পাখি

হলদে চোখের কালো প্যাঁচা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কালো প্যাঁচা
ছবি: লেখক

ক্যামেরা হাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াচ্ছি। শঙ্খশালিক, ঝুঁটিশালিক, সুইচোরা, নিশিবক ও পাকড়া কাঠঠোকরার ছবি তুলে লম্বালেজি শাহ বুলবুলির খোঁজে ঢুকলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যানে। ভিউফাইন্ডারে চোখ রেখে মাত্র চারটি ক্লিক করেছি, এমন সময় পাশের কদমগাছের ডালে এসে বসল সদ্য উড়তে শেখা ছোট্ট কুচকুচে কালো একটি ছানা। দুষ্টু দুষ্টু চোখের মায়াবী চাহনি।

এখনো ভালোভাবে উড়তে শেখেনি। একটু খোঁজাখুঁজি করতেই ওর মা-বাবার সন্ধান পাওয়া গেল। পাখিরাজ ফিঙের ছোট ভাই ধৌলি ফিঙে। কুচকুচে কালো পাখিটির দেহে চকচকে সবুজ আভা। মা-বাবা-ছানার ছবি তোলার সময় আচমকা মা–বাবার মধ্যে একটি দ্রুতবেগে উড়ে গিয়ে পাশের বোতলব্রাশগাছে বসা একটা কিছুকে আক্রমণ করে বসল। দ্রুত ওখানটায় গেলাম।

যা দেখলাম, তাতে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! বোতলব্রাশের ডালে ধৌলির চেয়ে ঢের বড় আকারের একটি প্যাঁচা জবুথবু হয়ে বসে আছে। ধৌলি একবার ডান ও আরেকবার বাঁ পাশ থেকে হলদে চোখের প্যাঁচাটিকে আক্রমণ করছে। প্যাঁচাটি আপ্রাণ চেষ্টা করছে ধৌলির আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে। এভাবে প্রায় আট মিনিট চলার পর প্যাঁচাটি বোতলব্রাশের ডাল থেকে উড়ে গিয়ে পালিয়ে বাঁচল।

ঘটনার আকস্মিকতায় তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে না পারলেও পরে ঠিকই বুঝতে পারলাম কেন ধৌলি প্যাঁচাটিকে আক্রমণ করেছিল। শিকারি প্যাঁচার হাত থেকে নিজেদের বংশধর অর্থাৎ ছানাদের রক্ষার জন্যই এই পদক্ষেপ। গোল গোল ও হলদে চোখের লালচে-বাদামি দেহের প্যাঁচাটিকে আগেও দেখেছি ঢাকার জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে, কেরানীগঞ্জে দিনের বেলায় গাছের ডালে চুপচাপ বসে থাকতে, চোখ খুলে বা বন্ধ করে।

আর রাতে দেখেছি রাজশাহী শহরের সিমলা পার্কের কাছে মথ শিকার করতে। বাজপাখির মতো ছিপছিপে দেহের লম্বা লেজ ও তুলনামূলকভাবে ছোট মাথার পাখিটির কাঁধে সাদা ছিটসহ দেহের ওপরটা লালচে-বাদামি। সাদাটে বুক ও পেটে মরচে-বাদামি দাগ। মাথা ও চিবুকের রং গাঢ়। কালচে ঠোঁটে সাদা ছিট। পা ও পায়ের পাতা হলুদ। প্যাঁচা-প্যাঁচী দেখতে একই রকম।

দেশব্যাপী বন, বাগান, গাছপালাসম্পন্ন এলাকায় ওরা সচরাচর একাকী বা জোড়ায় বিচরণ করে। দিনে গাছের ডালে পাতার আড়ালে বসে ঘুমায়। রাতে খাবার খোঁজে। পোকামাকড়সহ ছোট পাখি, পাখির ডিম ও ছানা, নেংটি ইঁদুর ইত্যাদি ধারালো নখে গেঁথে শিকার করে খায়। মনোরম সুরে ‘হুওয়াপ-হুওয়াপ-হুওয়াপ...’ শব্দে ডাকে।

মার্চ থেকে জুন প্রজননকাল। এ সময় ভূমি থেকে ৫-২০ মিটার উচ্চতায় গাছের কোটরে বাসা বানায়। একই বাসা বছরের পর বছর ব্যবহার করে। প্যাঁচী প্রতি মৌসুমে ৩-৫টি সাদা রঙের ডিম পাড়ে ও তাতে একাই তা দেয়। ডিমে তা দেওয়ার সময় প্যাঁচা প্যাঁচীকে খাওয়ায়। ডিম ফোটে ২৪-২৫ দিনে। প্যাঁচা-প্যাঁচী মিলেমিশে ছানাদের যত্ন করে। ছানারা ২৪-২৭ দিন বয়সে উড়তে শেখে ও বাসা ছাড়ে। আয়ুষ্কাল চার বছরের বেশি।

হলদে চোখের প্যাঁচাটি এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি। নাম কু-পোখ, কালো প্যাঁচা, কু প্যাঁচা বা বাদামি প্যাঁচা। ইংরেজি নাম ব্রাউন বুবক, বার্মিজ হক-আউল বা ব্রাউন হক-আউল।

স্ট্রিজিডি বা উলক গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Ninox scutulata। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের দৈর্ঘ্য ২৭-৩৩ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ৭০-৮৫ সেন্টিমিটার ও ওজন ১৭০-২৩০ গ্রাম।

আ ন ম আমিনুর রহমান, অধ্যাপক, বশেমুরকৃবি, গাজীপুর