গোরখোদ বসন্তবাউরির ওপর সামনে থেকে আক্রমণরত স্ত্রী দুধরাজ। ঢাকার মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে
গোরখোদ বসন্তবাউরির ওপর সামনে থেকে আক্রমণরত স্ত্রী দুধরাজ। ঢাকার মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে

পাখিরা যখন লড়াইয়ে নামে 

ঘটনাটা ২০২৩ সালের। ফেব্রুয়ারি মাসে সুন্দরবনের কচিখালীতে ইরাবতী ডলফিনের ছবি তুলতে গিয়ে ডান পায়ে ব্যথা পেলাম। তিন দিনেও সে ব্যথা সারল না। ব্যথা নিয়েই সুন্দরবন থেকে ঢাকা ফিরলাম। এরপর প্রায় তিন মাস দূরে কোথায় পাখি দেখতে যেতে পারলাম না। দেখতে দেখতে শীত, বসন্ত পেরিয়ে গ্রীষ্ম এল। বিভিন্ন প্রজাতির পাখির প্রজনন শুরু হয়ে গেল। যেহেতু এর মধ্যেও পায়ের ব্যথা ঠিকমতো সারল না। পাখি দেখতে দূরে কোথাও যেতে পারলাম না। তাই ঢাকার ভেতরের বৃক্ষশোভিত এলাকা মিরপুরের জাতীয় উদ্যানেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

সে অনুযায়ী ওই বছরের ৬ মে সকালে উদ্যানে গেলাম। চিড়িয়াখানার পাশের গেট দিয়ে ঢুকে হাঁটতে হাঁটতে বেড়িবাঁধের পাশের গোরান চটবাড়ি গেটের দিকে চলে এলাম।

গোরান চটবাড়ি গেটের আশপাশের গাছগুলোতে ইতিমধ্যেই শাহ বুলবুলি বা দুধরাজ, গোরখোদ বসন্তবাউরি, ঝুঁটিশালিক, গো-শালিক, দোয়েল, কুপোখ, হলদে পাখি ইত্যাদি প্রজনন করতে শুরু করেছে। এসব পাখির মধ্যে দুধরাজ ও গোরখোদ বসন্তবাউরির ছবি তোলা নিয়ে সবাই বেশ ব্যস্ত। পাশাপাশি দুটি গাছের একটিতে দুধরাজের বাসা। বাসায় দু–তিন দিন বয়সের চারটি ছানা। পালাক্রমে মা-বাবা ওদের খাওয়াচ্ছে। পাশের মরা গাছটিতে বাসা বেঁধেছে গোরখোদ বসন্তবাউরি। বাসায় সম্ভবত ডিম আছে। একটি পাখি বাসার ভেতর ডিমে তা দিচ্ছে। অন্যটি পাশের গাছের ডালে বসে আছে। সকাল ঠিক ১০টা ১৪ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে হঠাৎ একটি স্ত্রী দুধরাজ প্রচণ্ড জোরে উড়ে এসে বসন্তবাউরিটিকে ঠোকর দিল। এরপর প্রায় ৫০ সেকেন্ড ধরে সে একবার ডান ও একবার বাঁ দিক থেকে সমানে ওকে ঠোকরাতে থাকল। কিন্তু বসন্তবাউরিটি শুধুই প্রতিরোধ করে গেল, প্রতিঘাত করল না এবং ওর জায়গা থেকেও
সরল না। ঘণ্টাখানেক ধরে এই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকল। একসময় আমরা ওদের দিক থেকে নজর সরিয়ে ঝুঁটিশালিকের বাসার কাছে চলে গেলাম।

যদিও বসন্তবাউরিটি মোটেও দুধরাজের জন্য হুমকি ছিল না। কিন্তু দুধরাজটির কাছে তাকে হুমকিস্বরূপ মনে হয়েছে, তাই সে আক্রমণ করেছে। যাহোক, এবার পাখিদের এই মারামারি, যুদ্ধ বা আক্রমণাত্মক আচরণ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। পাখিদের আক্রমণ করার প্রবণতা একটি জটিল ও বহুস্তরীয় আচরণ, যা বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে তীব্রতর হয়ে ওঠে। এরূপ আচরণের বেশ কিছু কারণ রয়েছে।

সঙ্গী বাছাইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতা: প্রজনন মৌসুমে পুরুষ পাখিদের প্রধান লক্ষ্য থাকে স্ত্রীকে আকর্ষণ করা (কিছু ব্যতিক্রম বাদে)। একাধিক পুরুষ একই স্ত্রীর জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। যুদ্ধ বা লড়াই ছাড়াও ওরা ডাক, নাচ ও রঙিন পালকের প্রদর্শনের মাধ্যমে তা প্রকাশ করে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শক্তিশালী ও সুস্থ জিনধারী পাখিটিই সঙ্গী পায়, যা প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রজাতির উন্নয়নে সহায়তা করে।

নিজস্ব এলাকা প্রতিষ্ঠা ও রক্ষণ: প্রজননকালে প্রতি জোড়া পাখি বাসা বানানো, খাদ্য সংগ্রহ ও নিরাপত্তার জন্য একটি নির্দিষ্ট এলাকা দখলে রাখে। সেই এলাকায় অন্য কোনো পাখি ঢুকলেই সে তাৎক্ষণিকভাবে আক্রমণ করে।

গোরখোদ বসন্তবাউরিকে পেছন দিক থেকে আক্রমণ করছে একটি স্ত্রী দুধরাজ

বাসা, ডিম ও বাচ্চা রক্ষা: ডিম পাড়া ও বাচ্চা ফোটার পর পাখিদের আক্রমণাত্মক আচরণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এ সময় এমনকি শান্ত স্বভাবের পাখিরাও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। শিকারি প্রাণী, যেমন সাপ, বিড়াল বা অন্য পাখির হাত থেকে ডিম-ছানা রক্ষার জন্য প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এমনকি মানুষকে হুমকি মনে করলে তাকে আক্রমণ করতেও ছাড়ে না। আবার শত্রুকে তাড়াতে অনেক সময় একাধিক পাখি একসঙ্গে আক্রমণ করে।

খাদ্যের জন্য প্রতিযোগিতা: প্রজনন মৌসুমে পাখিদের শক্তির চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। ডিম উৎপাদন, বাসা বানানো ও ছানা লালন–পালনের জন্য অতিরিক্ত খাদ্যের প্রয়োজন হয়। খাদ্য সীমিত হলে সংঘর্ষ বাড়ে। সাধারণত শক্তিশালী পাখি বেশি খাদ্য দখলে নেয় ও দুর্বলরা খাদ্য পায় না।

সামাজিক প্রাধান্য: অনেক পাখির দলে সামাজিক স্তর থাকে। কে আগে খাবার পাবে বা কোথায় বসবে, তা এই স্তরের ওপর নির্ভর করে। এ অবস্থান অনেক সময় লড়াইয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।

হরমোনের প্রভাব: প্রজননের মৌসুমে পাখিদের হরমোনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। এতে স্নায়ুতন্ত্র উত্তেজিত হয়, যা পাখিদের আক্রমণাত্মক হতে সাহায্য করে।

সংকেত ও ভুল ব্যাখ্যা: অনেক সময় পাখি নিজের প্রতিবিম্বকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে আক্রমণ করে। কাচ, আয়না বা চকচকে জিনিসে এটি বেশি দেখা যায়। প্রজনন মৌসুমে এই প্রবণতা বাড়ে।

শক্তি ও বেঁচে থাকার কৌশল: সব ধরনের আক্রমণাত্মক আচরণ প্রকৃতির একটি অভিযোজন প্রক্রিয়া। এটি ‘ব্যয়-সুবিধা’ নীতির ওপর নির্ভরশীল। তবে পাখি সচরাচর মারাত্মক আঘাত এড়াতে চেষ্টা করে। কারণ, অতিরিক্ত আঘাতে প্রজননপ্রক্রিয়া ব্যর্থ হতে পারে। তাই অনেক ক্ষেত্রে লড়াই প্রতীকী পর্যায়েই শেষ হয়।

শেষ কথা

প্রজনন মৌসুমে পাখিদের এই সংঘর্ষ নিছক মারামারি নয়; এটি টিকে থাকা, বংশ রক্ষা ও জিন বহনের সংগ্রাম। মানুষের চোখে যুদ্ধ মনে হলেও প্রকৃতির কাছে এটি বেঁচে থাকার অনিবার্য কৌশল।

লেখক, পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়