দীপু দাশ
দীপু দাশ

সীতাকুণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু

দীপুর চিৎকার, ‘এখানে অনেক লোক মারা গেছে, সবাই দ্রুত আসেন’

দীপু দাশের বয়স ৩২ বছর। তিনি ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে কাটারম্যান সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। ১৪ আগস্ট ইয়ার্ডে জাহাজটি কাটার সময় ‘বিষাক্ত গ্যাসে’ আক্রান্ত হয়ে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বুধবার মারা যান আরও একজন। ঘটনার দিন দীপুও ওই জাহাজভাঙা কারখানায় ছিলেন।

‘এখানে অনেক লোক মারা গেছে, সবাই দ্রুত আসেন।’ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে ‘গ্যাসে আক্রান্ত’ হয়ে একের পর এক শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়ে যাওয়ার পর এভাবেই চিৎকার করছিলেন দীপু দাশ। তবে বিদঘুটে গন্ধের কারণে তিনি সামনে এগোতে পারেননি। চিৎকারের কিছুক্ষণ পর তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়েন।

দীপু দাশের বয়স ৩২ বছর। তিনি ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে কাটারম্যান সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। ১৪ আগস্ট ইয়ার্ডে জাহাজটি কাটার সময় ‘বিষাক্ত গ্যাসে’ আক্রান্ত হয়ে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বুধবার মারা যান আরও একজন। ঘটনার দিন দীপুও ওই জাহাজভাঙা কারখানায় ছিলেন।

দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে নেওয়া হয় দীপুকে। গত সোমবার হাসপাতাল থেকে তিনি বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি। এখনো তাঁর চোখের সামনে সহকর্মীদের মৃত্যুর দৃশ্য ভাসে। সেদিনের কথা মনে করে প্রায়ই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

দুর্ঘটনাকবলিত কারখানা থেকে মাত্র ৫০ মিটার দূরে দীপুর বাড়ি। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, টিনশেডের ছোট্ট ঘরের একটি কক্ষে শুয়ে আছেন দীপু। পাশের কক্ষে দেড় বছরের ছেলে ঋষি দাশকে নিয়ে বসে রয়েছেন স্ত্রী পূর্ণিমা দাশ। প্রতিবেদককে দেখে তিনিই দীপুকে ডেকে দেন।

বারান্দায় একটি চেয়ারে বসে সেদিনের ঘটনা বলছিলেন দীপু। তিনি জানান, সময় তখন সকাল সাড়ে ৮টা কি ৯টা। তাঁরা মোট সাতজন (চারজন কাটারম্যান ও তিনজন হেলপার) জাহাজটির ভেতরে কাজ করতে ঢোকেন। তাঁদের দলের বাইরে ফোরম্যান, সেফটি অফিসারসহ পাঁচজন ছিলেন।

‘দুর্ঘটনার চার দিন হাসপাতালে দৌড়াদৌড়িতে হাতে থাকা সব টাকাপয়সা খরচ হয়ে গেছে। বাড়ি ফেরার পর এক দিন কোনো রকম সংসার চলেছে। দুর্ঘটনার পর থেকে আমরা কোনো সহায়তা পাইনি।’
—পূর্ণিমা দাশ, আহত দীপু দাশের স্ত্রী

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে দীপু বলেন, ‘আমরা তিন ভাগে কাজ শুরু করি। আমি ও আমার ওস্তাদ পলাশ দাশ কাজ করছিলাম ঘটনাস্থল থেকে ১০ ফুট ওপরে। কিছুটা দূরে আরও দুজন কাজ করছিলেন। যে ট্যাংকের কাছে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেখানে গিয়েছিলেন নাসির ওস্তাদ ও তাঁর ভাই মনসুর ফোরম্যান। তাঁরা মূলত ব্যালাস্ট ট্যাংকে (জাহাজের জলাধার) থাকা পানি ছাড়তে যান। ট্যাংকটির পানি বের করার জন্য আগে একজন গিয়ে ছিদ্র করেছিলেন। পুরোপুরি পানি যাওয়ার ব্যবস্থা করতে ছিদ্রের মুখ খুলতেই মুহূর্তে নাসির দাঁড়ানো অবস্থা থেকে নিচে পড়ে যান। তাঁর কাছেই ছিল তাঁর ভাই মনসুর। ভাইকে উদ্ধারের চেষ্টা করতেই তিনিও পড়ে যান।’

এরপর পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বলে জানান দীপু। তিনি বলেন, ‘এরপর অন্যদের মধ্যে শোরগোল শুরু হয়। যে-ই যাচ্ছেন গ্যাসে আক্রান্ত হওয়া লোকদের উদ্ধার করতে, সে-ই অচেতন হয়ে পড়ে যাচ্ছেন।’

দীপু আরও বলেন, ‘পড়ে যাওয়া লোকদের মধ্যে একজন আমাদের এলাকার সানি দাশ। সানিকে পড়ে যেতে দেখে আমার ওস্তাদ (পলাশ) দ্রুত নেমে তাঁকে ধরতে যান। পেছন পেছন আমিও দৌড়ে যাই। ওস্তাদ সানির পোশাক ধরে টান দিতেই পড়ে গেলেন। এ সময় আমার নাকে বিদঘুটে একটা গন্ধ আসে। এতে মাথা ঝিম ধরে যায়। আমি সামনে না গিয়ে ওপরে উঠে চিৎকার শুরু করি। বলি, এখানে অনেক লোক মারা গেছে, সবাই দ্রুত আসেন।’

দীপু বলেন, ‘আমার চিৎকার শুনে চারদিক থেকে লোকজন ছুটে আসেন। পাশের জাহাজ থেকেও শ্রমিকেরা আসেন। যে যেদিক থেকে পেরেছেন, ভেতরে ঢুকে পড়েন। আমিও ঘটনাস্থল দেখানোর জন্য আবার ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করি। তখন মাথা ঘুরে পড়ে যাই। শুনেছি পরে আশপাশের লোকজন আমাকে এ কে খান এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল।’

দীপু বলেন, ‘ওই দিন বেলা ২টার দিকে আমার অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হয়। পরে বাড়ি চলে আসি। এসে শুনি আমার প্রতিবেশী নাসির, মনসুর, সানি এবং ওস্তাদ পলাশ মারা গেছেন। এর মধ্যে আমি আবার অসুস্থ হয়ে পড়ি। পরে নগরের আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালে আমাকে ভর্তি করা হয়। গত সোমবার আমাকে সেখান থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।’

ঘণ্টায় ৬০ টাকা মজুরিতে কাজ করতেন দীপু। প্রতি মাসের ৫ ও ২০ তারিখ তাঁদের মজুরি দেওয়া হতো। দীপু জানান, এখনো কাজে ফেরার মতো অবস্থা তাঁর হয়নি। দুর্ঘটনার পর হাসপাতালের খরচ কারখানা কর্তৃপক্ষ দিলেও এর বাইরে কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ বা আর্থিক সহায়তা তিনি পাননি। এমনকি তাঁর বকেয়া বেতনও দেওয়া হয়নি। চিকিৎসক ডাবসহ বিভিন্ন পথ্য খেতে বলেছেন। তবে টাকার অভাবে তা কিনতে পারছেন না।

বৃহস্পতিবার দীপুকে দেখতে তাঁর বাড়িতে এসেছিলেন ওই কারখানার কাটারম্যান সুলতান আহাম্মদ। তিনি জানান, ওই ট্যাংকটি কাটার কথা ছিল তাঁর। শুক্রবার হওয়ায় কাজে যাননি তিনি। সুলতান আহাম্মদ বলেন, যে ট্যাংকটি কাটা হচ্ছিল, সেটি ছিল ২ নম্বর ট্যাংক। এর আগে ১ নম্বর ট্যাংকের দুই-তৃতীয়াংশ কাটা শেষ হয়েছিল। এক মাস আগে ওই ট্যাংক কাটার সময়ও গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে তিনিসহ তিন শ্রমিক অসুস্থ হয়েছিলেন।

দীপুর স্ত্রী পূর্ণিমা দাশ বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষের পেশা মাছ ধরা। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে ওই পেশায় টিকতে না পেরে দীপু সেলুনে কাজ শেখেন। কয়েক বছর সেলুনের দোকান করে সংসার চালিয়েছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত উপার্জন না থাকায় ছয় বছর আগে দোকানটিও ছেড়ে দেন। এরপর ফেরদৌস স্টিলে কাটারম্যানের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন।

প্রতিবেশীদের কাছ থেকে বছর হিসেবে ভাড়া দিয়ে ছোট্ট একটি জায়গায় দুই কক্ষের টিনের ঘর করেছেন দীপু দাশ। সেখানে দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে সংসার তাঁর। বড় ছেলে অভিজিৎ দাশ পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে।

দীপুর স্ত্রী পূর্ণিমা বলেন, ‘দুর্ঘটনার চার দিন হাসপাতালে দৌড়াদৌড়িতে হাতে থাকা সব টাকাপয়সা খরচ হয়ে গেছে। বাড়ি ফেরার পর এত দিন কোনো রকম সংসার চলেছে। দুর্ঘটনার পর থেকে আমরা কোনো সহায়তা পাইনি। মালিকপক্ষের কোনো লোকজন আমাদের দেখতেও আসেনি। গতকাল এক আত্মীয় কিছু খাবার কিনে দিয়েছেন।’

জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আগামীকাল রোববার হতাহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ ও বকেয়া বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।