
বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণভোট নিশ্চিতে মানবাধিকার রক্ষার প্রতি জোরালো নিশ্চয়তার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা। বুধবার জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইরিন খান, জিনা রোমেরো, মেরি ললোর, নাজিলা ঘানেয়া এ আহ্বান জানান।
জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের মানুষ যখন ভোট দিতে যাচ্ছেন, তখন অন্তর্বর্তী সরকারকে অবশ্যই সব নাগরিকের মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে একটি প্রকৃত অবাধ, সুষ্ঠু, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন এবং গণভোট নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মতামত ও মতপ্রকাশের সমান অধিকার, তথ্যে প্রবেশাধিকার এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছাড়া কোনো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বা অর্থবহ রাজনৈতিক চর্চা হতে পারে না।
জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, ‘সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, নারী সংগঠন ও সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা, হুমকি ও হামলা এবং দায়মুক্তির সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর সহিংসতা ও হত্যার ঘটনাগুলো আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছি।’
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও ভোটারদের সুরক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপক মোতায়েনের ঘোষণা দিলেও আমরা আহ্বান জানাচ্ছি, সব নিরাপত্তা বাহিনী যাতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী কাজ করে, কর্তৃপক্ষ তা নিশ্চিত করে। একই সঙ্গে তারা যেন সব নাগরিকের অংশগ্রহণের অধিকারকে সম্মান করে এবং বেসামরিক ও বিচার বিভাগীয় নজরদারির অধীনে একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পূর্ণ দায়বদ্ধ থাকে।’
জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী আচরণবিধির গুরুতর লঙ্ঘনের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের যে সুনামি চলছে, তা মোকাবিলায় কমিশনের প্রস্তুতির অভাব দেখে তাঁরা উদ্বিগ্ন। উল্লেখ্য, এই অপপ্রচারের নিশানা ৫ কোটির বেশি ব্যবহারকারী, যাঁদের অনেকেই তরুণ ও প্রথমবারের ভোটার এবং সহজেই বিভ্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারকে অবশ্যই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে এবং নির্বাচন সম্পর্কে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবিলায় দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট পরিষেবার ব্যাঘাত যাতে না ঘটে এবং গণমাধ্যম ও ভোটারদের নির্ভরযোগ্য ও সঠিক তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের ওপর হুমকি, বৈরিতা ও হামলা সত্ত্বেও গণমাধ্যমের সুরক্ষায় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনো নির্দিষ্ট প্রটোকল ঘোষণা না করায় জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাংবাদিকদের পাশাপাশি মানবাধিকারকর্মী, নাগরিক সমাজের পর্যবেক্ষক, নারী অধিকারকর্মী এবং সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোকে সুরক্ষা দিতে সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, কর্তৃপক্ষকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো দমনমূলক আইনের অধীনে গ্রেপ্তার বন্ধ করতে হবে এবং নির্বিচার আটক, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা থেকে বিরত থাকতে হবে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের প্রতি অপপ্রচার চালানো বা নারী ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বৈরিতা, বৈষম্য বা সহিংসতা উসকে দেওয়া, মানবাধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর অনাস্থা তৈরির চেষ্টা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা।
জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি স্বৈরাচারী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পাওয়া এই নির্বাচন শুধু পরবর্তী সরকার কে গঠন করবে শুধু তা নিয়ে নয়, এটি মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ওপর ভিত্তি করে একটি সমাজ গঠনের বিষয়ও বটে।
জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘আমরা নতুন নির্বাহী কর্তৃপক্ষের প্রতি ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বহুত্ববাদের প্রসার, তথ্যে প্রবেশাধিকার এবং লিঙ্গসমতার পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানাই।’
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য নতুন সরকারকে অবশ্যই কোনো বৈষম্য বা অন্যায্য বিধিনিষেধ ছাড়াই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সভা-সমাবেশ, সংগঠন ও জনগণের অংশগ্রহণের অধিকার সমুন্নত রাখতে হবে এবং মানবাধিকারকর্মীদের জন্য একটি নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে উল্লেখ করা হয়।