নিজের ভালো কাজের খাতা দেখাচ্ছে গাইবান্ধা সদর উপজেলার রায়দাশবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী ধৈত্রী সরকার। গত ২৯ মার্চ দুপুরে
নিজের ভালো কাজের খাতা দেখাচ্ছে গাইবান্ধা সদর উপজেলার রায়দাশবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী ধৈত্রী সরকার। গত ২৯ মার্চ দুপুরে

গাইবান্ধা

যে উদ্যোগে শিশু শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফুটছে ‘নৈতিকতার’ ফুল

ধৈত্রী সরকার। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। তবে ধৈত্রীর জীবনধারা অন্য দশজন শিশুর চেয়ে আলাদা। সে প্রতিদিন একাধিক ভালো কাজ করে। মিথ্যা কথা বলে না। বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করে। কাজগুলো ‘ভালো কাজের’ খাতায় লিখে রাখে সে।

মাস শেষে সেই খাতা মূল্যায়ন করে নম্বর দেন অভিভাবক। অভিভাবকের মূল্যায়নের ওপর শিক্ষকেরাও নম্বর দেন। কয়েক মাসের প্রচেষ্টায় ধৈত্রীর মধ্যে অনেকটা সততা ও নৈতিকতা সৃষ্টি হয়েছে। সততার জন্য জেলা পর্যায়ে পুরস্কৃতও হয়েছে সে। পুরস্কার হিসেবে পেয়েছে একটি ক্রেস্ট, ১০ হাজার টাকা ও সনদপত্র। এমনকি তার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহজাদী হাবিবা সুলতানাও পুরস্কৃত হয়েছেন।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার ফলিয়া গ্রামের ধৈত্রী সরকার উপজেলার রায়দাশবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। ধৈত্রীর মতো বিদ্যালয়টির প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থীর বেশির ভাগের মধ্যে ‘নৈতিকতার ফুল’ ফুটেছে। এর নেপথ্যে গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আল মামুন। তিনি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) হিসেবে কর্মরত থাকাকালে এ উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

আল মামুন জানান, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে গত বছরের ৭ ও ৮ জুলাই ‘নীতিমান শিশু, সুখী বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে দুই দিনব্যাপী কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এতে জেলার ৬১টি স্কুলের দুই শতাধিক শিক্ষক অংশ নেন। পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রায় ছয় মাস ধরে এ কার্যক্রম চালানো হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে এসব বিদ্যালয়ে নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির প্রায় ৬ হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে কাজ শুরু করেন। সমাপনী দিনে নৈতিক মূল্যবোধ গঠনের কাজে সফল হওয়ায় ২৮ জন কর্মকর্তা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার দেওয়া হয়।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার রায়দাশবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা করছে। গত ২৯ মার্চ দুপুরে

আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পের উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, সততা ও সৎকাজের চর্চা উৎসাহিত করা। এ জন্য একটি বিশেষ দেয়াল বা স্থান রাখা, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের নৈতিক কাজ সম্পর্কে লিখে রাখবে। এটি একটি আকর্ষণীয় স্থান হবে, যেখানে সবাই স্বাস্থ্যকর ও নৈতিক পরিবেশ পাবে। তারা অন্যদের ভালো কাজের প্রশংসা করতে পারবে।

গত ২৯ মার্চ সততার পুরস্কার পাওয়া রায়দাশবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, পরিপাটি বিদ্যালয়টির শ্রেণিকক্ষের বারান্দায় শিক্ষণীয় দৃশ্য আঁকা। শিক্ষার্থীরাও সুশৃঙ্খল। প্রত্যেকের বই-খাতার মধ্যে আছে একটি করে ‘ভালো কাজের’ খাতা। সেই খাতায় লেখা প্রতিদিনের ভালো কাজ।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফুয়াদ হাসান জানায়, ‘আমি প্রতিদিন ভালো কাজ করে খাতায় লিখছি। বাবা-মা ও শিক্ষকেরা আমাদের খাতাগুলো দেখেন।’ ছাত্রী জান্নাতুল মাওয়া জানায়, ‘শিক্ষকেরা আমাদের সব সময় ভালো কাজ ও সত্য কথা বলতে শেখাচ্ছেন। অন্যায় ও কারও ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকতে বলেন। মানুষের উপকার করতে বলেন। আমরা তা মেনে চলছি।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহজাদী হাবিবা সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর থেকে শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে সব শিক্ষক মিলে কাজ শুরু করি। নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সত্য কথা বলা, প্রতারণা না করা, নিজের কাজে স্বচ্ছ থাকা, কেউ না দেখলেও সঠিক কাজটি করা, অন্যের অনুভূতি বুঝতে শেখা, সবার সঙ্গে উদার আচরণ করা, স্কুলের কাজ সময়মতো করতে শেখা, বাড়ির দায়িত্ব পালন করতে শেখা ও রুটিন মেনে চলার অভ্যাস করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। গত ছয় মাসে ফলও পাওয়া গেছে। তারা শিক্ষকদের পরামর্শ মেনে চলছে। ভালো কাজের খাতা দেখলেই প্রমাণ পাওয়া যায়। এই উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।’

সততার পুরস্কার পাওয়া আরও কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে। এর মধ্যে পলাশবাড়ী উপজেলার কাশিয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক সততার পুরস্কার পেয়েছেন। এখানে ২৬১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বেশির ভাগের মধ্যেই নৈতিকতা তৈরি হয়েছে। তারা মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার রায়দাশবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সবকিছু সাজানো গোছানো। শিক্ষার্থীরাও সুশৃঙ্খল। গত ২৯ মার্চ দুপুরে

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী হুমায়রা তাবাসুম জানায়, ‘আগে রাস্তা দিয়ে চলার সময় কলার খোসা ও বড় ইটের টুকরো পড়ে থাকতে দেখলেও সরাইনি। এখন শিক্ষকদের কাছে জেনে ভালো কাজগুলো করছি।’

কাশিয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা প্রশিক্ষণের পর বিদ্যালয়ের অ্যাসেম্বলি ও পাঠদানের সময় শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে নানা পরামর্শ দিচ্ছি। এতে করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবর্তন এসেছে।’

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ বালিকা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে দুজন সততার পুরস্কার পেয়েছে। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন বলেন, মোট ২১৫ জন শিক্ষার্থীর বেশির ভাগের মধ্যে এখন পরিবর্তন এসেছে। নৈতিকতার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা অনেকটা সমৃদ্ধ হয়েছে। তারা এখন সত্য কথা বলা ও ভালো কাজ করছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষণ চন্দ্র কুমার দাস প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার্থীরা এখন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক না থাকলেও চিৎকার-চেঁচামেচি করে না। কাউকে না বলে কারও জিনিসে হাত দেয় না। অথচ এসব নিয়ে আগে প্রায় প্রতিদিনই শাসন করতে হতো। এই উদ্যোগটি অব্যাহত থাকলে শিক্ষার্থীরা অবশ্যই নৈতিক ও মানবিক আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।’