
কেউ আসেন ট্রেজারি শাখায়, কেউ নকলখানায়; কেউ এজলাসে হাজিরা দিতে, আবার কেউ মামলার নথিপত্রের খোঁজে। প্রতিদিন নানা কাজে কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনে ভিড় করেন অন্তত তিন হাজার মানুষ। অথচ আদালত ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ছাদ থেকে খসে পড়ছে কংক্রিট ও পলেস্তারা। কলাম-পিলারে দেখা দিয়েছে মারাত্মক ফাটল। আর এমন দশার মধ্যেই বিচারক, আইনজীবী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চালাতে হচ্ছে নিয়মিত দাপ্তরিক কার্যক্রম।
বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে এই বিচারকদেরও অবস্থান করতে হয় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই। এ ছাড়া আইনজীবী, তাঁদের সহায়ক কর্মী এবং আদালতে আসা হাজারো মানুষকে প্রতিদিন এই আতঙ্ক মাথায় নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
সম্প্রতি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনে গেলে কথা হয় আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে। একটি মামলার সাক্ষ্য দিতে আদালতে এসেছিলেন কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুলের কৃষক আবদুর গণি। তিনি বলেন, ‘আদালতে পা রাখলেই মনে হয় এই বুঝি মাথার ওপর ছাদ ভেঙে পড়বে। পিলারের যে অবস্থা, যেকোনো দিন বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। ছাদচাপা পড়ে মানুষ মারা গেলে পরিবারের কী হবে।’
আদালত ভবন ঘুরে দেখা যায়, একটি-দুটি নয়, প্রায় সব কটি কলাম ও পিলারে বড় বড় ফাটল ধরেছে। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে জং ধরা লোহার রড। কোথাও দেয়ালের পলেস্তারা সম্পূর্ণ উঠে গেছে, কোথাও আবার ছাদ থেকে কংক্রিট খসে পড়ছে। এমনকি প্রশাসনিক কর্মকর্তার মাথার ওপরের ছাদ থেকেও পলেস্তারা খসে পড়ার বড় বড় ক্ষত তৈরি হয়েছে।
আদালত ভবন ঘুরে দেখা যায়, একটি-দুটি নয়, প্রায় সব কটি কলাম ও পিলারে বড় বড় ফাটল ধরেছে। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে জং ধরা লোহার রড। কোথাও দেয়ালের পলেস্তারা সম্পূর্ণ উঠে গেছে, কোথাও আবার ছাদ থেকে কংক্রিট খসে পড়ছে। এমনকি প্রশাসনিক কর্মকর্তার মাথার ওপরের ছাদ থেকেও পলেস্তারা খসে পড়ার বড় বড় ক্ষত তৈরি হয়েছে।
এমন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলছে বিচারিক কার্যক্রমের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী (দ্রুত বিচার) আদালত, প্রশাসনিক শাখা, রেকর্ড রুম, সেরেস্তা, ট্রেজারি, এজলাস এবং নকল সরবরাহকারী শাখার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কাজ। ভবনের দুই পাশে রয়েছে দুটি ক্যানটিনও।
সরকারি তথ্যমতে, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অধীনে বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, দুজন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও চারজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বিচারকাজ পরিচালনা করছেন।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের বাধ্য হয়ে যাতায়াত এবং বিচারকাজ পরিচালনার বিষয়টিকে মানবাধিকারের বড় লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন অধিকারকর্মীরা। হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স ফোরাম কক্সবাজার শাখার সভাপতি ও আইনজীবী আবদুস শুক্কুর বলেন, নাগরিকদের জীবন ও নিরাপত্তার অধিকার রাষ্ট্রের নিশ্চিত করার কথা। কিন্তু বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার চাইতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জরাজীর্ণ ভবনে আসা-যাওয়া করছেন। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটার আগেই জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী সমাধান দরকার।
শহরের নুনিয়ারছড়ার বাসিন্দা আজগর আলী বলেন, নকলখানার সার্টিফিকেট তুলতে এসে দেখি দেয়াল ফাটা আর পলেস্তারা খসে পড়ছে। ভয়ে ভয়ে কাজ সেরে দ্রুত বের হয়ে আসি। বিচারপ্রার্থী মানুষের নিরাপত্তার কিছু নেই।
ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে উৎকণ্ঠায় থাকেন আইনজীবী ও বিচারকেরা। বিচারপ্রার্থীরাও ঝুঁকি নিয়ে আসেন ন্যায় বিচার চাইতে। কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান বলেন, ঝুঁকি জেনেই আইনজীবীদের কাজ করতে হয়। বিচার চাইতে এসে মানুষকে কেন ঝুঁকিতে পড়তে হবে, এমন প্রশ্ন করেন তিনি। তিনি বলেন, ঝুঁকি কাটাতে এখানে দ্রুত একটি আধুনিক জুডিশিয়াল কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ করা দরকার।
ভবনটির বেহাল দশা ও ঝুঁকির বিষয়টি একাধিকবার উঠে এসেছে সরকারি নথিপত্রেও। গত ১ ফেব্রুয়ারি গণপূর্ত বিভাগের কক্সবাজার নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো এক চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ভবনটি ব্যবহার অনুপযোগী ও ঝুঁকিপূর্ণ।
নথি অনুযায়ী, ১৯৫২ সালে নির্মিত এই ভবনটি দীর্ঘকাল কক্সবাজার জেলা আদালত ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পরবর্তী সময়ে জেলা জজ আদালতের নতুন ভবন নির্মাণের পর ২০০৯ সাল থেকে এটি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ৭ দশকেরও বেশি পুরোনো এই ভবনে বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার জোড়াতালি দিয়ে সংস্কার করা হলেও তা টেকসই হয়নি। মাঝেমধ্যেই ছাদ থেকে কংক্রিট-পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনা ঘটছে। ভূমিকম্প হলে ভবনটি ধসে পড়াও ঝুঁকি আছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) ২০২০ অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলা সিসমিক জোন-৩-এর অন্তর্ভুক্ত। এ কারণে ভবনটিতে যেকোনো সময় ভূমিকম্পজনিত বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কার কথাও চিঠিতে উল্লেখ করেছে গণপূর্ত বিভাগ।
আদালত ও গণপূর্ত বিভাগ সূত্র জানায়, ঝুঁকি এড়াতে পুরোনো ভবন সংস্কারের পাশাপাশি একটি বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালের ৪ জুন এই জরাজীর্ণ ভবনের পরিবর্তে ৬ হাজার বর্গফুটের একটি অস্থায়ী টিনশেড সেমিপাকা ভবন নির্মাণের জন্য প্রশাসনিক অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ চেয়ে প্রাক্কলন পাঠানো হয়। কিন্তু প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রস্তাব আলোর মুখ দেখেনি।
বিকল্প ভবন নির্মাণের এই উদ্যোগের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, ভবনটি ব্রিটিশ আমলের হওয়ায় দীর্ঘদিনের ব্যবহারে এর ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। ২০২৩ সালে জেলা জজ বরাবর একটি প্রাক্কলন পাঠানো হয়েছিল, বর্তমানে সেটি কত দূর এগিয়েছে, তা তাঁর জানা নেই। তবে চলতি অর্থবছরে দুটি কক্ষ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ পাওয়া গেছে।