ঘরে ঢুকতেই বই আর বই। ঘরের এক পাশে ছাদ থেকে নিচ পর্যন্ত একটি শেলফে সাজানো রয়েছে সাদা মলাটে সযতনে মোড়ানো বই। উল্টো দিকে একটি টেবিল, চেয়ার। এক পাশে জানালা। বইগুলো পড়েন একজনই।
কথা বলে মনে হয়, তাঁর আসলে একটাই পরিচয়। তিনি পাঠক। শুধু বই পড়েই একজীবন পার করেছেন তিনি। বলা যেতে পারে, অক্ষরজ্ঞান হওয়ার পর থেকেই বইয়ের সঙ্গে এই শান্ত, সৌম্য মানুষটির সখ্য।
ঢাকার বাসাবোর বৌদ্ধমন্দির থেকে কিছুটা দূরে আমজাদুল হোসেন থাকেন। ৭৬ বছর বয়সী এই বই অনুরাগী বললেন, ‘বই পড়ার শুরু বাবার সঙ্গে। পড়তে পড়তে নিজেই আনন্দ খুঁজে পেলাম। আর সব কাজের চেয়ে বই পড়া আমার কাছে বেশি ভালোবাসার হয়ে উঠল। জ্ঞানের জন্য ভালোবাসাই আমার জীবনদর্শন হয়ে উঠল। বইয়ের মধ্যেই পৃথিবীকে বুঝতে চাই, জীবনের অর্থ খুঁজতে চাই।’
কথা বলে মনে হয়, তাঁর আসলে একটাই পরিচয়। তিনি পাঠক। শুধু বই পড়েই একজীবন পার করেছেন তিনি। বলা যেতে পারে, অক্ষরজ্ঞান হওয়ার পর থেকেই বইয়ের সঙ্গে এই শান্ত, সৌম্য মানুষটির সখ্য।
বই পড়া ছাড়া অন্য কোনো কিছুতে আকর্ষণ খুঁজে পান না তিনি। প্রাইমারি স্কুল থেকেই নিয়মিত বই পড়তেন। সাতক্ষীরার সবুজ–শ্যামল পরিবেশে তাঁর বাবার যে বাড়ি ছিল, সেখানেও গ্রন্থাগার ছিল। সেখান থেকেই হাতে তুলে নিয়েছিলেন রবীন্দ্র রচনাবলী, শরৎ রচনাবলী। এখনো রবি ঠাকুরের বলাকা পড়তে ভালোবাসেন। বলাকা কাব্যগ্রন্থই তাঁর সবচেয়ে প্রিয়।
কবিতা, গল্প, ছোটগল্প, বিজ্ঞান, ধর্ম, দর্শনের বইকে সঙ্গী করে বেড়ে উঠেছেন আমজাদুল হোসেন। সাতক্ষীরায় স্কুল–কলেজের পাঠ শেষে ভর্তি হন খুলনার দৌলতপুর কলেজে। সেখানেই বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শেষ হয়। বাংলায় পড়লেও তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল দর্শন। পড়াশোনা শেষ করার আগেই শুরু হয় কর্মজীবন।
১৯৭৬ সালে সোনালী ব্যাংকে চাকরি শুরু। কর্মজীবন নিয়ে বেশি পরিকল্পনা, উচ্চাশা ছিল না আমজাদুল হোসেনের। তিনি চাইতেন শুধু বই পড়তে। জীবিকার প্রয়োজনে চাকরি করতেন। শুরুতে নারায়ণগঞ্জে পোস্টিং ছিল। বই পড়ার নেশায় ছুটিতে আসতেন ঢাকায়। থাকতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য সেন হলে, সুহৃদ বা পরিচিতজনের কাছে। উদ্দেশ্য তাঁদের সঙ্গ নয়। চাইতেন বিচিত্র বইয়ের সঙ্গী হতে। তাই নিয়মিত যেতেন বাংলা একাডেমিতে।
বই পড়ার শুরু বাবার সঙ্গে। পড়তে পড়তে নিজেই আনন্দ খুঁজে পেলাম। আর সব কাজের চেয়ে বই পড়া আমার কাছে বেশি ভালোবাসার হয়ে উঠল।আমজাদুল হোসেন
নারায়ণগঞ্জেও ব্যাংকের কাজ শেষেই ছুটে যেতেন জেলা গণগ্রন্থাগারে। কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতি হলে, দায়িত্ব বাড়লে, বই পড়ার সময় কমে যেতে পারে। তাই কর্মজীবনে উন্নতির পেছনে ছোটেননি কখনোই। পদোন্নতি দেরিতে হলেই বরং খুশি হতেন। কর্মজীবনের সূত্রে স্রোতে ভাসতে ভাসতে এসে পড়েন রাজধানীতে। সেখানেই থিতু হন। স্ত্রী আছেন। এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক। ছেলে–মেয়ে প্রতিষ্ঠিত। তাঁরাও বই পড়েন।
বড় মেয়ে অনুপম আসিফা তৃণা সরকারি চাকরিজীবী। তিনি বললেন, ‘আব্বুকে যখনই দেখি বই পড়েন। বাংলা, ইতিহাস, দর্শন, ইংরেজি, বিজ্ঞান যে বিষয়েই যখন কিছু জানতে চেয়েছি, ভালো উত্তর পেয়েছি। অনেক সময় শিক্ষকদের কাছেও সেসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাইনি।’ অনুপম আসিফা জানালেন, বাবাই তাঁদের বড় শিক্ষক।
বইপাগল মানুষটির জীবনসঙ্গী নুরুননাহার হেসে বললেন, আশপাশের অনেকেই জানতে চান স্বামীর সঙ্গে তাঁর কথা হয় কি না। কারণ, সবাই বেশির ভাগ সময় দেখতেন, তিনি নীরবে বই পড়ছেন।
কাজী নজরুল ইসলাম, মাইকেল মধুসূদন, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বায়েজিদ বোস্তামী, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, লিও তলস্তয়, প্লেটো, সৈয়দ মুজতবা আলী, বিজ্ঞানের বই, হিন্দু দর্শন, সুফিবাদ—সবকিছুই পড়তে আগ্রহী আমজাদুল হোসেন।
বাসাবোর ছোট্ট গোছানো বাড়িটিতে নিজের একটি গ্রন্থাগার করেছেন বইপ্রেমী আমজাদুল হোসেন। বইয়ের সংখ্যা দেড় হাজারের কাছাকাছি। নিজেই ক্যাটালগ করেন। কাজী নজরুল ইসলাম, মাইকেল মধুসূদন, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বায়েজিদ বোস্তামী, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, লিও তলস্তয়, প্লেটো, সৈয়দ মুজতবা আলী, বিজ্ঞানের বই, হিন্দু দর্শন, সুফিবাদ—সবকিছুই পড়তে আগ্রহী আমজাদুল হোসেন। এখন জীবনের এই প্রান্তে এসে বেশি পছন্দ করেন দর্শন ও বিজ্ঞানের বই। সুফিবাদও টানে তাঁকে।
আব্বুকে যখনই দেখি বই পড়েন। বাংলা, ইতিহাস, দর্শন, ইংরেজি, বিজ্ঞান যে বিষয়েই যখন কিছু জানতে চেয়েছি, ভালো উত্তর পেয়েছি। অনেক সময় শিক্ষকদের কাছেও সেসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাইনি।মেয়ে অনুপম আসিফা তৃণা
আমজাদুল হোসেন বলেন, ‘জীবনের প্রথম কাজ সৃষ্টি ও জীবনের উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা। আমার জীবনবোধ, দর্শনকে নিয়েই প্রতিনিয়ত চলতে হবে। প্রতি ক্ষণে, নব নব রূপে অনুভব করা সেই দর্শনই জীবনের চালিকা শক্তি।’
সকালের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই প্রিয় গ্রন্থাগারে বসে বই পড়া শুরু হয়। পশ্চিমের জানালায় আলো নিভে আসা পর্যন্ত সেখানেই সময় কাটে। এখানেই বইয়ের সাগরে তিনি অরূপরতন খোঁজেন।
অমূল্য বইগুলো তিনি রেখে যেতে চান উত্তর প্রজন্মের জন্য। জীবনে পাওয়া না–পাওয়ার হিসাব কোনো দিনই মেলাতে বসেননি তিনি। হিসাবের খাতা ব্যাংকেই ফেলে এসেছেন। তাঁর শুধু বই পড়াতেই আনন্দ।