হাটে রসগোল্লা আর পাউরুটি বিক্রি করতে দেখেন বাবলু। তা দেখেই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর শুরু করেন ওই কাজ।
শুরুর দিনগুলোর কথা মনে করে বাবলু বলেন, ‘তখন একটা রসগোল্লা এক টাকা আর একটা পাউরুটি এক টাকায় বিক্রি করতাম। কখনো রসগোল্লা আর পাউরুটি মিলিয়ে মাত্র দেড় টাকাতেও বিক্রি করেছি।’ ২০ বছর ধরে তিনি পাউরুটির বদলে বিক্রি করছেন গমের আটার নরম রুটি। ক্রেতাদের চাহিদায় তাঁকে এই পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
পাঁচ দিন হাটে, দুই দিন প্রস্তুতি
প্রতিদিন সকাল নয়টার দিকে সাইকেলে করে বাড়ি থেকে বের হন বাবলু। সপ্তাহের পাঁচ দিন জেলার তিনটি বড় হাটে ঘুরে বেড়ান—মিরপুর সবজি হাট, পোড়াদহ সবজি হাট ও কুষ্টিয়া বিআইডিসি হাট। বাকি দুই দিন কাটে পরের সপ্তাহের প্রস্তুতিতে। বাজার থেকে গম কিনে আটা তৈরি করেন। রসগোল্লার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ জোগাড় করে নিজের হাতেই বানান মিষ্টি। আর হাটে বের হওয়ার দিন ভোরে স্ত্রী মঞ্জু খাতুন তৈরি করে দেন রুটিগুলো।
দীর্ঘদিনের পরিচয়ে বাবলু হোসেন হাটের অনেকের কাছেই পরিচিত মুখ, একরকম আপনজন। হাটের মসলাপাতির ব্যবসায়ী সাব্বির হোসেন প্রায় ২০ বছর ধরে তাঁকে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘বাবলু হোসেনের রুটি আর রসগোল্লা নিয়মিত খাই। খিদেও মেটে, আবার খেতেও খুব ভালো।’
হাসিমুখে বাবলু হোসেন বলেন, ‘আমার এটাই কর্ম। প্রতি হাটে ৫০০–৬০০ টাকা লাভ হয়। এই করেই কোনোমতে সংসার চলে যায়।’ কথা শেষ না হতেই আবার কাঁধে তুলে নিলেন লাল বাক্স, হাতে নিলেন পানির বালতি। ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে যেতে যেতে কারও হাতে তুলে দিলেন রসগোল্লা, কারও হাতে রুটি, আবার কাউকে পান করালেন এক গ্লাস পানি।