সুদর্শন হাঁস

লালশির

দুটি লালশির হাঁসা ও একটি হাঁসি। ছবিটি হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপের একটি খাল থেকে গত
দুটি লালশির হাঁসা ও একটি হাঁসি। ছবিটি হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপের একটি খাল থেকে গত

ভট ভট শব্দে ছুটে চলেছে ট্রলার। আমরা কজন ট্রলারের ইঞ্জিন ঘরের ছাদে বসে আছি। প্রচণ্ড শব্দে কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়। হাতিয়ার তমুরুদ্দি ঘাট থেকে যাত্রা করে জাহাজমারা পার হওয়ার পর ডান-বাঁ দুদিকেই অথই পানি। মেঘনা নদীজুড়ে জেলে নৌকা, ইলিশ ধরার ধুম পড়েছে। বিশাল এক চরের পাশ দিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ চোখে পড়ল নদী আর চরের খালের মোহনায় একঝাঁক হাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে। ট্রলার কাছাকাছি আসতেই ওরা সদলবলে উড়ে গেল। চমৎকার সে দৃশ্য। প্রতিটি খালের মোহনায় অন্তত একটি ঝাঁকের দেখা মিলল। ঝাঁকপ্রতি ২০-১৩০টি করে পাখি। আমাদের গন্তব্য নিঝুম দ্বীপের ঘাটে পৌঁছা পর্যন্ত এ রকম ৭-৮টি খালেই লাল মাথায় হলদে সিঁথিযুক্ত পরিযায়ী এই পাখি ছাড়া অন্য কোনো প্রজাতির হাঁস চোখে পড়েনি।
পরিযায়ী এই পাখিটির নাম লালশির (Eurasian Wigeon or Wigeon)। লালমাথা হাঁস, সিঁথিহাঁস বা দুবরাখাওরি হাঁস নামেও পরিচিত। Anatidae গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম anas penelope.
মাঝারি আকারের লালশির লম্বায় ৪৮-৪৯ সেন্টিমিটার, ওজনে ০.৫-১ কেজি। হাঁসা ও হাঁসি দেখতে এক রকম নয়। হাঁসার মাথা, চিবুক, ঘাড়-গলা লালচে বাদামি। মাথার ঠিক মাঝখানটায় কপালের ওপর থেকে একটি কমলা সিঁথি। পিঠ, ডানা ও দেহের দুপাশ ধূসর এবং ডানার ওপরে সাদা চওড়া অংশ রয়েছে। ডানার পালকের অগ্রভাগ ও লেজ কালো। বুক ধূসর গোলাপি ও পেট-তলপেট সাদা। হাঁসির মাথা, ঘাড়-গলা, পিঠ, দেহের পাশ, বুক-পেটসহ পুরো দেহই ধূসর বাদামি থেকে পিঙ্গল বাদামি এবং মাথায় কোনো সিঁথি নেই। হাঁসা-হাঁসি নির্বিশেষে ঠোঁট নীলচে ধূসর, যার আগা কালো। পা ও পায়ের পাতা নীলচে ধূসর।
লালশির মূলত শীতপ্রধান দেশ যেমন: আইসল্যান্ড, ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ, উত্তর ইউরোপ, দক্ষিণ রাশিয়া, জাপান ইত্যাদি দেশের আবাসিক পাখি। শীতে এ দেশের উপকূলীয় এলাকার নদী, অগভীর হ্রদ, চরাঞ্চলে খালের নদী-মোহনা, হাওর, বিল ইত্যাদিতে বিচরণ করে। এরা দিবাচর ও সান্ধ্যচারী। ছোট থেকে মাঝারি দলে থাকে। ভেজা ঘাস, জলজ আগাছা ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ খায়। কীটপতঙ্গ ও শূককীটও খেয়ে থাকে। এরা পায়ে হেঁটে বা অগভীর জলায় পানিতে মাথা ডুবিয়ে খাবার খায়। হাঁসা ‘হুইয়ো’ ও হাঁসি ‘কররর্-কররর্-কররর্’ স্বরে ডাকে।
মে-সেপ্টেম্বরে প্রজননকালে হাঁসি সাইবেরিয়া ও অন্যান্য প্রজনন এলাকায় পানির কাছাকাছি ঝোপঝাড়সম্পন্ন এলাকার মাটিতে নল, ঘাস ইত্যাদির সঙ্গে বুকের পালক বিছিয়ে বাসা বানায় ও তাতে ৭-১০টি পীতাভ রঙের ডিম পাড়ে। ডিম থেকে বাচ্চা ফুটতে ২৪-২৫ দিন সময় লাগে। ডিম থেকে ফোটার অল্প সময় পরেই বাচ্চারা মায়ের সঙ্গে বাসা ছাড়ে। প্রায় ৪০ দিন বয়সে বাচ্চারা উড়তে শেখে। প্রকৃতির সৌন্দর্য এই লালশির বেঁচে থাকুক অনন্তকাল।