পদ্মা নদী থেকে দেশি গাংচষার ছবিটি তোলা হয় ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল
পদ্মা নদী থেকে দেশি গাংচষার ছবিটি তোলা হয় ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল

বিপন্ন পাখি

গাংচষাদের পিছে ঘোরাঘুরি

নূর ইসলাম পদ্মা নদীতে বহুদিনের পাখি দেখার সাথি। পদ্মায় পাখি দেখার অনেক খবরই তাঁর কাছ থেকে পাই। কয়েক দিন আগে ফোনে জানালেন, দুটি গাংচষা পাখি এসেছে নদীতে। তাঁর বাড়ি রাজশাহী শহরের পদ্মাপাড়ের টি বাঁধের বটতলা ঘাটের কিনারায়। নূর ইসলামের ছোট্ট একটি নৌকা আছে।

পাখিদেখিয়েদের নৌকায় ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ানো তাঁর প্রিয় শখ ও পেশা। আমাদের প্রিয় মানুষ নূর। দেশি গাংচষার খবর তাঁর কাছ থেকে শুনে একটু বিস্মিত হলাম। এ অঞ্চলে পাখি প্রজাতিটি প্রায় বিরল। এ দুটি পাখি এলো কোথা থেকে! এই পাখি দলে থাকতে পছন্দ করে। ছবি দেখে মনে হলো, দুটিই অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি। তার মানে ভারতের চম্বল নদ থেকে এ এলাকায় এসে থাকতে পারে।

গত নভেম্বরের ২ তারিখে এখানে পাখিগুলো প্রথম দেখা যায়। পৃথিবীব্যাপী বিপন্ন একটি পাখি দেশি গাংচষা। ইংরেজি নাম ‘ইন্ডিয়ান স্কিমার’। অসাধারণ সৌন্দর্যের এই পাখি দেখার লোভ সামলানো খুবই মুশকিল। তাই পরের সাত দিনের প্রায় প্রতিদিনই ফেসবুকে ওই পাখি দুটির ছবি দেখলাম। বেশ কিছু পাখি আলোকচিত্রী এর ছবি তুলতে গিয়েছিলেন। পাখি দুটির পেছনে ছোটাছুটি করেছেন। এদেশে যেকোনো জায়গায় বিরল পাখি দেখা গেলে এখন আলোকচিত্রীরাও ছুটে যান। আগ্রহ নিয়ে ছবি তোলেন। বেশির ভাগ সময়ই তাঁরা পাখি নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করেন। তবে কোনো কোনো সময় তাঁদের অতি উৎসাহ বিরক্তির কারণও হয়। নভেম্বর মাসজুড়ে পাখি দুটি ওই এলাকায় দেখা গেছে। তারপর আর নেই। হয়তো খাবারের এলাকার পানি কমে যাওয়ায় তারা জায়গা পরিবর্তন করেছে।

দেশি গাংচষা পদ্মা নদীতে দেখা গেছে হাতে গোনা কয়েকবার। পাখিটি আমার বন্ধু সায়েম চৌধুরী ২০০৭ সালের ১৫ অক্টোবর একবার দেখেছেন পদ্মা নদীর মুন্সিগঞ্জে। আর আমি দেখি ২০১০ সালের ১০ নভেম্বর যমুনার পাবনা অংশে। এরপর ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে একটি বড় দল দেখতে পাই। সে সময় পাখিটির কয়েকটি বাসাও পেয়েছিলাম। মানুষ ও কুকুরের অত্যাচারে পাখিগুলো খুব বেশি দিন টিকতে পারেনি। তারপর আর ওই অঞ্চলে গাংচষার দেখা মেলেনি।

দেশি গাংচষা মূলত উপকূলের পাখি। প্রায় দুই যুগ ধরে প্রতিবছর এটি দেখতে পাই হাতিয়ার দমার চরের মুক্তারিয়া চ্যানেলে। চেউয়া মাছের এই বড় অভয়ারণ্যে পাখিটির ডাক, শোরগোল আর মাছ ধরার ভঙ্গি সবাইকে মুগ্ধ করে। প্রতিবছর এ এলাকায় গড়ে দুই হাজার পাখি নিয়মিত দেখা যায়। গোটা পৃথিবীতে এই প্রজাতির সংখ্যা ৪০০০ থেকে ৬০০০টি।

বাংলাদেশ ছাড়া বেশির ভাগ পাখি আছে ভারতে, সামান্য কিছু সংখ্যায় দেখা যায় নেপাল আর মিয়ানমারে। এখন ভেবে দেখুন, দুনিয়ার পাখির মোট সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বাংলাদেশের সীমানায়। ২০১৬ সালের পর থেকে মুক্তারিয়া চ্যানেলে এই পাখির সংখ্যা একেবারেই কমতে শুরু করে।

কোন কারণে সংখ্যা কমে যাচ্ছে, আর কোন অচেনা জায়গায় পাখিটি পাড়ি দিচ্ছে, তা প্রায় অজানাই ছিল। এরপর পুরো উপকূলে একটি বড় শুমারি হলো। ঠিকই পাখিটির অচেনা আস্তানা আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম। মনে শান্তি এসেছিল—অন্তত পাখিটি হারিয়ে যায়নি। জায়গাটি হলো জাইজ্জার চর। সন্দ্বীপ থেকে খুব সহজেই যাওয়া যায়।

গাংচষা নিয়ে পাখিদেখিয়েদের আগ্রহের কমতি নেই। পাখিটি এদেশের সীমানায় ঠিকমতো টিকে আছে কি না, সেই আশায় সেগুলো প্রতিবছর আমরা গণনা করি। কোনো বছর এই পাখির দল খুঁজে না পেলে অস্থির লাগে। পাখিটি এতই সুন্দর যে সেটির ছবি তুলতে না পারা জীবনের বড়ই অপূর্ণতা। বেশির ভাগ আলোকচিত্রীরই এ রকম ধারণা। তবে ছবি তোলার জন্য পাখির খুবই ছোট একটি দলকে বিরক্ত না করাই পাখিটির জন্য মঙ্গল হবে। সবকিছুর মধে৵ আমাদের দেশি গাংচষারা টিকে থাকুক, এই আশা সব সময়েরই।

  • সীমান্ত দীপু, বন্য প্রাণী গবেষক