
লক্ষ্মীপুরে ভোটের অবৈধ ছয়টি সিল উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার প্রিন্টিং প্রেসের মালিক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গতকাল বুধবার বিকেলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় এ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এ সময় তিনি ভোটের সিল তৈরির নির্দেশদাতার নাম প্রকাশ করেন।
স্বীকারোক্তি দেওয়া আসামির নাম সোহেল রানা (৪০)। তিনি সদর উপজেলার টুমচর ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং মারইয়াম প্রেসের স্বত্বাধিকারী।
গত মঙ্গলবার বিকেলে শহরের পুরোনো আদালত রোডের মারইয়াম প্রেস থেকে ভোটে ব্যবহারের অবৈধ ছয়টি সিল, একটি কম্পিউটার, একটি মুঠোফোনসহ সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওয়াহেদ পারভেজ স্বীকারোক্তি দেওয়ার বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর নেতা সৌরভ হোসেন ওরফে শরীফের নির্দেশে এসব সিল তৈরি করা হয়েছে বলে সোহেল রানা আদালতকে জানিয়েছেন। গত ৩০ জানুয়ারি তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে সিলগুলো তৈরির অর্ডার দেন শরীফ। এরপর তিনি সিলগুলো বানান।’
স্বীকারোক্তিতে উল্লেখ করা সৌরভ হোসেন ওরফে শরীফ (৩৪) পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মো. শাহজাহানের ছেলে। তিনি ওই ওয়ার্ডের জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি। এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকে তিনি আত্মগোপনে আছেন।
এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর সৌরভ হোসেনকে বহিষ্কার করেছে জামায়াতে ইসলামী। তাঁর বিরুদ্ধে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
জানতে চাইলে জেলা জামায়াতের আমির এস ইউ এম রুহুল আমিন ভূঁইয়া বলেন, ‘ঘটনার পরপরই আমরা সৌরভকে দল থেকে বহিষ্কার করেছি। তিনি ভোটারদের ‘‘ভোট দেওয়া’’ শেখানোর জন্য নাকি সিলগুলো তৈরি করেছেন। তবে এটা দায়িত্বহীন কাজ। এ ছাড়া যার দোকান থেকে সিল উদ্ধার হয়েছে, তিনি আমাদের দলের কেউ নন।’
এর আগে গত মঙ্গলবার বিকেলে ভোটের সিলসহ সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর ওই দিনই উদ্বেগ প্রকাশ করে লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি সংবাদ সম্মেলন করেন। নিজের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘সিলসহ সোহেল রানা নামে যাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তিনি জামায়াতের কর্মী বলে জানতে পেরেছি। হয়তো তাঁর পদ-পদবিও আছে। একটি কম্পিউটারসহ ছয়টি সিল জব্দ করা হয়েছে। সিলগুলো যিনি বা যাঁরা বানিয়েছেন, নিশ্চয়ই এর পেছনে অনেক কলকবজা আছে, একটা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের হিসাব-নিকাশ আছে।’
বিএনপির সংবাদ সম্মেলনের পর একই দিন রাত ১০টার দিকে লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে জামায়াতে ইসলামী। এতে লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী রেজাউল করিম বলেন, ‘ভোটের সিলসহ গ্রেপ্তার ব্যক্তির সঙ্গে জামায়াতকে জড়িয়ে বিএনপি মিথ্যাচার করছে।’
পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, উদ্ধার হওয়া সিলের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এ ঘটনায় দুটি দিককে সামনে রেখে তদন্ত চলছে। প্রথমত, এসব সিল ভোটারদের প্রশিক্ষণ বা মহড়া দেওয়ার কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের দিন ব্যালট পেপারে সিল মারার মাধ্যমে ভোট কারচুপি বা কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আছে।
লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওয়াহেদ পারভেজ বলেন, ‘স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর সিল তৈরির পেছনের উদ্দেশ্য এবং আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে জব্দ করা আলামত পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’