
দেশে প্রতিবছর অন্তত ১৩ লাখ মেট্রিক টন সামুদ্রিক ও স্বাদুপানির মাছ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ১৫ শতাংশ মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকিতে রূপান্তর করা হয়। শুকানোর সময় ‘লুসিলিয়া কিউপ্রিনা’ প্রজাতির ক্ষতিকর মাছি মাছে ডিম পেড়ে লার্ভা উৎপাদন করে। মাছির এই লার্ভা মাছ খেয়ে বিনষ্ট করে। মাছির আক্রমণে ৬০ শতাংশ শুঁটকি নষ্ট হয়ে যায়। শুঁটকি থেকে এই আপদ দূর করতে মাছির বন্ধ্যাকরণ নিয়ে গবেষণা করেন পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানীরা।
মাছি বন্ধ্যাকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদনে সফল হয়েছেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানীরা। কক্সবাজারের সাগরদ্বীপ মহেশখালীর সোনাদিয়ায় পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদন করে ব্যাপক সাফল্যও পাওয়া গেছে। সোনাদিয়াকে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদনের জন্য ‘উপযুক্ত জায়গা’ ঘোষণা করেছেন গবেষকেরা।
গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২১ সালে প্রকল্পটি চালু হয়। টানা কয়েক বছরে ৯০ লাখ বন্ধ্যা মাছি ছাড়া হয়েছিল। এরপর গবেষণায় আসে সাফল্য।
পরমাণুবিজ্ঞানীদের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে প্রতিবছর অন্তত ১৩ লাখ মেট্রিক টন সামুদ্রিক ও স্বাদুপানির মাছ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ১৫ শতাংশ মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকিতে রূপান্তর করা হয়। শুকানোর সময় ‘লুসিলিয়া কিউপ্রিনা’ প্রজাতির ক্ষতিকর মাছি মাছে ডিম পেড়ে লার্ভা উৎপাদন করে। মাছির এই লার্ভা মাছ খেয়ে বিনষ্ট করে। মাছির আক্রমণে ৬০ শতাংশ শুঁটকি নষ্ট হয়ে যায়। টাকার অঙ্কে এই ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ৩০০ কোটি।
মৎস্য গবেষক ও বিজ্ঞানীরা জানান, মাছির ক্ষতি রোধ করতে উৎপাদনকারীরা মাছে বিষ ও অতিরিক্ত লবণ প্রয়োগ করে থাকেন; যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। মানসম্পন্ন শুঁটকি উৎপাদিত না হওয়ায় বিদেশেও শুঁটকি রপ্তানি করা যাচ্ছে না।
শুঁটকিতে বিষ
পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানীরা নাজিরারটেক, সমিতিপাড়া, খুরুশকুল, মহেশখালীর মহালগুলোতে উৎপাদিত শুঁটকি এবং কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন দোকানে বিক্রির জন্য রাখা শুঁটকি পরীক্ষা–নিরীক্ষা এবং গবেষণা করে দেখতে পান, ৮০ শতাংশ শুঁটকিতে স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বিষ মেশানো। আর মাছি দূর করতেই দেওয়া হয় এই বিষ।
কাঁচা মাছ ধুয়েমুছে রোদে শুকানোর জন্য বাঁশের মাচায় টাঙিয়ে রাখা হয়। এ সময় একধরনের মাছি মাছের পেটে ও মাথার ভেতরের ভেজা অংশে এবং ফুলকায় ২০০-৩০০টি ডিম পেড়ে দেয়। ১০-১২ ঘণ্টার মধ্যে ডিম ফুটে লার্ভা (শূককীট) বের হয়। এরপর লার্ভা মাছ খাওয়া শুরু করে। তখন ওই মাছ মানুষের খাওয়ার উপযোগী থাকে না। এই ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য শুঁটকি উৎপাদনকারীরা মাছ শুকানোর আগে (কাঁচা মাছে) বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করেন। তাতে পুরো শুঁটকি বিষাক্ত হয়ে যায়। বিষাক্ত এই শুঁটকি খেলে মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে গিয়ে ক্যানসারসহ লিভার, ফুসফুস, কিডনি ও হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। নারীদের গর্ভপাত এবং মৃত অথবা বিকলাঙ্গ সন্তান জন্ম হতে পারে। তা ছাড়া শুঁটকিতে যখন বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়, তখন নারী ও পুরুষ শ্রমিকের শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে তাঁদের শরীরে কীটনাশক ঢুকে পড়ে।
কাঁচা মাছ ধুয়েমুছে রোদে শুকানোর জন্য বাঁশের মাচায় টাঙিয়ে রাখা হয়। এ সময় একধরনের মাছি মাছের পেটে ও মাথার ভেতরের ভেজা অংশে এবং ফুলকায় ২০০-৩০০টি ডিম পেড়ে দেয়। ওই মাছ মানুষের খাওয়ার উপযোগী থাকে না। এই ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য শুঁটকি উৎপাদনকারীরা মাছ শুকানোর আগে (কাঁচা মাছে) বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করেন। তাতে পুরো শুঁটকি বিষাক্ত হয়ে যায়।
মাছি বন্ধ্যাকরণ প্রযুক্তি
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানীরা নব্বইয়ের দশক থেকে সোনাদিয়া দ্বীপে শুঁটকির আপদ নিয়ন্ত্রণে পরমাণু প্রযুক্তিতে উৎপাদিত বন্ধ্যা মাছি ব্যবহার করে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদন ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। এর জন্য কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে ‘সৈকত খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্রে’ একটি গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। সেখানে স্থাপন করা হয় মাছি বন্ধ্যাকরণের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির একটি যন্ত্র। এর নাম কোবাল্ট-৬০ মোবাইল গামা ইরাডিয়েটর। যার মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ৬০ লাখ বন্ধ্যা মাছি উৎপাদন সম্ভব। বন্ধ্যা মাছি উৎপাদনের এই প্রকল্পটি নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের খাদ্য ও বিকিরণ জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউট। গত তিন বছরে সোনাদিয়াতে অন্তত ৯০ লাখ বন্ধ্যাকরণ মাছি ছাড়া হয়।
ইনস্টিটিউটের বিকিরণ কীটতত্ত্ব ও মাকড়তত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. এ টি এম ফয়েজুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী মাছি বন্ধ্যাকরণ প্রযুক্তিতে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদন ও গবেষণার কাজ পরিচালনা করছেন।
জানতে চাইলে ড. এ টি এম ফয়েজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বন্ধ্যা করা মাছির মাধ্যমে শুঁটকির আপদ দমন পদ্ধতিকে মাছির জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বলা যায়। পূর্ণাঙ্গ মাছি ২৫-৩০ দিন পর্যন্ত বাঁচে। এ সময় স্ত্রী মাছি পুরুষ মাছির সঙ্গে শুধু একবার মিলিত হয়, কিন্তু পুরুষ মাছি একাধিক স্ত্রী মাছির সঙ্গে প্রজনন ঘটায়। মাঠের এই মাছিগুলো গবেষণাগারে নিয়ে এসে কৃত্রিম খাবারের মাধ্যমে লাখ লাখ মাছি উৎপাদন করা হয়। এই মাছির লার্ভা বা শূককীট নির্দিষ্ট মাত্রায় রেডিয়েশন দিলে সেখান থেকে বের হওয়া মাছিগুলো বন্ধ্যা হয়ে যায়। অর্থাৎ স্ত্রী মাছিগুলোর প্রজনন অঙ্গ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে মাছি আর ডিম উৎপাদন করতে পারে না। বন্ধ্যা পুরুষ মাছগুলোর শুক্রাণুর সক্রিয়তা নষ্ট হয়ে যায়। এসব বন্ধ্যা মাছি শুঁটকি উৎপাদন এলাকায় ছেড়ে দিলে সেখানকার স্ত্রী মাছির সঙ্গে বন্ধ্যা পুরুষ মাছি প্রজনন করে। যেহেতু বন্ধ্যা পুরুষ মাছির শুক্রাণুর সক্রিয়তা থাকে না, তাই মিলন করা মাঠের স্ত্রী মাছির ডিম নিষিক্ত হয় না। ফলে এসব ডিম থেকে লার্ভা বের হয় না। যার ফলে মাছির সংখ্যা কমে যায়। এভাবে সোনাদিয়াতে বিষমুক্ত, লবণমুক্ত নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি উৎপাদনে মাছি বন্ধ্যাকরণ প্রযুক্তি বড় সফলতা পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানীরা নব্বইয়ের দশক থেকে সোনাদিয়া দ্বীপে শুঁটকির আপদ নিয়ন্ত্রণে পরমাণু প্রযুক্তিতে উৎপাদিত বন্ধ্যা মাছি ব্যবহার করে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদন ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। এর জন্য কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে ‘সৈকত খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্রে’ একটি গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। সেখানে স্থাপন করা হয় মাছি বন্ধ্যাকরণের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির একটি যন্ত্র। এর নাম কোবাল্ট-৬০ মোবাইল গামা ইরাডিয়েটর। যার মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ৬০ লাখ বন্ধ্যা মাছি উৎপাদন সম্ভব।
পরমাণুবিজ্ঞানী ড. ফয়েজুল ইসলাম বলেন, সোনাদিয়া দ্বীপটি আইসোলেটেড হওয়ায় মাছি বন্ধ্যাকরণ প্রযুক্তি অধিকতর কার্যকর। এ ক্ষেত্রে সোনাদিয়াকে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদনে বিশেষ অঞ্চল ঘোষণা দিয়ে সেখানে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদনের জন্য প্রচার চালানো হয়েছে কয়েক বছর ধরে। বিশেষ করে নাজিরারটেকসহ আশপাশের উপকূলে শুঁটকিকেন্দ্রগুলো সোনাদিয়াতে স্থানান্তর করা গেলে নিরাপদ ও গুণসম্পন্ন শুঁটকি উৎপাদনে বৈপ্লবিক উন্নতি ঘটবে। কিন্তু দূরের এলাকা সোনাদিয়াতে যাতায়াত সমস্যা থাকায় উৎপাদনকারীরা সেখানে মহাল গড়ে তুলতে তেমন উৎসাহ বা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
তহবিল–সংকট
সম্প্রতি সোনাদিয়া দ্বীপে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানকার বালিয়াড়িতে আটটি মহালে মাছি বন্ধ্যাকরণ পদ্ধতি অনুসরণ করে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদিত হচ্ছে। শুঁটকির মধ্যে রয়েছে ছুরি, লইট্যা, পোপা, চাপা, মাইট্যা, ফাইস্যা ইত্যাদি।
একটি মহালের ব্যবস্থাপক গিয়াস উদ্দিন বলেন, মাছি বন্ধ্যাকরণের ওপর তাঁদের আগে থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। উপকরণও সরবরাহ করা হয়। সোনাদিয়া শুঁটকির কদরও বেশি। কিন্তু কাঁচা মাছের সংকট এবং অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে চাহিদামতো শুঁটকি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।
আরেকটি মহালের মালিক কামাল হোসেন বলেন, সোনাদিয়ায় দিনের সূর্যালোক, বাতাস ও বালি হতে বিকিরিত তাপ, যা প্রাকৃতিক উপায়ে শুঁটকি উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী। নাজিরারটেকসহ কক্সবাজারের যেসব এলাকায় শুঁটকি উৎপাদতি হয়, সেসব মহাল সোনাদিয়াতে স্থানান্তর করা গেলে ‘সোনাদিয়ার শুঁটকি’ দেশে-বিদেশে ব্র্যান্ডিং হতো।
মাছি বন্ধ্যাকরণ গবেষণাকেন্দ্র কক্সবাজারের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ২০২১ সালে প্রথম সোনাদিয়াতে পাঁচ লাখ বন্ধ্যাকরণ মাছি ছাড়া হয়েছিল। এরপর টানা তিন বছরে সোনাদিয়াতে ছাড়া হয় ৯০ লাখ বন্ধ্যাকরণ মাছি। কিন্তু তহবিল–সংকট এবং চব্বিশের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পরবর্তী সময়ে গবেষণাকাজ পরিচালনার জন্য তহবিল পাওয়া যায়নি।
ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন একটি গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান। অন্য কোনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অথবা এনজিও এই প্রযুক্তির অংশীদার হতে চাইলে সহযোগিতা দেওয়া সম্ভব।