নষ্ট হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় কম দামে আলু বিক্রি করছেন চাষি। আকাশকুড়ি,রংপুর। ২৫ এপ্রিল
নষ্ট হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় কম দামে আলু বিক্রি করছেন চাষি। আকাশকুড়ি,রংপুর। ২৫ এপ্রিল

আলু উৎপাদনে শীর্ষে রংপুর রপ্তানিতে পিছিয়ে কেন

মুন্সিগঞ্জকে একসময় দেশের আলুর রাজধানী বলা হলেও এখন সেই চিত্র পাল্টে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে আলু উৎপাদনের শীর্ষ জেলা রংপুর। পাশাপাশি দেশের মোট আলুর ১৫ থেকে ২৪ শতাংশ রংপুর বিভাগে উৎপাদিত হয়। তবে উৎপাদন আশাব্যঞ্জক হলেও রপ্তানিতে এই বিভাগ অনেক পিছিয়ে আছে। বিভাগের মোট উৎপাদনের মাত্র শূন্য দশমিক ৪ থেকে ৫ শতাংশ আলু বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে।

কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আলু রপ্তানি করতে হলে কৃষককে উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনার (গ্যাপ) মাধ্যমে আলু উৎপাদন করতে হয়। কিন্তু আলু রপ্তানির অন্যতম বাধা হলো রংপুরে নির্দিষ্ট চুক্তিবদ্ধ চাষি জোন নেই। ৯০ শতাংশ খাওয়ার আলুর চাষ হয়। রপ্তানিযোগ্য আলু চাষের ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, হর্টেক্স ফাউন্ডেশন ও কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন কৃষকদের সেভাবে উদ্বুদ্ধ করতে পারেনি। পাশাপাশি রপ্তানিযোগ্য আলুর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকেরাও উৎসাহিত হচ্ছেন না।

অন্যদিকে কৃষি কর্মকর্তারা বলেন, উত্তরবঙ্গের কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প খাতকে এগিয়ে নিতে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এ ক্ষেত্রে আলু খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে এ অঞ্চলের প্রতিটি উপজেলায় সরকারিভাবে হিমাগার নির্মাণ, আলুকেন্দ্রিক শিল্পকারখানা ও সরকারিভাবে আলু রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

ভারত ও পাকিস্তানে আলু চাষে উৎপাদন খরচ বাংলাদেশি টাকায় ১০ টাকা। অথচ উত্তরবঙ্গে আলুর উৎপাদন খরচ হয় ১৫ থেকে ১৬ টাকা। উৎপাদন খরচ ১০ টাকায় কমিয়ে না আনলে আলু রপ্তানি হবে না।
মোস্তফা আজাদ চৌধুরী, সভাপতি, রংপুরের ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিক সমিতি

আলু উৎপাদন বাড়ছে

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ মৌসুমে রংপুরের ৮ জেলায় আলু আবাদের জমি ১ লাখ হেক্টর ছাড়িয়ে যায়। গত ২০২৪-২৫ মৌসুমে বিভাগের ১ লাখ ১৯ হাজার ৭৩৯ হেক্টর জমিতে রেকর্ড ৩২ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়। তবে গত বছর কৃষকেরা বড় ধরনের লোকসানে পড়ায় এবার প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ কমেছে।

রংপুর জেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, রংপুর আলু উৎপাদনে শীর্ষ জেলা হওয়ায় দেশের মোট আলু উৎপাদনের ১৫ শতাংশ এখানে উৎপাদিত হয়। বিশেষ করে মিঠাপুকুর, পীরগাছা ও গঙ্গাচড়া উপজেলা আলুর প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এবার রংপুরে আলু উৎপাদিত হয়েছে ১৬ লাখ ৫ হাজার ২৫ মেট্রিক টন। মোট বাৎসরিক চাহিদা, বীজ হিসেবে ব্যবহার, পচন ছাড়াও প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ মেট্রিক টন আলু উদ্বৃত্ত থাকছে।

রংপুরের পীরগাছা থেকে সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে আলু রপ্তানি করা হয়। সম্প্রতি তোলা ছবি

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের রংপুর জেলার জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা শাকিল আখতার প্রথম আলোকে বলেন, একটি সরকারিসহ জেলায় ৪২টি আলুর হিমাগার আছে। এসব হিমাগারে ৪ লাখ ১৬ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন আলু রাখার সুযোগ আছে। এ ছাড়া কৃষি বিপণন অধিদপ্তর থেকে ১২১টি অহিমায়িত আলুর মডেল ঘর করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৩০ শতাংশ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করা যাবে।

আলু চাষিরা বলছেন, ৭০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের হিমাগার না থাকায় এসব আলু উৎপাদনের মৌসুমে বিক্রি করতে অনেকটা বাধ্য হন কৃষকেরা। অথচ আলু রপ্তানি বাড়ালে তাঁরা লাভবান হতেন।

আলু রপ্তানি হয়, লোকমুখে শুনি। কেউ কোনো দিন বলেনি। লোক না আসলে আমি কীভাবে আবাদ করব আর কার কাছে দিব, জানি না।
আবদুল কাদের, কৃষক

রপ্তানি তলানিতে কেন

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ২০২১-২২ মৌসুমে সর্বোচ্চ ১৯ হাজার ৩৭১ মেট্রিক টন আলু রপ্তানি হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই হার খুবই কম, মাত্র ৩৭৪ ও ৩৫৩ মেট্রিক টন। এ বছর এখন পর্যন্ত ১২৬ মেট্রিক টন আলু রপ্তানি হয়েছে।

আলু তুলতে ব্যস্ত নারীরা। রংপুরের তারাগঞ্জের মাটিয়াল পাড়া মাঠে

আলু রপ্তানিকারী কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, সংযুক্ত আবর আমিরাত ও পাকিস্তানে সানশাইন, এন্টারিক্স, গ্রানোলা, ডায়মন্ট ও কুম্ভিকা জাতের আলু রপ্তানি হয়। তবে বিদেশের বাজারে বিশেষ করে ইউরোপ ও রাশিয়ায় লম্বাটে ও কম জলীয় অংশযুক্ত আলুর চাহিদা বেশি।

স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, রংপুর অঞ্চলের উৎপাদিত জনপ্রিয় জাত কার্ডিনাল ও ডায়মন্ট মূলত রান্নার জন্য উপযোগী, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের (চিপস বা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই) জন্য নয়। এটা এ অঞ্চলের আলু রপ্তানির বড় বাধা। তাঁদের আলু রপ্তানির বিষয়ে তেমন জানাশোনাও নেই।

রংপুর নগরের তালুক উপাসু গ্রামের কৃষক আবদুল কাদের বলেন, ‘আলু রপ্তানি হয়, লোকমুখে শুনি। কেউ কোনো দিন বলেনি। লোক না আসলে আমি কীভাবে আবাদ করব আর কার কাছে দিব, জানি না।’

স্থানীয় কৃষি কার্যালয় সূত্র জানায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় পার্টনার কর্মসূচির আওতায় চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলের ৫টি জেলায় ২ হাজার ৪৬০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৫ হাজার মেট্রিক টন। ইতিমধ্যে রংপুরের মিঠাপুকুর, পীরগাছা ও পীরগঞ্জ থেকে কিছু আলু মালয়েশিয়া ও দুবাইয়ে রপ্তানি শুরু হয়েছে।

পার্টনার কর্মসূচির রংপুর অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ মনিটরিং কর্মকর্তা অশোক কুমার রায় প্রথম আলোকে বলেন, সানশাইন জাতের আলু মালয়েশিয়াতে যাচ্ছে। এরপর নেপাল, ভুটান, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম আলু নেবে। এবার অন্যবারের তুলনায় বেশি আলু রপ্তানির সম্ভাবনা আছে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে আলুর দাম কম বলে জানিয়েছেন রংপুরের পীরগাছার নব্দীগঞ্জের আলুচাষি হাবিবুর রহমান। তিনি গত বছর শ্রীলঙ্কায় ১৮০ টন সানশাইন জাতের আলু রপ্তানি করেন। কিন্তু এ বছর এখনো কোনো আলু রপ্তানি করতে পারেননি। হাবিবুর বলেন, ‘আলুর চাহিদা নেই। এবার বাইরে মাল যাচ্ছে না।’

আলু রপ্তানি নিয়ে বিভিন্ন সমস্যার কথাও বলছেন কৃষকেরা। পীরগাছার বিরাহিম আইএপিপি কৃষক সমবায় সমিতি প্রতিবছর উত্তম কৃষি চর্চা (গ্যাপ) মেনে আলু রপ্তানি করে। এ বছর ১৭ একর জমিতে সানশাইন জাতের আলু চাষ করেছেন সমিতির সদস্যরা। ৮ এপ্রিল সংগঠনের সভাপতি মোকছেদুলের ৫৬ মেট্রিক টন আলু মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়েছে।

আলু তোলায় ব্যস্তু কৃষক। সম্প্রতি রংপুরের ঘাঘটপাড়ায়

মোকছেদেুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওরা ১০০ গ্রাম থেকে ওপরের আলুটা নেয়। আর ছোট আলুগুলো আমরা একদম কম দামে বিক্রি করি। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। দেখা গেল, মাঝারি সাইজের আলুটা ১৪ টাকা কেজি বিক্রি করলাম, কিন্তু ছোট আলুটা স্থানীয় বাজারে ৫ টাকায় বিক্রি করতে হয়। কিন্তু আমরা গড়ে বিক্রি করলে ১১ টাকা বিক্রি করতে পারি। এ কারণে কৃষকেরা রপ্তানির ওপর আস্থা হারায়ে ফেলাইছে।’

আরেক কৃষক মোজাম্মেল হক বলেন, তিনি আড়াই একর জমিতে সানশাইন আলুর চাষ করেছেন রপ্তানির জন্য। এখন কম দাম ও অতিরিক্ত খরচের জন্য রপ্তানি করতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘দাম দেয় ১৩ টাকা কেজি। এর মধ্যে ৪০ পারসেন্ট (শতাংশ) আলু দেওয়া যায়। ৬০ পারসেন্ট ছোট আলু বেচা লাগে ৪ থেকে ৫ টাকা কেজি দরে।’

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রপ্তানিকারকেরা স্থানীয় বাজারের চেয়ে কেজিপ্রতি এক থেকে দুই টাকার বেশি দিতে চান না। আবার আলু গ্রেডিং ও লোড করতে এক থেকে দেড় টাকা খরচ হয়। তাঁরা বেশি দাম দিলে কৃষকেরা আলু রপ্তানিতে আগ্রহ পেতেন।

রংপুরের ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ভারত ও পাকিস্তানে আলু চাষে উৎপাদন খরচ বাংলাদেশি টাকায় ১০ টাকা। অথচ উত্তরবঙ্গে আলুর উৎপাদন খরচ হয় ১৫ থেকে ১৬ টাকা। উৎপাদন খরচ ১০ টাকায় কমিয়ে না আনলে আলু রপ্তানি হবে না। এ ক্ষেত্রে সার, কীটনাশক ও আলুবীজের বাজার যাতে না বাড়ে এবং কৃষক যাতে প্রতারিত না হন, সে জন্য সরকারের কঠোর তদারকি করতে হবে।