কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) গত শুক্রবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে বাসা থেকে বের হয়েছিল মায়ের আইফোন নিয়ে। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে বের হওয়ার পর দীর্ঘ সময়েও সে বাসায় ফেরেনি। সন্ধ্যা সাতটার দিকে ওই ফোনে কল করে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর খোঁজাখুঁজি করে পরিবার। রাত সাড়ে ১০টার দিকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার।
পরদিন শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়–সংলগ্ন সানন্দা এলাকার লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের সঙ্গে ছিল না মায়ের আইফোনটি। আর অপ্রতিমের কপালসহ মুখমণ্ডলে থেঁতলানো জখম ছিল।
এ ঘটনায় গতকাল শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে সদর দক্ষিণ মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন অপ্রতিমের বাবা। পুলিশ এই মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের একজন সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯)। অপর দুই কিশোরের একজনের বয়স ১৫ বছর আর অপরজনের বয়স ১৬ বছর। এ ছাড়া সিয়াম (১৯) নামের এক তরুণকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
মামলার এজাহারে অপ্রতিমের বাবা ঘটনার যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে ছেলের নিখোঁজ হওয়া থেকে শুরু করে মরদেহ উদ্ধারের আগপর্যন্ত সময়ের একটি ধারাবাহিক চিত্র পাওয়া যায়।
এজাহারে ফিরোজ শাহরিয়ার উল্লেখ করেন, ১৮ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) বেলা আনুমানিক সাড়ে তিনটার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ বাগমারা (গন্ধমতী) এলাকার বাসা থেকে অপ্রতিম বের হয়। সঙ্গে ছিল তাঁর স্ত্রী নাহিদা বেগমের ব্যবহৃত একটি আইফোন। ফোনটিতে একটি সিম ছিল।
ছেলে ছবি তোলার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়েছিল বলে এজাহারে উল্লেখ করেন বাবা। তখন তিনি ও তাঁর স্ত্রী বাসাতেই ছিলেন। দীর্ঘ সময় পরও ছেলে বাসায় না ফেরায় সন্ধ্যা আনুমানিক সাতটার দিকে তাঁর সঙ্গে থাকা আইফোনে কল করেন বাবা। তখন ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
কোথাও সন্ধান না পেয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে সদর দক্ষিণ মডেল থানায় গিয়ে ছেলের নিখোঁজের বিষয়ে জিডি করেন ফিরোজ শাহরিয়ার। জিডি নম্বর ৯৮৩, তারিখ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
এজাহারে বলা হয়, পুলিশও অপ্রতিমকে খুঁজছিল। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে দুই সাক্ষী আবদুল কাদের জিলানী ও ১৬ বছর বয়সী হাফেজুর রহমান সাইমন সানন্দা পশ্চিমপাড়ার একটি পাহাড়ি ঢালের জমিতে অপ্রতিমের মরদেহ দেখতে পান। তাঁরা বিষয়টি পুলিশকে জানান।
খবর পেয়ে অপ্রতিমের বাবা আত্মীয়স্বজনসহ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সেখানে যান। এজাহারে তিনি বলেন, ছেলের কপাল ও মুখমণ্ডলে রক্তমাখা থেঁতলানো জখম দেখতে পান। তবে তাঁর সঙ্গে থাকা আইফোনটি তখন পাওয়া যায়নি।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে পাঠানো হয়।
অপ্রতিমের বাবা এজাহারে বলেন, অজ্ঞাতনামা আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ১৮ সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে তিনটার পর থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টার মধ্যে পাহাড়ি ঢালের ওই জায়গায় তাঁর ছেলেকে হত্যা করে মরদেহ ফেলে রাখে। পরে তাঁর সঙ্গে থাকা আইফোনটি নিয়ে যায়।
তবে এজাহারে হত্যার পদ্ধতি, কারা হত্যা করেছে বা হত্যার নির্দিষ্ট কারণ এবং কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি। মামলাটি করা হয় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে।
মামলা হওয়ার আগেই অপ্রতিমকে উদ্ধারে বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করছিল পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। একটি ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে এক তরুণকে দেখা যায়। পরে ওই তরুণকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদ ও সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার পর অপ্রতিমের মায়ের আইফোন উদ্ধার করা হয় শনিবার রাতে। এ ছাড়া পুলিশ হত্যার সঙ্গে তিনজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানায়।
আজ রোববার দুপুরে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, অপ্রতিমের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে পরিকল্পনা করে সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে ফোন নেওয়ার চেষ্টা করলে অপ্রতিম বাধা দেয়। পরে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে সাইফুল এবং অপর দুই কিশোর বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন।
পুলিশের দাবি, অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর সাইফুল তার ব্যবহৃত ফোনটি নিয়ে অপর দুই কিশোরের সঙ্গে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এরপর সাইফুল নিজের বাসায় নিয়ে ফোনটি বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখেন। শনিবার রাত আটটার দিকে পুলিশ তাঁকে সঙ্গে নিয়েই আইফোনটি উদ্ধার করে।
পুলিশ এ ঘটনায় সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন ও অপর দুই কিশোরকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। এ ছাড়া সিয়াম নামের আরেকজনকে আটক করে তাঁর সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে।