
খাগড়াছড়ির দুর্গম একটি পাহাড়ি বন। মোটা একটি গাছকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে-পেঁচিয়ে ওপরের দিকে উঠে গেছে ঝুমকোলতার গাছ। গাছভরা হলুদ রঙের পাকা ফল। পাঁচটি পাহাড়ি ময়না পাখি ওই ফল খাচ্ছে হুটোপুটি করে। এক পাহাড়ি তরুণ গুলতিতে কাচের মার্বেল রেখে একটি পাখিকে টার্গেট করে ছুড়ে দিল। না, উড়ে গেল পাখিগুলো চেঁচাতে চেঁচাতে।
ঘটনাটি শুনি মাস চারেক আগে, খাগড়াছড়ির দুজন পাহাড়ি মানুষের কাছে। প্রশ্ন করে জানা গেল, পাহাড়ি বনে নানান রকম ফাঁদ পেতে ও কৌশলে ধরা হয় ময়না। বাসার খোঁজ রেখে ও ডিম-ছানা পাহারা দিয়ে সময়মতো পেড়ে এনে গোপনে বিক্রি করা হয়। ময়নার মূল্য চড়া। বাসা আছে—এমন উঁচু ও মোটা গাছের গায়ে দা-কুড়াল ব্যবহার করে গাছে চড়ার জন্য ধাপ বা সিঁড়ি তৈরি করা হয়। তবে, ওই দুই ব্যক্তির কথা হলো,বাসিন্দাদের একটি ক্ষুদ্রাংশ বা নগণ্যসংখ্যক মানুষ এই কাজে জড়িত। বন-পাহাড়ের মানুষরা তো বংশপরম্পরায় জানে, পাখি ও বন্য প্রাণী তাদের পরিবেশের জন্য কতটা জরুরি। জন্মস্থানকে তারা ভালোবাসে খুব।
ময়না সম্পর্কে আমারও যৎসামান্য অভিজ্ঞতা আছে। সত্তর দশক থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ময়না–অধ্যুষিত গভীর পার্বত্য বন, বৃহত্তর সিলেটের টিলাময় বন, চা-বাগান এলাকাসহ শেরপুর, নেত্রকোনার গারো পাহাড়শ্রেণিতে বেশ কিছুবার যাওয়া হয়েছে, গিয়েছি মূলত বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি ভ্রমণে। ছেলেবেলায় আমার মায়ের নানাবাড়িতে (বাগেরহাট শহর) প্রথম দেখেছিলাম ‘কথা বলা’ ময়না। কথা বলা পাখি হিসেবে ময়না বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন পাখি। তাই তো এত কদর পাখিটির। তাই যুগ যুগ ধরে ময়না পোষা পাখি হিসেবে খুবই জনপ্রিয়। আজও দেশের নানা প্রান্তে পোষা ময়নার দেখা মেলে। পাখিটি পাকিস্তান আমলেও পার্বত্য বন, গারো পাহাড়শ্রেণি ও বৃহত্তর সিলেটে যথেষ্টই ছিল। তখন ছিল না কোনো কার্যকরী বন্য প্রাণী আইন। কিন্তু বাংলাদেশে এখন তো কঠোর বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন আছে। বন বিভাগও যথেষ্ট সক্রিয় ও সচেষ্ট।
মাসখানেক আগে ফোন করেছিলাম খাগড়াছড়ির এক ব্যক্তিকে। দিন কয়েক পরে তিনি জেলা সদর থেকে ৯–১০ কিলোমিটার দূরের ‘হাতিমাথা’ এলাকায় যান। ২০–২৫ ফুট উঁচু একটা কড়ইগাছের ডালে চারটি ময়না দেখেন। ফোনে কথা হয় অনেকটা সময় ধরে। তিনি জানান, খাগড়াছড়িতে ময়নার সংখ্যা কমে গেছে। তবে, মাটিরাঙ্গা উপজেলার ‘হৃদয় মেম্বরপাড়া’, জেলা সদরের ‘আড়াইমাইল’ এলাকায় কখনো কখনো দেখা যায়।
সুন্দর পাখি পাহাড়ি ময়নার রং একনজরে চকচকে নীলচে-কালো, ডানার গোড়ায় এক টিপ সাদা রং, কমলা রঙের ঠোঁটটির অগ্রভাগ হলুদ। পা-ও হলুদ। এদের মূল সৌন্দর্য ঘাড়ের ওপরের টকটকে হলুদ রঙের লতিকাটায়Ñমনে হয় মাথার পেছন দিকে হলুদ ইমিটেশনের গয়না পরেছে পাখিটি। চোখের নিচের এক টিপ হলুদ ও চোখের পাশ দিয়ে বয়ে আসা হলুদ রেখাটা মিশেছে ঘাড়ের হলুদে, তারপরে ঠোঁটও কমলা, এ এক আশ্চর্যসুন্দর কম্বিনেশন। মূল খাদ্য এদের নানা রকম ফল, কচি পাতা ও কুঁড়ি, জামজাতীয় ফল, ফুলের মধুরেণু, পোকামাকড়। এদের অন্যতম প্রিয় পাহাড়ি ফল হলো ঝুমকো ফল, অশোকের পাকা লাল ফল ও অনেকটাই দেশি বাদামের মতো দেখতে চম্পা ফুলের পাকা ফল বা ফলবীজ। এরা পাহাড়-জঙ্গলের অনেক পাখির ডাক নকল করে ডাকতে পারে। বন্দী বা পোষা অবস্থায় পাকা পেঁপে-পাকা কলা ইত্যাদি খায়।
বসন্ত-বর্ষাকালে বাসা করে গাছের খোঁড়লে-কোটরে। ডিম পাড়ে দু–তিনটি। ডিম ফুটে ছানা হয় ১৫-১৯ দিনে। ময়নার ইংরেজি নাম কমন হিল ময়না। বৈজ্ঞানিক নাম Gracula religiosa. দৈর্ঘ্য ২৫-২৯ সেন্টিমিটার। ওজন ২১০ গ্রাম। দেশের বিভিন্ন চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্কে থাকা ময়নাদের অনেকগুলোই ‘ময়না ময়না’ জাতীয় শব্দ করতে পারে। আরও কিছু মুখস্থ বুলিও আওড়ায়। ময়নার ছানা পার্বত্য এলাকা থেকে সুকৌশলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাচার হয় অতি গোপনে। মূল্যও চড়া। শখ বলে কথা! আশা করা যায়, অতি ক্ষুদ্রাংশের এই অপপ্রয়াসকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ও সরকার নিবৃত করতে পারবেন অতি সহজেই।