কোরবানির ঈদে ঘরে কী আয়োজন হবে সে আলাপে ব্যস্ত ছিলেন এই রোহিঙ্গা নারীরা। একই সঙ্গে করছিলেন মিয়ানমারে ঈদ উদ্‌যাপনের স্মৃতিচারণ। গতকাল টেকনাফের লেদা আশ্রয়শিবিরে
কোরবানির ঈদে ঘরে কী আয়োজন হবে সে আলাপে ব্যস্ত ছিলেন এই রোহিঙ্গা নারীরা। একই সঙ্গে করছিলেন মিয়ানমারে ঈদ উদ্‌যাপনের স্মৃতিচারণ। গতকাল টেকনাফের লেদা আশ্রয়শিবিরে

কোরবানির আনন্দ যেন শুধুই স্মৃতি, কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরে যেভাবে কাটছে রোহিঙ্গাদের ঈদ

দুই পাশে বাঁশ আর ত্রিপল দিয়ে গড়ে তোলা ছোট ছোট ঘর। মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে সরু গলি। সেই গলির ভেতরে আলাপে ব্যস্ত রয়েছেন পাঁচ রোহিঙ্গা নারী। আলাপের বিষয় ঈদুল আজহার আয়োজন। কোরবানি যে দিতে পারবেন না, সে কথায় ঘুরেফিরে বারবার উঠে আসছিল তাঁদের আলাপে। একই সঙ্গে বর্তমান দুর্দশার কথা উল্লেখ করে অতীতের দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করছিলেন ওই নারীরা।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার লেদা রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে (ক্যাম্প-২৪) গিয়ে দেখা হয় এই পাঁচ নারীর সঙ্গে। আলাপে ব্যস্ত থাকা নারীদের একজন রহিমা খাতুন (৫৫)। এবার ঈদুল ফিতরে ঘরে যে কোনো আয়োজন নেই, সেই কথা বলতে গিয়ে চোখ ছলছল হয়ে উঠে তাঁর।

রহিমা খাতুন রোহিঙ্গা ভাষায় যা বলেন তাঁর অর্থ দাঁড়ায়, কোরবানির ঈদ আসতে একটিমাত্র দিন বাকি। দেশে (মিয়ানমারে) যখন ছিলাম, এই দিনগুলোয় দম ফেলার ফুরসত থাকত না। নারীরা সবাই রাতভর চালের গুঁড়া দিয়ে পিঠা বানাতেন। পশু কোরবানি দিয়ে মাংস আর রুটি কীভাবে প্রতিবেশীদের খাওয়াবেন, সেই চিন্তায় অস্থির থাকতেন। এখন আশ্রয়শিবিরে মাংসও নেই, রুটি বানানোর তাড়াও নেই। ভিনদেশের মাটিতে রোহিঙ্গাদের কাছে ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে।

ক্যাম্প ইনচার্জদের তত্ত্বাবধানে আশ্রয়শিবিরের মাঝিদের (রোহিঙ্গা নেতা) মাধ্যমে ঈদের দিন সকালে রোহিঙ্গাদের ঘরে ঘরে মাংস বণ্টন করা হবে। পশু জবাই শেষে সব বর্জ্য দ্রুত অপসারণ করা হবে। পশুর চামড়া বিভিন্ন এতিমখানায় বিনা মূল্যে বিতরণ করা হবে।
মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার

লেদা আশ্রয়শিবিরের অবস্থান কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে। এই শিবিরে ২৭ হাজার রোহিঙ্গার বসতি। এর মধ্যে অন্তত ১৯ হাজার নারী-শিশু। যাঁদের বেশির ভাগই ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। আশ্রয়শিবিরে বাঁশের খুঁটি আর ত্রিপল দিয়ে গড়ে তোলা খুপরিতে তাঁদের দিন কাটছে। ঈদও যেন তাঁদের কাছে আনন্দের কোনো বার্তা নিয়ে আসে না। বরং তা হয়ে উঠেছে ফেলে আসা সচ্ছল জীবনের দুঃখগাথা এক দীর্ঘশ্বাস। টেকনাফের কেবল এই আশ্রয়শিবিরটি নয়, বাংলাদেশে অবস্থান করা প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গারই অনেকটা একই দশা।

এক কেজি করে মাংস পাবে ২ লাখ পরিবার

উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে আড়াই লাখ রোহিঙ্গা পরিবারের বসবাস। এবারের ঈদুল আজহার দিন প্রায় ২ লাখ পরিবারকে দেওয়া হবে এক কেজি করে কোরবানির পশুর মাংস। গত বছর ১ লাখ ২০ হাজার পরিবারকে দেড় কেজি করে মাংস দেওয়া হয়েছিল। এবার ৪০টির বেশি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) দেওয়া প্রায় ২ হাজার পশু জবাই করে রোহিঙ্গা পরিবারগুলোয় বণ্টন করে দেবে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয়। ইতিমধ্যে ক্যাম্প ইনচার্জরা পশু জবাই ও মাংস বণ্টনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছেন।

বেশির ভাগই ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। আশ্রয়শিবিরে বাঁশের খুঁটি আর ত্রিপল দিয়ে গড়ে তোলা খুপরিতে তাঁদের দিন কাটছে। ঈদও যেন তাঁদের কাছে আনন্দের কোনো বার্তা নিয়ে আসে না। বরং তা হয়ে উঠেছে ফেলে আসা সচ্ছল জীবনের দুঃখগাথা এক দীর্ঘশ্বাস।

জানতে চাইলে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আশ্রয়শিবিরে বিভিন্ন সেবা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত অনেক এনজিওর তহবিলসংকটে রয়েছে। এ কারণে এবার কোরবানির পশুর সংখ্যা কমে গেছে। গত বছর দেড় কেজি করে মাংস বিতরণ করা হয়েছিল। এবার উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩ আশ্রয়শিবিরে থাকা ২ লাখ রোহিঙ্গা পরিবারে এক কেজি করে মাংস দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘ক্যাম্প ইনচার্জদের তত্ত্বাবধানে আশ্রয়শিবিরের মাঝিদের (রোহিঙ্গা নেতা) মাধ্যমে ঈদের দিন সকালে রোহিঙ্গাদের ঘরে ঘরে মাংস বণ্টন করা হবে। পশু জবাই শেষে সব বর্জ্য দ্রুত অপসারণ করা হবে। পশুর চামড়া বিভিন্ন এতিমখানায় বিনা মূল্যে বিতরণ করা হবে।’

টেকনাফের লেদা আশ্রয়শিবিরের আটটি পরিবারের জন্য এই গরুটি কিনে দিয়েছেন এক যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রোহিঙ্গা। গতকাল বিকেলে তোলা

গরু ‘হাদিয়া’পেয়েছেন কেউ কেউ

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে লেদা আশ্রয়শিবিরে গিয়ে দেখা গেছে, সোয়া তিন মণ ওজনের একটি গরু ১ লাখ ২৩ হাজার টাকায় কিনে এনেছেন আবদুর শরিফ (৪৫) নামের এক বাসিন্দা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আটটি রোহিঙ্গা পরিবারের জন্য ‘হাদিয়া’(উপহার) হিসেবে গরুটি কিনে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী একজন রোহিঙ্গা। মো. হাসান নামের ওই ব্যক্তির পাঠানো টাকায় গতকাল সকালে টেকনাফের বাজার থেকে গরুটি কেনা হয়েছে। মাংস ভাগাভাগি করে পরিবারগুলো পাবে।

একই আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা মোহাম্মদ নুর ( ৫০) খারাংখালীর বাজার থেকে ৬৩ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছেন ছোট একটি গরু। তিনি বলেন, কয়েকটি রোহিঙ্গা পরিবার মিলে গরুটি কেনা হয়েছে। ঈদের দিন সকালে গরুটি কোরবানি দেওয়া হবে।

আশ্রয়শিবিরের ই-৭ ব্লকের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম (৫৫) বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে থাকতে তিনি নিজেই প্রতিবছর ৪-৫ মণ ওজনের গরু কোরবানি দিতেন। টেকনাফের আশ্রয়শিবিরে আসার পর আট বছরে এককভাবে পশু কোরবানি দিতে পারেননি। গত বছর সাতজন মিলে গরু কোরবানি দিয়েছেন। এবার অর্থসংকটে তাও সম্ভব হচ্ছে না।

লেদা আশ্রয়শিবির ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান ও রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ আলম (৫৫) বলেন, খাদ্যসহায়তা কমে যাওয়ায় অনেক রোহিঙ্গা দিশা হারিয়ে ফেলেছেন। আয়রোজগারের বিকল্প ব্যবস্থাও রোহিঙ্গাদের নেই। মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, দুবাই, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে তাঁদের যেসব আত্মীয়স্বজনেরা থাকেন, তাঁদের পাঠানো টাকায় মুষ্টিমেয় পরিবার গরু কিনে কোরবানি দিতে পারছে। তিনি বলেন, ‘ঈদের দিন চালের রুটি দিয়ে মাংস খাওয়া এটি রোহিঙ্গাদের ঐতিহ্য। এবার কারও ঘরে মাংস জুটবে তো রুটি জুটবে না, কারও ঘরে রুটি থাকলে মাংস থাকবে না—এমনই দশা।’

রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, ২০১৮ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত আশ্রয়শিবিরের ১২ লাখ রোহিঙ্গার জন্য ঈদুল আজহায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার গরু-মহিষ-ছাগল কিনে দিত বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা। এখন রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১৫ লাখে দাঁড়ালেও পশু দেওয়া হচ্ছে দুই হাজারের মতো।