
তরুণ ও নবীন পেশাজীবীদের ক্যারিয়ার গঠনে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া সঠিক দিকনির্দেশনা অপরিহার্য। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই লিগ্যাসি তৈরির পথে থাকা সফল তরুণদের স্বপ্ন, শেখার অভিজ্ঞতা আর ভুল থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় ষষ্ঠ পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নেন ‘দ্য কেওডব্লিউ কোম্পানি লিমিটেড’–এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ নীরব। আলোচনার বিষয় ছিল ‘ডিজিটাল যুগে প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিস্থাপকতা: উদ্যোক্তা থেকে প্রতিষ্ঠান নির্মাতা’।
‘ব্যবসার ক্ষেত্রে গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্কটা শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটা আসলে সবকিছুই। আপনি যদি সত্যিই গ্রাহকের সমস্যা বুঝতে পারেন এবং সমাধান করতে পারেন, তবেই সেই সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই হয়।’
পডকাস্ট শোতে অংশ নিয়ে কথাগুলো বলেন ‘দ্য কেওডব্লিউ কোম্পানি লিমিটেড’–এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ নীরব। পডকাস্ট শোর ধারণ করা পর্বটি প্রচারিত হয় গত শনিবার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোয়।
পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, কোম্পানির এমন অদ্ভুত নামের পেছনের গল্প কী?
কাওসার আহমেদ বলেন, ‘কোম্পানির নাম যখন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিই, তখন হাতে সময় ছিল খুব কম। আমার পার্টনারের নাম এন (N) আর আমার নাম কে (K) দিয়ে শুরু। অনেক নাম ভাবার পর হঠাৎ মনে হলো “দ্য কাউ কোম্পানি”। যদিও শুরুতে অনেকেই ভেবেছে এটা কেমন নাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের নামের সঙ্গে এর মিল খুঁজে পাওয়া গেল। এটি শুনতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি মনে রাখাও সহজ।’
প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, বর্তমানে বাজারে অনেক কোম্পানি একই ধরনের সেবা দিচ্ছে, তবু গ্রাহকেরা কেন ‘দ্য কেওডব্লিউ কোম্পানি’কেই বেছে নেবে? জবাবে কাওসার আহমেদ বলেন, ‘ব্যবসায় মূলত দুটি বিষয় থাকে—সার্টেইনিটি (নিশ্চয়তা) এবং আনসার্টেইনিটি (অনিশ্চয়তা)। গ্রাহকেরা আমাদের বেছে নেয় আমাদের দেওয়া নিশ্চয়তার কারণে। আমরা সাধারণত বলি না যে আমরা “ওয়ান কল অ্যাওয়ে”, বরং বলি আমরা “ওয়ান টেক্সট অ্যাওয়ে”। অর্থাৎ আমরা গ্রাহকদের সেই আত্মবিশ্বাসটুকু দিই—যেকোনো প্রয়োজনে আমরা তাদের হাতের মুঠোয় আছি।’
কোম্পানিটির কাজের ধরন সম্পর্কে কাওসার আহমেদ জানান, মূলত অ্যামাজনসহ বড় বড় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের জন্য পণ্যের থ্রিডি ভার্চ্যুয়াল উপস্থাপনা তৈরি করেন তাঁরা। কাওসার আহমেদ বলেন, ‘আমরা ছবি তোলার পাশাপাশি একটি পণ্যের নিখুঁত ডিজিটাল রূপান্তর নিশ্চিত করি।’
সঞ্চালক জানতে চান, এই শিল্পে টিকে থাকতে এবং প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হলে কর্মীদের এখন কী ধরনের দক্ষতা থাকা প্রয়োজন?
উত্তরে কাওসার আহমেদ বলেন, আগে শুধু অ্যাডোবি ক্রিয়েটিভ সুইট বা ফটোশপের কাজ জানলেই চলত। সময় বদলেছে। এখন এলএলএম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে কাজ করে, তা বোঝাটা খুব জরুরি। তিনি বলেন, ‘আমাদের কোম্পানিতে এখন ৩০ জন সফটওয়্যার ডেভেলপার রয়েছে। এ ছাড়া আমাদের এখানে হিউম্যান-কম্পিউটার ইন্টারঅ্যাকশন বিশেষজ্ঞরাও কাজ করছেন, যাঁরা প্রতিনিয়ত এআইয়ের আচরণ নিয়ে কাজ করেন। কারণ, এখন এটি কেবল একটি ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি নয়, এটি প্রযুক্তি ও দক্ষতার সমন্বয়ে চলে।’
এরপর সঞ্চালক জানতে চান, দক্ষ জনশক্তি বা ট্যালেন্ট সোর্সিং কীভাবে করছেন? যাঁরা একদম নতুন বা দক্ষ নয়, তাঁদের কীভাবে আপনারা কাজের জন্য প্রস্তুত করছেন?
এ প্রসঙ্গে কাওসার আহমেদ বলেন, ‘আমরা মূলত দুটি উপায়ে জনশক্তি নির্বাচন করি। একদিকে যেমন গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে দক্ষ ব্যক্তিরা আসছেন, অন্যদিকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে যারা কাজ শিখেছে, তাদের আমরা সুযোগ দিচ্ছি। তবে আমাদের বড় বিশেষত্ব হলো, আমরা সুবিধাবঞ্চিত তরুণ-তরুণীদের নিয়ে কাজ করছি। যাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত, তাদের খুঁজে বের করে আমাদের প্রতিষ্ঠানে ছয় থেকে আট মাস প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি। দক্ষতা অর্জনের পর তারা আমাদের সঙ্গেই কাজ শুরু করে।’
নিজের কর্মজীবনের শুরুর দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করে কাওসার আহমেদ বলেন, ‘আমি পড়াশোনার পাশাপাশি কল সেন্টারে কাজ করতাম। এরপর ছোট একটি বায়িং হাউস দিয়ে শুরু করেছিলাম। তরুণ বয়সে আমরা অনেক ভুল করেছি, অতিরিক্ত খরচ করেছি এবং একসময় সব হারিয়ে আবার রাস্তায় নেমে এসেছিলাম। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে শেখাটা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
কাওসার আহমেদ বলেন, ‘একটি ডেল ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট মডেম নিয়ে দুজন কর্মীসহ আবার নতুন করে যাত্রা শুরু করি। আমি সব সময় গ্রাহক–সম্পর্ককে ব্যবসার সবকিছু মনে করি। গ্রাহককে সেবা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করাই আমার ব্যবসার মূল লক্ষ্য।’
বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর কথা বলতে গিয়ে কাওসার আহমেদ বলেন, ‘আমাদের দেশে হাইগ্রোথ স্টার্টআপগুলোর জন্য ফান্ডিংয়ের অভাব রয়েছে। ব্যাংকগুলো প্রফিটেবিলিটি বা মুনাফাকেই ব্যবসার একমাত্র মানদণ্ড মনে করে, অথচ হাইপার-গ্রোথের জন্য শুরুতে লোকসানের ঝুঁকি নিয়েই এগোতে হয়। এই মানসিকতা পরিবর্তন করা জরুরি।’
কাওসার আহমেদ আরও বলেন, সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো ভিসা জটিলতা। একজন তরুণ উদ্যোক্তা যখন ব্যবসার প্রয়োজনে বিদেশে তাঁর গ্রাহকের সঙ্গে দেখা করতে চান, তখন ভিসা পাওয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পলিসি মেকারদের বুঝতে হবে যে ব্যবসার বিকাশের জন্য বিনিয়োগ ও সহজ শর্তে ঋণের সুযোগ কতটা প্রয়োজন।’
কর্মক্ষেত্রে সংস্কৃতির গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কাওসার আহমেদ তাঁর কোম্পানির একটি প্রগতিশীল সিদ্ধান্তের কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘একবার আমার এক নারী সহকর্মী প্রশ্ন করেছিলেন, আমরা যদি প্রগতিশীল কোম্পানি হই, তবে আমাদের কাজের নিয়মগুলো ১৯৮০ সালের কেন? বিশেষ করে পিরিয়ডিক্যাল লিভের মতো বিষয়ে। তাঁর কথা শোনার পর আমি অনুধাবন করলাম আমার ভুল। এরপরই আমরা কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করি। বর্তমানে আমাদের ৬০০ কর্মীর মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই নারী।’
আলোচনার শেষ পর্যায়ে কাওসার আহমেদ নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘সফলতার কোনো শর্টকাট নেই। ধৈর্য ধরুন, প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে আপগ্রেড রাখুন এবং সবচেয়ে বড় কথা—আপনার গ্রাহকের সমস্যার সমাধান করুন। তাহলেই দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই ব্যবসা গড়ে তোলা সম্ভব।’