
তেঁতুলিয়া থেকে পঞ্চগড় হয়ে বোদা পৌঁছাতে প্রায় আড়াইটা বেজে গেল। আলোকচিত্রী ফিরোজ আল সাবার বাসায় কিছুটা বিশ্রাম নিলাম। এরপর নয় কিলোমিটার দূরের টাঙ্গন ব্যারাজের দিকে অটো ছোটালাম। ঠাকুরগাঁও সদরের পাটিয়াডাঙ্গি ইউনিয়নের টাঙ্গন নদের ওপর এই ব্যারাজ। গত বছরও এ সময় এখানে এসেছিলাম একটা বিশেষ পাখি খোঁজার উদ্দেশ্যে। এবারও তা-ই। কিন্তু অনেক খুঁজেও জায়গামতো পাখিটিকে পেলাম না। প্রায় শুকিয়ে যাওয়া টাঙ্গন নদের তীর ধরে হাঁটতে লাগলাম। বেশ কিছু বড় ও ছোট সাদা বক এবং ছোট পানকৌড়ি মাছের আশায় ড্যাগারের মতো ঠোঁট পজিশনে নিয়ে মূর্তির মতো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। একটি গো-বক আমার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল। ২০ থেকে ৩০টি নাকুটি (Plain Martin) কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে মাছ শিকারে ব্যস্ত। একটি সাদা-কালো ছোট পাখি লেজ নেড়ে হাঁটতে হাঁটতে পানির সামনে এসে দাঁড়াল। ভাবলাম পানি পান করবে। পানিতে তার প্রতিবিম্বটি এমনভাবে পড়ল, মনে হলো যেন আয়নায় সে নিজের চেহারা দেখছে। আমার চোখাচোখি হতেই দ্রুত পালিয়ে গেল। অবশ্য ততক্ষণে ক্যামেরায় ওর কীর্তিকলাপ ধারণ করতে পেরেছি।
এরা হলো শীতের পরিযায়ী সাদা খঞ্জন বা খঞ্জনা। ইংরেজি নাম White Wagtail। Motacillidae গোত্রের অন্তর্ভুক্ত পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম motacilla alba।
ঠোঁটের আগা থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত দৈর্ঘ্যে সাদা খঞ্জন ১৮ থেকে ১৯ সেন্টিমিটার। ওজন ২৩ থেকে ২৪ গ্রাম। শরীরের পালকের রং একনজরে সাদা-কালো। স্ত্রী ও পুরুষের রঙে কোনো পার্থক্য নেই। প্রজননকালে প্রাপ্তবয়স্ক পাখির ঘাড়-গলা-বুক কালো হয়। কপাল ও গাল সাদা। কাঁধ-ঢাকনি ও পিঠ কালচে-ধূসর। শরীরের পেছনের অংশ ও কোমর ছাই রং ধারণ করে। ডানার নিচের অংশ, পেট ও লেজের তলা সাদা। লম্বা ও সরু লেজটি কালচে। প্রজননকাল বাদে বাকি সময় গলা ও মুখের বেশির ভাগ অংশ হয় সাদা। ঠোঁট কিছুটা বাদামি-কালো, চোখ বাদামি। পা, পায়ের পাতা ও নখ কালচে-বাদামি।
সাদা খঞ্জন বহুল দৃশ্যমান পরিযায়ী পাখি। শীতকালে এ দেশের পাহাড়, নদী, নদীর পাড়, জলাভূমি, হ্রদ, আবাদি জমি ও লোকালয়ে দেখা যায়। সচরাচর একাকী, জোড়ায় বা বিচ্ছিন্ন দলে বিচরণ করে। পোকামাকড়, পিঁপড়া, শুঁয়াপোকা, গুবরে পোকা, ছারপোকা এবং অতি ছোট শামুকজাতীয় প্রাণী খায়। খাবার খোঁজার সময় অনবরত লেজ ওঠা-নামা করায়। মাঝেমধ্যে উড়ে এসে পোকা ধরে আবার আগের জায়গায় ফেরত যায়।
এপ্রিল-আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় নিজেদের আবাসিক এলাকা, অর্থাৎ সাইবেরিয়া বা হিমালয়ের পানির ধার বা শিলার নিচে অথবা ঘাস-ঝোপ, নদীর পাড় বা দালানের ফাটলে শিকড়, শুকনো ঘাস বা পাতা দিয়ে ছোট বাটির মতো বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ৪ থেকে ৬টি। ঘিয়ে রঙের ডিমের ওপর হালকা নীলচে-সবুজ বা ফিরোজা রঙের ছিট থাকে। ডিম ফোটে ১১ থেকে ১৬ দিনে। ছানারা প্রায় ১৬ দিনে উড়তে শেখে। আয়ুষ্কাল ৪ বছরের বেশি।