বড় বড় প্রকল্প ও বিশাল বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ করলেই তাকে উন্নয়ন বলা যায় না। বন, নদী এবং পরিবেশ ধ্বংস করে যে উন্নয়ন, তা শেষ পর্যন্ত টেকসই হবে না। তা মানবসৃষ্ট বিপর্যয় ডেকে আনবে। আর এতে দরিদ্ররা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সিবিসিবি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়: পাহাড়, উপকূল, রোহিঙ্গা সংকট ও বনাঞ্চল’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের (সেড) উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং পরিবেশ আন্দোলনের নেতারা অংশ নেন।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যাটিকে আমরা এখন বিশ্বের অন্যতম মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখছি। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, এত অল্প সময়ের মধ্যে এত বেশি মানুষ শরণার্থী হয়ে কোনো দেশে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা এটাই সবচেয়ে বড়। কিছুদিন পরেই এই সমস্যা একটি পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ঘটনায় পরিণত হবে।’ রামপাল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা উন্নয়নের জন্য রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছি। যাঁরা বলেন এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না, তাঁরা ভুল কথা বলেন। এ কারণে অবশ্যই পরিবেশের ক্ষতি হবে। ভূরাজনৈতিক বিবেচনা থেকে বড় প্রকল্প না নিয়ে, পরিবেশ রক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘বাংলাদেশে ভারতের টাটা গ্রুপ স্টিল মিলসহ বেশ কিছু খাতে বিনিয়োগ করতে চেয়েছিল। আমাকে সরকারের ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিট থেকে ওই বিনিয়োগের ওপরে একটি গবেষণা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমি দেখিয়েছিলাম, ওই বিনিয়োগ পরিকল্পনা সঠিক ছিল না। পরে এটা নিয়ে টাটা গ্রুপের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমার অনেক বিতর্ক হয়েছিল। পরে টাটা ওই বিনিয়োগ থেকে সরে আসে। টাটা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরে একসময় বলেছিলেন, ওই বিনিয়োগ তাদের জন্য সবচেয়ে বড় ভুল হতে যাচ্ছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ওই ঘটনা থেকে অন্যরা কোনো শিক্ষা নেয়নি।’
সভাপতির বক্তব্যে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চের (পিপিআরসি) নির্বাহী পরিচালক হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘আমরা হাওরের ভেতর দিয়ে রাস্তা বানিয়ে ভাবছি, অনেক উন্নতি হচ্ছে।...এখন নতুন করে ভাবতে হবে। আমরা পরিবেশ-বন-জলাভূমি ধ্বংস করে যে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছি, আসলে কতটুকু প্রবৃদ্ধি আনছে, তা আমাদের নতুন করে চিন্তা করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের তিনটি উন্নয়ন দশকের দুটিতে ছিল সামরিক শাসন ও একটিতে গণতান্ত্রিক। কিন্তু এই সব কটি শাসনের সময়ে উন্নয়নে মতাদর্শের ক্ষেত্রে খুব বেশি অমিল নেই। সব সময়ে আমরা দেখেছি উন্নয়নের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে জনগণ হয়ে গেছে প্রজা। প্রজাদের নামে উন্নয়ন করলেও সেখানে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কেউ যদি বেশি চেঁচামেচি করে, তাহলে তাকে শাস্তি পেতে হয়।’
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের শাসকদের উন্নয়নের মতাদর্শ আসলে একই। দুই দেশের উন্নয়নের পেছনে একই ধরনের রাষ্ট্রগুলো রয়েছে। ভারত, চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে মিয়ানমারে যে উন্নয়ন করছে, তার ফলাফল হিসেবে সেখানকার লাখো রোহিঙ্গা মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। বাংলাদেশেও রামপাল, রূপপুর ও মাতারবাড়ির মতো প্রকল্পের কারণে দেশের ভেতরে যত লোক উদ্বাস্তু হচ্ছে, তার মোট হিসাব করলে রোহিঙ্গাদের চেয়ে কম হবে না।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধ তুলে ধরেন সেডের নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ গাইন। আরও বক্তব্য দেন বেসরকারি সংস্থা নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক এম শহিদুল ইসলাম প্রমুখ।