
সোমবার বেলা পৌনে তিনটা। রাজশাহী নগরের বোসপাড়ার মেসার্স আফরিন ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি নিতে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক মোটরসাইকেলচালক। পাম্পের কর্মী তাঁর গাড়ির নম্বর মুঠোফোনের অ্যাপে দিতেই দেখা গেল, তিনি আগের দিন সন্ধ্যায় সর্বশেষ তেল নিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী, পাঁচ দিনের আগে তাঁর আবার তেল পাওয়ার কথা নয়। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে লাইন থেকে বের করে দেওয়া হয়।
কিছুক্ষণ পর একইভাবে ধরা পড়েন আরেক চালক। তিনি সকালে জ্বালানি নেওয়ার পর একই দিন দ্বিতীয়বার তেল নিতে এসেছিলেন। পাম্প কর্তৃপক্ষ তাঁকেও ফেরত পাঠায়। এ সময় লাইনে থাকা মোটরসাইকেলচালকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়।
পাম্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সোমবার সকাল থেকে এভাবে অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন ধরা পড়েছেন। তাঁদের কাউকেই তেল দেওয়া হয়নি। খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এই প্রতিবেদকের সামনেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আরও কয়েকজনকে দ্রুত সরে যেতে দেখা যায়।
গ্রাহক হয়রানি কমানো ও জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত ঠেকাতে রাজশাহীতে ‘ফুয়েল ম্যানেজমেন্ট’ নামে নতুন একটি অ্যাপ চালু করেছে জেলা প্রশাসন। গতকাল রোববার নগরের কুমারপাড়ার গুল গফুর ফিলিং স্টেশনে এর উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। আজ থেকে জেলার বিভিন্ন পাম্পে অ্যাপটির ব্যবহার শুরু হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পাম্পের কর্মীরা ফোনের অ্যাপ ব্যবহার করে গাড়ির তথ্য যাচাই করছেন। অ্যাপে নম্বরপ্লেটের রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিলেই দেখা যাচ্ছে ওই যানবাহন সর্বশেষ কবে, কখন এবং কতটুকু জ্বালানি নিয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, নতুন এই ব্যবস্থায় রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। একজন মোটরসাইকেলচালক পাঁচ দিনে একবার সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার এবং প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাসচালক সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকার জ্বালানি নিতে পারবেন।
রাজশাহীর এই ফিলিং স্টেশনের পয়েন্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ সানি বলেন, অ্যাপটি ব্যবহার সহজ ও কার্যকর। একবার তেল নেওয়ার পর পাঁচ দিনের জন্য গাড়িটি ব্লক হয়ে যায়। ফলে একই ব্যক্তি বারবার এসে তেল নিতে পারছেন না। এতে ভোগান্তি কমবে এবং পাম্পে শৃঙ্খলা বজায় থাকবে।
মোহাম্মদ সানি আরও জানান, স্ক্যানার সুবিধা এখনো পুরোপুরি চালু না হওয়ায় নম্বর হাতে লিখে অ্যাপে ইনপুট দিতে হচ্ছে। স্ক্যানার চালু হলে কাজ আরও সহজ হবে।
শাস্তির দাবিও তুলছেন বাইকাররা
নতুন এই উদ্যোগকে ইতিবাচক বললেও নিয়ম ভঙ্গকারীদের দৃশ্যমান শাস্তির দাবি তুলেছেন লাইনে দাঁড়ানো অনেক গ্রাহক।
রাজু আহমেদ নামের এক মোটরসাইকেলচালক বলেন, ধরা পড়ার পর শুধু ফেরত পাঠালে হবে না, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া উচিত। তাহলে কেউ দ্বিতীয়বার আসার সাহস করবে না।
আরেক মোটরসাইকেলচালক রাফি ইসলাম বলেন, যারা নিয়ম ভাঙছে, তাদের কী শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, সেটি প্রকাশ্যে জানানো দরকার। এতে সিন্ডিকেট কমবে।
তবে কিছু পেশাজীবী সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেছেন। গ্রামীণফোনের মার্কেটিং বিভাগে কর্মরত মো. জাহিদ বলেন, প্রতিদিন তাঁকে ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার মোটরসাইকেল চালাতে হয়। পাঁচ দিনে একবার তেল নেওয়ার নিয়ম তাঁর মতো কর্মজীবীদের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করছে। যাঁদের চলাচল বেশি, তাঁদের জন্য আলাদা বিবেচনা থাকা দরকার।
রাজশাহীর এই ফিলিং স্টেশনে এক ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে অন্তত তিনজনের মোটরসাইকেলের ট্যাংক উপচে তেল পড়তে দেখা গেছে। নির্ধারিত ৫০০ টাকার তেল তাঁরা নিতে পারেননি। পাম্প কর্তৃপক্ষ তাঁদের গাড়ির ওপর ও পোশাকে তেল ঢেলে দেয়। এই দৃশ্য দেখে লাইনে থাকা অন্য বাইকারদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা যায়।
জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, তেলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি সিন্ডিকেট ও অরাজকতা তৈরি হয়েছিল। নতুন অ্যাপ চালুর পর তাৎক্ষণিকভাবে একাধিক অনিয়ম শনাক্ত করা গেছে।
নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার কথা জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়ের আগে আবার তেল নিতে এলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আপাতত রাজশাহী জেলায় এ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে অ্যাপটি আরও উন্নত করার কাজ চলছে।