প্রতিবার ভোট এলে প্রচারণার কারণে সরগরম হয়ে ওঠে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার চা–বাগানগুলো। বাগানের কাঁচা-পাকা রাস্তার দুপাশে শোভা পায় নানা প্রার্থীর পোস্টার, অলিগলিতে ভেসে আসে নির্বাচনী গান আর মাইকিংয়ের শব্দ। তবে প্রচারণার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের বিধিনিষেধের কারণে এবারের চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন।
পোস্টার লাগানো নিষিদ্ধ থাকায় চা-বাগানগুলোয় নেই চেনা নির্বাচনী আমেজ। মাইকিংও আগের মতো নেই। ফলে ভোট আসছে—এ খবরই যেন ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না শ্রমিকদের কাছে। অথচ এই চা-বাগানগুলোর শ্রমিকেরাই এই আসনের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের বড় নিয়ামক।
দীর্ঘদিন ধরে ‘নৌকার ভোটার’ হিসেবে পরিচিত এই চা-শ্রমিকেরা টানা সাতবার সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুস শহীদকে বিজয়ী করেছিলেন। এবার নৌকা না থাকায় অন্য দলের প্রার্থীরা তাঁদের সমর্থন পেতে শুরু করেছেন নতুন করে দৌড়ঝাঁপ।
শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজার-৪ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৫৮ জন। এর মধ্যে লক্ষাধিক ভোটার চা-শ্রমিক। এই বিপুল ভোটই বদলে দিতে পারে নির্বাচনের ফলাফল।
গতকাল সোমবার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া, ভুড়ভুড়িয়া, খাইছড়া ও ফুলছড়া চা-বাগানসহ কয়েকটি বাগান ঘুরে দেখা গেছে, হাতে গোনা দু–একজন প্রার্থীর ব্যানার ঝুলছে। তবে সেগুলো চোখে পড়ার মতো নয়। কোথাও নেই আগের মতো উৎসাহ বা উত্তেজনা।
ভুড়ভুড়িয়া চা-বাগানের বাসিন্দা নারায়ণ পাশী আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘এবার পোস্টার না থাকায় বোঝাই যায় না ভোট আইছে। দুই-একটা ব্যানার ছাড়া কিছুই নাই। মাইকিংও খুব কম। কোনো আমেজ নাই। তবে ভোটের দিন সবাই ভোট দিতে যাব।’
একই বাগানের নারী শ্রমিক মিনা পাশীর কণ্ঠে উঠে আসে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার গল্প। তিনি বলেন, ‘ভোটের আগে কত নেতা আসে, কত কথা বলে। কত স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু ভোট শেষ হইলে আর কেউ খোঁজ নেয় না। সবার জীবনে ভালো দিন এলেও আমাদের জীবনে সুদিন আসে না। আমরা প্রতিবার ভোট দিই, আমাদের ভোটেই সবাই নেতা হয়, কিন্তু আমাদের দিকে কেউ তাকায় না। এবার আমরা এমন মানুষকেই ভোট দিতে চাই, যে সংসদে গিয়ে আমাদের কথা বলবে, আমাদের কষ্টের কথা তুলবে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন চা-শ্রমিক নেতা বলেন, ‘আমরা সারা জীবন নৌকায় ভোট দিয়েছি। কিন্তু এতবার জিতিয়েও আমাদের জীবন বদলায়নি। এখনো মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। এবার অনেক প্রার্থী এসেছে। আমরা আর শুধু মার্কা দেখে ভোট দেব না। দেখে, শুনে, বুঝে যোগ্য মানুষকেই ভোট দেব।’
এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব), জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী প্রীতম দাশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী নূরে আলম হামিদী, জাতীয় পার্টির প্রার্থী জরিফ হোসেন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ)প্রার্থী আবুল হাসান এবং স্বতন্ত্র (বিএনপি বিদ্রোহী) প্রার্থী মহসিন মিয়া ওরফে মধু মিয়া।