
বিভাগের চার জেলায় ১৭৯টি নদ-নদীর বেশির ভাগই অস্তিত্বসংকটে। বিপন্ন কৃষি ও জনস্বাস্থ্য, বিলীন হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানি।
ময়মনসিংহ অঞ্চলের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও যোগাযোগব্যবস্থার মূল ধমনি ছিল এর নদী নেটওয়ার্ক। হিমালয় থেকে নেমে আসা ব্রহ্মপুত্র নদকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য শাখা নদী, উপনদী, খাল ও প্লাবনভূমি। কিন্তু গত তিন দশকে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, নিয়ন্ত্রণহীন বর্জ্য নিষ্কাশন, নদী অববাহিকা দখল এবং খননকাজের দীর্ঘসূত্রতায় এই বিশাল জলতন্ত্র এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রশাসন চার জেলার জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নদ–নদীর একটি তালিকা প্রস্তুত করে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো সেই তালিকা অনুযায়ী, ময়মনসিংহ বিভাগে মোট নদ-নদীর সংখ্যা ১৭৯। এর মধ্যে নেত্রকোনায় ৯৪টি, জামালপুরে ১৫টি, শেরপুরে ১১টি এবং খোদ ময়মনসিংহ জেলায় রয়েছে ৫৯টি নদ-নদী।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, এই ১৭৯টি নদ–নদীর বেশির ভাগই এখন মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার পথে। নদীগুলোতে বছরের আট মাসই কোনো কার্যকর পানির প্রবাহ থাকে না। শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলোর বুক শুকিয়ে ধু ধু বালুচরে পরিণত হয়, যেখানে স্থানীয় মানুষেরা ফসল চাষ করেন। অথচ সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, প্রশাসন বা পাউবোর কাছে এই সংকটাপন্ন বা মৃতপ্রায় নদ–নদীগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারি তালিকা নেই।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) তাদের নিজস্ব মাঠপর্যায়ের গবেষণার ভিত্তিতে ময়মনসিংহ বিভাগের ৯টি নদ–নদীকে ‘সবচেয়ে বেশি সংকটাপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই নদ–নদীগুলো হলো ব্রহ্মপুত্র, সোমেশ্বরী, মহাদেও, সুতিয়া, সুতিখালী, খিরু, বানার, আইমান ও মগড়া। বেলার তালিকায় আইমান নদকে একসময় ‘হারিয়ে যাওয়া নদ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, যদিও সম্প্রতি পাউবো এর কিছু অংশ খনন করেছে। বেলার বিভাগীয় কর্মশালায় নদ–নদীগুলোকে বাঁচানোর জন্য ২১টি জরুরি সুপারিশ করা হয়েছিল, যার মধ্যে প্রধান ছিল—সিএস ম্যাপ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ, উৎসমুখের সব বাঁধ অপসারণ এবং নদীপ্রবাহ বিঘ্নকারী অবকাঠামো ভেঙে ফেলা। কিন্তু বাস্তবে এসব সুপারিশের বেশির ভাগই আলোর মুখ দেখেনি।
ময়মনসিংহের শিল্পায়নের কেন্দ্রবিন্দু বলা হয় ভালুকা ও ত্রিশাল উপজেলাকে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, ডাইং, গার্মেন্টস ও সিরামিক শিল্পের দ্রুত বিকাশ এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করলেও, তা স্থানীয় নদ–নদীগুলোর জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ি ইউনিয়নের বুক চিরে বয়ে গেছে লাউতি খাল। এই খাল মল্লিকবাড়ি এলাকায় গিয়ে মিশেছে ঐতিহাসিক খিরু নদে। সরেজমিনে লাউতি খাল ও খিরু নদের সংযোগস্থল ঘুরে দেখা গেছে, শিল্পকারখানা থেকে অবিরাম নির্গত বর্জ্যের কারণে লাউতি খালের পানি এখন কুচকুচে কালো।
এই বিষাক্ত পানির প্রবাহ যখন খিরু নদে গিয়ে মিশছে, তখন পুরো নদের পানিই তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। নদের আশপাশের বাতাসে একধরনের তীব্র, ঝাঁজালো রাসায়নিক গন্ধ ভেসে বেড়ায়। এই গন্ধ এতই তীব্র যে নদী বা খালের পাড়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে পাঁচ মিনিটের বেশি দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব। বর্জ্যের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পানির ওপর মাঝেমধ্যেই ক্ষতিকর গ্যাসের বুদ্বুদ উঠতে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, দুই দশক আগেও এই লাউতি খাল ও খিরু নদ ছিল স্বচ্ছ পানির উৎস এবং গ্রামীণ জীবনযাত্রার প্রধান ভিত্তি।
ত্রিশাল উপজেলার ভেতর দিয়ে বয়ে চলা বানার নদও এই দূষণের হাত থেকে রেহাই পায়নি। ত্রিশালের সাইনবোর্ড এলাকায় বানার সেতুর পাশে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, খিরু নদ যেখানে কালো পানিতে আক্রান্ত, সেখানে বানার নদ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ‘দুধের মতো সাদা’ পানি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এটি কোনো প্রাকৃতিক সাদা পানি নয়; নদের উজানে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সিরামিক কারখানার রাসায়নিক মিশ্রিত তরল বর্জ্য দিনরাত এই নদে ফেলা হচ্ছে।
কারখানার উৎপাদন চক্রের ওপর নির্ভর করে এই পানির রং কখনো নীল, কখনো লাল, আবার কখনো গাঢ় বেগুনি আকার ধারণ করে। এই বানার ও খিরু নদের বিষাক্ত পানির প্রবাহ শেষ পর্যন্ত গিয়ে মিশছে শীতলক্ষ্যা নদীতে। ফলে ময়মনসিংহের আঞ্চলিক দূষণ এখন ঢাকার চারপাশের নদীব্যবস্থার ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
লাউতি খাল ও খিরু নদের পাড়ের কৃষকদের এখন আর সেচ দেওয়ার মতো কোনো বিকল্প উৎস নেই। ভূগর্ভস্থ পানি তোলার খরচ বেশি হওয়ায় তাঁরা বাধ্য হয়ে নদ ও খালের এই রাসায়নিকযুক্ত কালো ও রঙিন পানি দিয়েই ধান ও অন্যান্য ফসলের জমিতে সেচ দিচ্ছেন।
হবিরবাড়ি গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী কৃষক মোস্তফা কামাল ১৮ কাঠা জমিতে আমন ও বোরো ধানের চাষ করেছেন। তিনি জানান, লাউতি খাল থেকে শ্যালো মেশিন দিয়ে পাম্প করে কারখানার বর্জ্যমিশ্রিত কালো পানিই তাঁকে জমিতে দিতে হয়। তিনি বলেন, ‘এই পানি দিলে ধানের গাছের গোড়া পচে যায়। ধানের চালের মানও খারাপ হয়ে যায়।’
ভালুকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান বলেন, কৃষিতে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ভালুকা উপজেলার ভরাডোবা, হবিরবাড়ি ও মল্লিকবাড়ি ইউনিয়নে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এর মধ্যে শুধু ভরাডোবা ইউনিয়নেই প্রায় ৩৫০ একর ধানের জমি আবাদের সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে।
এই কৃষি কর্মকর্তার মতে, বিভিন্ন টেক্সটাইল ও ডাইং মিলের রাসায়নিক মিশ্রিত তরল বর্জ্য সরাসরি কৃষি জমিতে প্লাবিত হচ্ছে। এই রাসায়নিকের কারণে মাটিতে ভারী ধাতু, যেমন লেড, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। ফলে ধান রোপণের পরপরই গোড়া পচা রোগ দেখা দেয়। মাটির জৈব গুণাগুণ ও অণুজীব চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
নুসরাত জামান আরও যোগ করেন, ভালুকার মাটি দেশি-বিদেশি ফল, যেমন কলা, পেঁপে, আঙুর, রাম্বুটান, খেজুর, ড্রাগন, আম, লেবু, মাল্টা এবং শর্ষে ও আখ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল। কিন্তু এভাবে যদি জলাশয় ও মাটি দূষিত হতে থাকে, তবে এই উদীয়মান ফল চাষের বিপ্লব অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে। এর জন্য দ্রুত সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত খাল খনন জরুরি।
‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ উপমার জীবন্ত প্রমাণ ছিল ময়মনসিংহ বিভাগের নদী-নালা। শোল, গজার, বোয়াল, পাবদা, ট্যাংরা, পুঁটিসহ শত শত প্রজাতির মাছ এসব নদ–নদী থেকে আহরণ করা হতো।
ভালুকা উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমান নদীর পানির বর্তমান গুণগত মান নিয়ে একটি বৈজ্ঞানিক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, মাছ বা যেকোনো জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য পানির প্রধান তিনটি সূচক হলো—দ্রবীভূত অক্সিজেন, পিএইচ ও অ্যামোনিয়ার মাত্রা।
বিভাগের চার জেলায় ৩ হাজার ৩৮৫ জন নদী দখলদার চিহ্নিত, রাজনৈতিক–প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে উচ্ছেদ অভিযান স্থবির।
শিল্পবর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ার কারণে পানির এসব সূচকের অবস্থা বেহাল। কারখানার বর্জ্যের কারণে পানিতে জৈব রাসায়নিক অক্সিজেনের চাহিদা ও রাসায়নিক অক্সিজেনের চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে গেছে। ফলে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা নেমে গেছে শূন্যের কাছাকাছি। অন্যদিকে বর্জ্যের কারণে পানিতে ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া ও পিএইচের মাত্রা সাধারণ সহনশীল সীমার চেয়ে অনেক বেশি। এই রাসায়নিক ও অক্সিজেনহীন পরিবেশে কোনো মাছ বা জলজ পোকামাকড়—এমনকি জলজ উদ্ভিদও বেঁচে থাকতে পারে না। খিরু ও সুতিয়া এখন জৈবিকভাবে একটি ‘মৃত জলধারা’।
সরকারি তথ্যমতে, ২০১২ সালে একটি বিশেষ প্রকল্পের আওতায় ভালুকা উপজেলার ২ হাজার ১ জন জেলেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত করা হয়েছিল। এসব জেলে বংশানুক্রমিকভাবে খিরু, বানার ও সুতিয়ায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
নদীদূষণের ফলে গত এক দশকে এই দুই হাজার জেলে পরিবারের জীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নদীতে এখন আর তেমন মাছও পাওয়া যায় না। ধামসূর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা সামলাল রবি দাস (৭৫) ভালুকা বাজারের মডেল মসজিদের পাশে দাঁড়িয়ে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমরা চৈত্র মাসের কড়া গরমেও এই খিরু নদের পানি হাত দিয়ে তুলে তৃষ্ণা মিটিয়েছি। নদের পানি এত পরিষ্কার ছিল যে তলার বালু দেখা যেত। নিজেদের ঘরের সব কাজ, গোসল এই পানিতেই হতো। আর এখন এই পানির দিকে তাকানো যায় না, দুর্গন্ধে নদের পাড় দিয়ে হাঁটা যায় না। আমাদের চোখের সামনে নদটা মরে গেল।’
মৎস্য কর্মকর্তা সাইদুর রহমান জানান, নদ–নদী মাছশূন্য হয়ে পড়ায় নিবন্ধিত জেলেদের বড় একটি অংশ তাঁদের পৈতৃক পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকে রিকশা বা ভ্যান চালাচ্ছেন, কেউ কেউ শহরে গিয়ে দিনমজুরের কাজ নিয়েছেন। আর একটি অংশ বাধ্য হয়ে স্থানীয় কৃত্রিম মাছের খামারগুলোতে স্বল্প বেতনে শ্রমিকের কাজ করছেন।
ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের একটি বড় অংশই চর্মরোগী। গ্রামীণ এলাকার মানুষ, বিশেষ করে যাঁরা কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত, তাঁরা বাধ্য হয়ে দূষিত পানিতে নামছেন। ফলে তাঁদের শরীরে তীব্র চুলকানি, একজিমা, অ্যালার্জি এবং দীর্ঘমেয়াদি ঘা বা ক্ষত তৈরি হচ্ছে।
কৃষক আবদুল হেলিমের (৬০) মতো শত শত কৃষক প্রতিদিন এই চর্মরোগের যাতনা সহ্য করছেন। পায়ে ও হাতে চুলকানির ক্ষত নিয়ে তাঁরা মাঠে কাজ করছেন।
মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম আরও জানান, চর্মরোগের পাশাপাশি এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে পেটের পীড়া, গ্যাস্ট্রিক ও আমাশয়ের প্রাদুর্ভাব অনেক বেশি। দূষিত পানির কারণে আশপাশের অগভীর নলকূপগুলোর পানিতেও ক্ষতিকর কেমিক্যালের অনুপ্রবেশ ঘটছে কি না, তা নিয়ে গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় ধরে এই রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকলে মানুষের লিভার ও কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
২০২৪ সালের শেষের দিকে ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রশাসন বিভাগের চার জেলার ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ নদ–নদীকে সম্পূর্ণ দখল ও দূষণমুক্ত করার জন্য একটি বড় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে। এই নদ–নদীগুলো হলো ব্রহ্মপুত্র, খিরু, সুতিয়া, মগড়া, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও মহারশি। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, এই প্রকল্পের মোট সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা।
২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের খনন প্রকল্প, উৎসমুখ খনন করতে না পারায় ভাটিতে সুফল মিলছে না।
এই বিশাল কর্মপরিকল্পনা ও বাজেট প্রস্তাবনার পর প্রায় দেড় বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। খিরু বা সুতিয়ার কোনো একটি পয়েন্ট থেকেও অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা যায়নি, কিংবা দূষণ রোধে কোনো দৃশ্যমান অবকাঠামো তৈরি হয়নি।
স্থানীয় পরিবেশবাদীদের মতে, এ ধরনের বড় বড় বাজেট মূলত আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং ফাইল চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
২০১৯ সালের ৩০ জুলাই জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন তাদের ওয়েবসাইটে ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলার ৩ হাজার ৩৮৫ জন অবৈধ নদী দখলদারের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করে। তৎকালীন জেলা প্রশাসনগুলো মাঠপর্যায়ে তদন্ত করে এই তালিকা তৈরি করেছিল।
তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শুধু ময়মনসিংহ জেলাতেই নদ–নদী ও খাল অবৈধভাবে দখল করে আছেন ২ হাজার ১৬০ জন, যা পুরো বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া জামালপুরে ৫৯৫ জন, নেত্রকোনায় ৫১২ জন এবং শেরপুরে ১১৮ জন দখলদার রয়েছেন। দখলদারদের তালিকায় শুধু স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ভূমিদস্যুরা আছেন এমন নয়; বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যালয়ও রয়েছে এ তালিকায়।
ব্রহ্মপুত্র নদের ময়মনসিংহ নগরীর পাটগুদাম সেতু এলাকায় দাঁড়ালে এই দখলের উৎসব স্পষ্ট দেখা যায়। নদের দুই পাশ ভরাট করে গড়ে উঠেছে পাকা ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। বিশাল নদটি এখানে এসে একটি সরু নালায় পরিণত হয়েছে। বাকি অংশে নদের বুকজুড়ে জেগে উঠেছে বিশাল বালুচর, যেখানে এখন অবৈধভাবে দখল করে চাষাবাদ করা হচ্ছে। ঈশ্বরগঞ্জের কাঁচামাটিয়া নদীর অবস্থাও একই রকম করুণ। ঈশ্বরগঞ্জ সেতু এলাকায় খোদ পৌরসভাই প্রতিদিনের টন টন বর্জ্য ফেলছে নদীর বুকে আর চারপাশ থেকে চলছে প্রভাবশালীদের অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ।
দখলদারদের এই দীর্ঘ তালিকা এবং উচ্ছেদ কার্যক্রম থমকে থাকা নিয়ে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) জন কেনেডি জাম্বিলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, ‘অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে জেলা প্রশাসনগুলো তাদের নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে থাকে। তবে আমি এই পদে নতুন এসেছি, তাই পূর্বের উদ্যোগ বা বর্তমান উচ্ছেদ অভিযানের সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি সম্পর্কে এই মুহূর্তে আমার জানা নেই।’
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের নাব্যতা উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের অধীনে গাইবান্ধা, জামালপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও কিশোরগঞ্জ—এই পাঁচ জেলায় নদের মোট ২২৭ কিলোমিটার অংশ খনন করার কথা।
২০১৯ সালের জুন মাসে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় প্রথম দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল—পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের নাব্যতা পুনরুদ্ধার করে সারা বছর যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী মাঝারি আকারের নৌযান চলাচল নিশ্চিত করা, যাতে শুষ্ক মৌসুমেও নদে অন্তত ৯০ মিটার প্রস্থ এবং ৮ থেকে ১০ ফুট গভীর পানি থাকে। এ ছাড়া কৃষিকাজে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করাও ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য।
বর্তমানে প্রকল্পের প্রায় ৪৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে দাবি করছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বাস্তবে ময়মনসিংহের মানুষ এর কোনো সুফল পাচ্ছেন না। নদের বুকজুড়ে এখনো ধু ধু চর এবং পানির তীব্র সংকট।
এই ব্যর্থতার মূল কারণ ব্যাখ্যা করেছেন বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মহসিন মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা নিচের দিকে যতই খনন করি না কেন, ব্রহ্মপুত্রে পানি আসবে না, যদি না এর উৎসমুখ সচল থাকে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনার মূল সংযোগস্থল বা উৎসমুখ হলো গাইবান্ধা এবং জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ এলাকা। এই উৎসমুখের প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকা দীর্ঘকাল ধরে পলি জমে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে আছে। উৎসমুখ খনন করতে না পারায় উজান থেকে পানি নিচে নামতে পারছে না।’
মহসিন মিয়া আরও জানান, পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সরকার এখন উৎসমুখ থেকে নিচের দিকে ৭০ কিলোমিটার নদ খননের কাজ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে হস্তান্তর করেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে সেনাবাহিনী উৎসমুখ এলাকায় ড্রেজিংয়ের কাজ শুরু করেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ জেলায় বর্জ্য শোধনের প্ল্যান্ট (ইটিপি) স্থাপনযোগ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯৯। এর মধ্যে ৯৫টি প্রতিষ্ঠানে ইটিপি রয়েছে, ৪টিতে নেই।
স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, এসব ইটিপি শুধু কাগজে–কলমেই সচল থাকে। কারখানার মালিকেরা বিদ্যুৎ বিল বাঁচাতে ও খরচ কমাতে দিনের বেলা ইটিপি বন্ধ রাখেন। গভীর রাতে, বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে বা ছুটির দিনে তাঁরা ইটিপি না চালিয়ে সরাসরি বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য নদের লাইনে ছেড়ে দেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা এই অভিযোগের জবাবে বলেন, ‘ইটিপি সঠিকভাবে চলছে কি না, তা ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করার জন্য আমরা কারখানাগুলোতে আইপি ক্যামেরা স্থাপন করছি। তবে অনেক সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বা কারিগরি ত্রুটির কারণে ক্যামেরা বন্ধ থাকে। অনেকে হয়তো ইটিপি সঠিকভাবে চালান না।’ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই দূষণকারী প্রতিষ্ঠান, আবার প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই দূষণকারী প্রতিষ্ঠান নয়। আমরা র্যান্ডম ভিজিট করে যদি কাউকে দূষণ করতে দেখি, তবে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিই। নোটিশ করা হয়। জবাব সন্তোষজনক না হলে জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা করা হয়। ছাড়পত্র নবায়নের সময় ল্যাব টেস্টের রিপোর্ট যদি নির্দিষ্ট মানমাত্রার ভেতরে থাকে, তবেই আমরা নবায়ন করি।’
প্রাকৃতিক রিচার্জ বন্ধ হয়ে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর।
ত্রিশালের বানার নদের রঙিন ও বিষাক্ত পানি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে শেখ মো. নাজমুল হুদা বলেন, ‘রঙিন পানি মানেই যে তা দূষিত পানি, এই ধারণা সঠিক নয়। ২০২৩ সালের আগে বাংলাদেশে রঙিন পানির কোনো বৈজ্ঞানিক স্ট্যান্ডার্ড বা মানমাত্রা নির্ধারিত ছিল না। একটি ডাইং কারখানা কী পরিমাণ রঙিন পানি নদীতে ছাড়তে পারবে, তার নিয়ম ছিল না। ২০২৩ সালের নতুন বিধিমালায় এই স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, যেসব কারখানার ২০২৩ সাল পর্যন্ত সাধারণ কেমিক্যাল বা বায়োলজিক্যাল ইটিপি ছিল, তারা রাতারাতি কোটি কোটি টাকা খরচ করে রং দূর করার প্রযুক্তি স্থাপন করতে পারবে না। এর সঙ্গে অর্থ ও সময় যুক্ত, তাই তাদের ‘যৌক্তিক সময়’ দিতে হবে। যদিও তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে বিধিমালার পর তিন বছর পার হয়ে গেছে; এই সময়ের মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলার কথা ছিল।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. খালিদ মাহমুদ ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ প্রবণতা এবং ময়মনসিংহের ভূগর্ভস্থ পানির গভীরতার পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করেছেন। গবেষণার ফলাফলে ১৯৮১–২০১৭ সময়ে ময়মনসিংহে নদের গড় প্রবাহ কমার সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরও গভীরে যাওয়ার প্রবণতা পাওয়া গেছে।
ড. খালিদ মাহমুদের মতে, ময়মনসিংহের নদীজল, প্লাবনভূমি, কৃষি এবং মানুষের জীবন ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ব্রহ্মপুত্র নদ, এর শাখা নদী, পুরোনো চ্যানেল, খাল, বিল ও প্লাবনভূমি মিলে একটি গুরুত্বপূর্ণ জলতন্ত্র তৈরি করে। গবেষণায় সরাসরি প্রাকৃতিক রিচার্জের পরিমাণ পরিমাপ করা হয়নি। তবে নদের গড় প্রবাহ কমার সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানি আরও গভীরে চলে যাওয়ার একটি উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে অধ্যাপক খালিদ মাহমুদ মনে করেন, এ সম্পর্ককে একক কারণ হিসেবে দাবি করা উচিত নয়। ভূগর্ভস্থ পানির অবস্থা বৃষ্টিপাত, স্থানীয় রিচার্জ, সেচের জন্য পাম্পিং, নগরায়ণ, ভূমি-ব্যবহার পরিবর্তন এবং প্লাবনভূমি দখলের মতো কারণেও প্রভাবিত হয়। টেকসই ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠীয় পানি ব্যবস্থাপনার জন্য নদীপ্রবাহ, রিচার্জ জোন, বিলঝিল, সেচ-পাম্পিং এবং শুষ্ক মৌসুমের পানি ব্যবহারকে একই পরিকল্পনার আওতায় এনে তথ্যভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থাপনা জরুরি। অববাহিকাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা, রিচার্জ জোন ও বিলঝিল সংরক্ষণ, পাম্পিং নিয়ন্ত্রণ এবং শুষ্ক মৌসুমে ভূপৃষ্ঠীয় পানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগের আরেকজন বিশিষ্ট গবেষক অধ্যাপক ড. দীন ইসলাম ভালুকা এলাকার ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানির গুণমান নিয়ে দুই বছর মেয়াদি একটি নিবিড় গবেষণা চালিয়েছেন। তিনি তাঁর গবেষণার প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ করে বলেন, ভালুকা এলাকায় অপরিকল্পিত আবাসন এবং দ্রুত শিল্পায়নের কারণে উপরিভাগের জলাশয়গুলোর দূষণ এখন মাটির নিচের পানির স্তরকেও আক্রান্ত করতে শুরু করেছে। এখনো ভূগর্ভস্থ পানির গুণাগুণ পুরোপুরি বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছায়নি। তবে উপরিভাগের দূষণ যেভাবে ছড়াচ্ছে, তাতে কয়েক বছরের মধ্যে মাটির নিচের পানিও পানের অযোগ্য হয়ে পড়বে। এর একমাত্র সমাধান—শিল্পকারখানার ব্যবহৃত পানি শতভাগ দূষণমুক্ত করে তবেই প্রকৃতিতে ছাড়া।