চলতি বছরের ৮ মে। প্রকৃতিতে তখন বৈশাখ মাস। খুব সকালে হাঁটতে বেরিয়ে ফেরার পথে ব্রহ্মপুত্রতীরের বিশ্বেশ্বরী দেবী রোডে বিকাশ সার্ভিস সেন্টারের সামনে লাগানো সেন্ট ক্রিস্টোফার লিলিগাছে চোখ আটকে গেল। গাছে ফুটে আছে বেশ কয়েকটি ফুল। এর আগেও কয়েক দিন ছবি তুলতে গিয়েছি। কিন্তু আমার আগে কেউ ফুল তুলে নিয়ে যাওয়ায় ছবি তুলতে পারিনি। এবার ঝটপট ছবি তুলে ফেললাম।
প্রকৃতির অপূর্ব রূপ ও বৈচিত্র্যের এক অনুপম নিদর্শন হলো সেন্ট ক্রিস্টোফার লিলি। বহুবর্ষজীবী কন্দজ এই উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম Crinum jagus, এটি Amaryllidaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত বিরুৎ–জাতীয় উদ্ভিদ। এ উদ্ভিদটি তার মনোমুগ্ধকর সুবাস, বরফের মতো উজ্জ্বল সাদা ফুল এবং বিশালাকার পাতার জন্য সারা বিশ্বেই বাগানপ্রেমী ও উদ্ভিদবিদদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত। ক্রিনাম গণের উদ্ভিদগুলোর উৎপত্তিস্থল মূলত আফ্রিকার ক্রান্তীয় অঞ্চল হলেও বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুযুক্ত দেশে ব্যাপকভাবে এর চাষাবাদ করা হয়।
সেন্ট ক্রিস্টোফার লিলি তার স্বতন্ত্র ও আকর্ষণীয় বাহ্যিক গঠনের কারণে খুব সহজেই সবার নজর কাড়ে। এই উদ্ভিদের মূল ভিত্তি হলো মাটির নিচে থাকা বিশাল আকৃতির কন্দ বা বাল্ব। এই কন্দ থেকেই পাতা ও পুষ্পদণ্ড বের হয়। এই কন্দগুলোর ব্যাস সাধারণত ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। মাটির নিচে থাকা এই কন্দ উদ্ভিদটিকে প্রতিকূল আবহাওয়ায় বেঁচে থাকতে সাহায্য করে।
সেন্ট ক্রিস্টোফার লিলির পাতাগুলো বেশ প্রশস্ত, দীর্ঘ এবং গাঢ় সবুজ রঙের হয়। পাতাগুলোর গঠন ফিতার মতো বা কিছুটা বল্লমাকার। পরিপক্ব উদ্ভিদের পাতাগুলো ৬০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার দীর্ঘ এবং ৮ থেকে ১২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত চওড়া হতে পারে। পাতাগুলোর উপরিভাগ মসৃণ এবং এর মাঝামাঝি অংশ কিছুটা বাঁকানো থাকে, যা পুরো গাছটিকে একটি প্রস্ফুটিত গোলাপের আকৃতির মতো ছড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে।
এই উদ্ভিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর সৌন্দর্যমণ্ডিত ফুল। গাছের কেন্দ্রস্থল থেকে একটি শক্ত, ফাঁপা ও দীর্ঘ মঞ্জরিদণ্ড ওপরের দিকে উঠে আসে, যার দৈর্ঘ্য ৫০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার হতে পারে। এই ডাঁটার মাথায় ছাতার মতো গুচ্ছাকারে ৪ থেকে ১২টি সুগন্ধি ফুল ফোটে। ফুলের ফাঁপা কলিও দেখতে সুন্দর।
প্রতিটি ফুলে ছয়টি ধবধবে সাদা পাপড়ি থাকে, যা গোড়ার দিকে একত্র হয়ে একটি সরু নলের আকৃতি ধারণ করে। সেন্ট ক্রিস্টোফার লিলির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর তীব্র ও মিষ্টি সুবাস, যা বিশেষ করে সন্ধ্যায় ও রাতে চারপাশ আমোদিত করে তোলে। ফুলের কেন্দ্রে থাকা দীর্ঘ ও সুগঠিত পুংকেশরগুলো এর নান্দনিকতা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সেন্ট ক্রিস্টোফার লিলি কেবল একটি দৃষ্টিনন্দন শোভাবর্ধক উদ্ভিদই নয়, এর বেশ কিছু ব্যবহারিক ও ঔষধি গুরুত্ব রয়েছে। উদ্যানবিদ্যায় সেন্ট ক্রিস্টোফার লিলির চাহিদা ব্যাপক। গৃহস্থালির বাগান, পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন ও জলাশয়ের ধারে সীমানা গাছ হিসেবে এটি রোপণ করা হয়। ছায়াঘেরা স্থানেও এটি বেশ ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে বলে ইনডোর বা ব্যালকনি প্ল্যান্ট হিসেবেও এর কদর রয়েছে।
আফ্রিকান প্রথাগত চিকিৎসাশাস্ত্রে সেন্ট ক্রিস্টোফার লিলির বহুল ব্যবহার রয়েছে। এর কন্দ ও পাতার নির্যাস বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। জ্বর, কাশি, বাতের ব্যথা, প্রদাহ এবং মেমোরি লস বা স্মৃতিভ্রমের চিকিৎসার জন্য স্থানীয় কবিরাজেরা এর বিশেষ ব্যবহার করে থাকেন।
সেন্ট ক্রিস্টোফার লিলি প্রকৃতি ও উদ্যানপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য উপহার। উপযুক্ত আর্দ্রতা ও সামান্য পরিচর্যা পেলেই এটি বছরের পর বছর ধরে তার রূপ ও সুবাসে প্রকৃতিকে সমৃদ্ধ করে রাখতে পারে।
চয়ন বিকাশ ভদ্র, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি কলেজ, ময়মনসিংহ