
চলতি বছর ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়টির নিজস্ব শিক্ষার্থী আছে মাত্র ১২৫ জন।
ময়মনসিংহ নগরীর রামবাবু রোডে ১৮৮৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় সিটি কলেজিয়েট স্কুল। একসময়ের নামকরা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করেছেন অনেক কৃতী শিক্ষার্থী। তবে ১৪৩ বছরের পুরোনো এই বিদ্যালয়ে এখন হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে পাঠদান চলছে। বিদ্যালয়টির এমপিও (মান্থলি পে অর্ডার) টিকিয়ে রাখতে অনুমোদনবিহীন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাগজপত্রে নিজেদের শিক্ষার্থী দেখিয়ে বেতন তুলছেন শিক্ষকেরা।
৩, ৭ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নগরের রামবাবু রোডে অবস্থিত বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের কোলাহল নেই। শ্রেণিকক্ষগুলো প্রায় শিক্ষার্থীশূন্য; বেঞ্চগুলোতে ধুলার আস্তরণ জমেছে। বিদ্যালয়টির দুপাশ দোকানপাটে ঘেরা।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এখানে বর্তমানে ১৫ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন। প্রধান শিক্ষকের পদটি শূন্য থাকায় সহকারী প্রধান শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া নিয়মিত কর্মচারী আছেন ছয়জন এবং একজন খণ্ডকালীন কর্মচারী।
৩ সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে অবস্থান করে দেখা গেছে, ষষ্ঠ শ্রেণির ক্লাসে ১৫ জন এবং সপ্তম শ্রেণিতে ১৫ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত। তবে অষ্টম শ্রেণিতে উপস্থিত ছিল মাত্র পাঁচজন। নবম শ্রেণিতে ছয়জন এবং দশম শ্রেণিতে মাত্র তিনজন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পাওয়া যায়। ৭ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়টির দশম শ্রেণিতে ৬ জন, নবম শ্রেণিতে ৯ জন, অষ্টম শ্রেণিতে ৬ জন, সপ্তম শ্রেণিতে ১৮ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে ২১ জন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পাওয়া যায়। ১৩ সেপ্টেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গিয়েও একই রকম উপস্থিতি দেখা যায়।
হাতে-কলমে শিক্ষা দিতে আমাদের সংকট নেই, ল্যাব যথেষ্ট স্বয়ংসম্পূর্ণ। তবে কম শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস নেওয়াটা মনস্তাত্ত্বিকভাবে কষ্টদায়ক। এই বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী কর্মজীবী পরিবারের এবং অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণেই উপস্থিতি কম।শামছুন্নাহার বেগম, বিদ্যালয়টির বিজ্ঞানের শিক্ষক
অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মাহমুদুল হাসান এ বছরই বিদ্যালয়টিতে ভর্তি হয়েছে। স্কুলে শিক্ষার্থী যে এত কম, তা জানা ছিল না তার। সে বলে, ‘ভেবেছিলাম অনেক সহপাঠী পাব। কিন্তু এসে দেখি ক্লাসে শিক্ষার্থী নেই বললেই চলে। আমাদের ক্লাসে মোট ১২ জন আছে। আমরা চাই স্কুলে আরও শিক্ষার্থী বাড়ুক; অল্প কয়েকজন থাকায় কোনো প্রতিযোগিতা হয় না।’
বিদ্যালয়টির বিজ্ঞানের শিক্ষক শামছুন্নাহার বেগম বলেন, ‘হাতে-কলমে শিক্ষা দিতে আমাদের সংকট নেই, ল্যাব যথেষ্ট স্বয়ংসম্পূর্ণ। তবে কম শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস নেওয়াটা মনস্তাত্ত্বিকভাবে কষ্টদায়ক। এই বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী কর্মজীবী পরিবারের এবং অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণেই উপস্থিতি কম।’
‘প্রক্সি’ শিক্ষার্থী
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি শ্রেণিতে ৫৫ জন শিক্ষার্থী থাকতে হবে। তবে বিদ্যালয়টি থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, নীতিমালা অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার্থী নেই সিটি কলেজিয়েট স্কুলে। তবে এমপিও টিকিয়ে রাখতে অনুমোদনবিহীন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই বিদ্যালয়ের ‘প্রক্সি’ শিক্ষার্থী হিসেবে দেখিয়ে প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
চলতি বছর বিদ্যালয়টি থেকে ৯৮ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৪১ জন পাস করেছে দেখানো হয়। এর মধ্যে বিদ্যালয়টির নিজস্ব শিক্ষার্থী ছিল মাত্র ১৯ জন।
বিদ্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত নিজস্ব শিক্ষার্থী আছে ১২৫ জন। যদিও নিবন্ধিত শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে ৩৮৮ জন। বিদ্যালয়টিতে চলতি বছর ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৪৬ জন, সপ্তম শ্রেণিতে ২৬ জন, অষ্টম শ্রেণিতে ১৩ জন, নবম শ্রেণিতে ১৯ জন ও দশম শ্রেণিতে ২১ জন নিজস্ব শিক্ষার্থী আছে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। এর আগে ২০২৫ সালে ১২৫ জন নিজস্ব শিক্ষার্থী থাকলেও নিবন্ধনে দেখানো হয় ৩৫২ জন। ২০২৪ সালে নিজস্ব শিক্ষার্থী ৮৫ জন থাকলেও নিবন্ধনে দেখানো হয় ৩৯২ জন।
চলতি বছর বিদ্যালয়টি থেকে ৯৮ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৪১ জন পাস করেছে দেখানো হয়। এর মধ্যে বিদ্যালয়টির নিজস্ব শিক্ষার্থী ছিল মাত্র ১৯ জন।
শিক্ষার্থী বাড়াতে শিক্ষকদের নিয়মিত তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করতে বলা হচ্ছে। শিক্ষকেরা আমাদের জানিয়েছেন, তাঁরা শিক্ষার্থী বাড়াতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।মোহছিনা খাতুন, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা
শিক্ষকেরা জানান, প্রক্সি শিক্ষার্থীরা নগরের শম্ভুগঞ্জ এলাকার পাঠদান অনুমতিবিহীন মদিনানগর মডেল স্কুল ও সূর্যসেনা মডেল স্কুলের শিক্ষার্থী। ক্যাডেট কোচিং করে, এমন অনেক শিক্ষার্থীকেও এই বিদ্যালয়ে কাগজপত্রে ভর্তি দেখানো হয়। পাঠদানের অনুমতি না থাকায় এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ানোর জন্য কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি দেখানো হয়।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, আগের প্রতিষ্ঠানপ্রধান এই কাজ করেছেন। তিনি ২০২৪ সালে যোগদানের পর থেকে বাইরের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কাগজপত্রে দেখাচ্ছেন না বলে দাবি করেন।
ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়ে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার্থী না থাকার বিষয়ে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহছিনা খাতুন বলেন, ‘শিক্ষার্থী বাড়াতে শিক্ষকদের নিয়মিত তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করতে বলা হচ্ছে। শিক্ষকেরা আমাদের জানিয়েছেন, তাঁরা শিক্ষার্থী বাড়াতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।’
সংকটের নেপথ্যে
বিদ্যালয় সূত্র জানায়, ২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মো. শহীদুল্লাহ খান অবসরে যাওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের চেয়ার নিয়ে দ্বন্দ্বের শুরু হয়। এরপর পরিচালনা কমিটির একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও আর্থিক অনিয়মের কারণে সুনাম হারাতে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। তৎকালীন কমিটি রেজোল্যুশন ছাড়াই ফান্ডের প্রায় ৮ লাখ ৮৭ হাজার টাকা তুলে নেয়। এ নিয়ে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটে।
শিক্ষার্থী বাড়াতে শিক্ষকেরা বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন, অভিভাবক সমাবেশ করছেন। নিয়মিত সাপ্তাহিক ও মাসিক পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। নতুন শিক্ষার্থীও ভর্তি হচ্ছে।মো. আবদুল মান্নান, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক
বিদ্যালয়টিতে ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ২০০৪ সালে যোগদান করেন। তিনি বলেন, আগের জটিলতা তেমন প্রভাব না ফেললেও ২০১২ সালে টি আই এম বদরুদ্দৌলা প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। নানা প্রেক্ষাপটে তখন থেকেই শিক্ষার্থী কমতে শুরু করে। বর্তমান শিক্ষকেরা এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের চেষ্টা করছেন বলে দাবি করেন তিনি।
পরিস্থিতি উন্নয়নের চেষ্টা
২০২৪ সালের মার্চ থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে আছেন মো. আবদুল মান্নান। তিনি বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার সময় আটজন খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় চালানো হতো বলে জানান। তিনি বলেন, গত বছর সাতজন শিক্ষক যোগ দেন। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে শিক্ষক ভাগ করে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিদ্যালয়টি শহরের প্রাণকেন্দ্রে হলেও এর কার্যক্রম আমি কোনো দিন লক্ষ করিনি। এ বিদ্যালয় নিয়ে আমারও জানার আগ্রহ আছে।অধ্যাপক এনামুল হক, ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের সচিব
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে বর্তমানে শিক্ষার্থী উপস্থিতি তুলনামূলক ভালো। তবে অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী কম। আগের কয়েক বছরের অব্যবস্থাপনা ও তদারকির ঘাটতির কারণে এসব শ্রেণিতে শিক্ষার্থী কমেছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর দাবি, শিক্ষার্থী বাড়াতে শিক্ষকেরা বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন, অভিভাবক সমাবেশ করছেন। নিয়মিত সাপ্তাহিক ও মাসিক পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। নতুন শিক্ষার্থীও ভর্তি হচ্ছে।
ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এনামুল হক বলেন, ‘বিদ্যালয়টি শহরের প্রাণকেন্দ্রে হলেও এর কার্যক্রম আমি কোনো দিন লক্ষ করিনি। এ বিদ্যালয় নিয়ে আমারও জানার আগ্রহ আছে। ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে আমাদের কী করণীয়—সে বিষয়ে আমরা পদক্ষেপ নেব।’