কক্সবাজার দক্ষিণ বনাঞ্চলে টিকে আছে মাত্র ৫০০ মা গাছ

কক্সবাজারের টেকনাফের শিলখালী গর্জনবনে উরি আম প্রজাতির একটি মা গাছ
ছবি:  সংগৃহীত

কক্সবাজারের প্রাকৃতিক বন থেকে মা গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। এসব গাছের বীজ থেকে বনের বিস্তারও হতো। কিন্তু নির্বিচার গাছ কাটা, দখল, অপরিকল্পিত উন্নয়নের চাপে মা গাছ কমে সেই বন এখন মৃতপ্রায়।

কক্সবাজার সদর, উখিয়া, রামু ও টেকনাফ উপজেলার বনাঞ্চল ও এর আশপাশে মা গাছের সংখ্যা নির্ণয়ে করা এক জরিপে দেখা গেছে, এসব এলাকায় এখন মাত্র ৫০০টি মা গাছ টিকে আছে।

গবেষকেরা বলছেন, মা গাছ কমে যাওয়ার অর্থ হলো বন অভিভাবকহীন হয়ে পড়ছে। এতে প্রাণ-প্রকৃতি তথা জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে, ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে বনের বাস্তুতন্ত্র।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সহযোগিতায় মা গাছ নিয়ে জরিপটি করেছে বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস)।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন বনাঞ্চলের পরিমাণ ৪৪ হাজার ১৭৪ হেক্টর। টেকসই বনায়ন ও বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য হুমকির মুখে থাকা বা বিপন্ন মা গাছ মূল্যায়ন ও সংরক্ষণ বিষয়ে ২০২৪ সালে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আর গত বছরের ডিসেম্বরে জরিপের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সিএনআরএস।

কক্সবাজার সদর, উখিয়া, রামু ও টেকনাফ উপজেলার বনাঞ্চল ও এর আশপাশে মা গাছের সংখ্যা নির্ণয়ে করা এক জরিপে দেখা গেছে, এসব এলাকায় এখন মাত্র ৫০০টি মা গাছ টিকে আছে।

মা গাছ ‘ফরেস্ট সিড ট্রি’ নামেও পরিচিত। গবেষণা প্রতিবেদনে মা গাছের কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ রয়েছে। যেমন মা গাছকে অবশ্যই উন্নত জিনগত বৈশিষ্ট্য, ভালো গঠন এবং প্রচুর পরিমাণে বীজ উৎপাদনে সক্ষম হতে হবে, যাতে এর থেকে জন্ম নেওয়া নতুন গাছগুলো সবল হয়। এমন গাছ হবে সুস্থ ও পরিণত। মা গাছের সুস্থতা ও সতেজতাও জরুরি। ভবিষ্যৎ গাছগুলোতে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা স্থানান্তরের জন্য মা গাছকে তাই রোগবালাই ও পোকামাকড়মুক্ত হতে হবে।

এ গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বনের জন্য মা গাছ একটি ভরকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। মা গাছ থেকে বীজ ছড়িয়ে পড়ে সারা বনে। ফলে বনের বিস্তৃতি ঘটে। নানা উদ্ভিদের জন্ম হয়। বন্য প্রাণীর জন্য বন নিরাপদ হয়ে ওঠে।

কক্সবাজারের বনাঞ্চল নিয়ে প্রায় চার দশক ধরে গবেষণা করে আসছেন মোহাম্মদ কামাল হোসাইন। মা গাছের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতি হেক্টর প্রাকৃতিক বনে ৮ থেকে ১০টি মা গাছ থাকা উচিত। কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বনাঞ্চল ও এর আশপাশে ২০ প্রজাতির ৫০০টি মা গাছ শনাক্ত হয়েছে। বন, পাহাড়ের পাদদেশে, বসতভিটা ও ধানখেতে টিকে আছে এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন গাছ।

বনের জন্য মা গাছ একটি ভরকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। মা গাছ থেকে বীজ ছড়িয়ে পড়ে সারা বনে। ফলে বনের বিস্তৃতি ঘটে। নানা উদ্ভিদের জন্ম হয়। বন্য প্রাণীর জন্য বন নিরাপদ হয়ে ওঠে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন

এগুলোর মধ্যে কয়েকটির স্বাস্থ্য ভালো নয় জানিয়ে এই প্রবীণ অধ্যাপক বলেন, মা গাছ নিয়ে কোনো সমীক্ষা আগে হয়নি। টিকে থাকা মা গাছগুলো রক্ষায় সচেতনতা তৈরি করতে হবে। এগুলো থেকে বীজ সংগ্রহ করে চারা তুলে বনায়ন করতে হবে।

মোহাম্মদ কামাল হোসাইন বলেন, ‘শতবর্ষী প্রাচীন এসব গাছের উচ্চতা অনেক বেশি, সোজা গড়ন ও বাজারমূল্য বেশি। এ কারণে গাছ পাচারকারীদের লক্ষ্য থাকে এগুলোর দিকে। ফলে আমাদের বনাঞ্চল থেকে এসব গাছ হারিয়ে যাচ্ছে।’

জরিপে পাওয়া ২০ প্রজাতির মা গাছের মধ্যে রয়েছে কেলি কদম, বৈলাম, ডেউয়া, উরিয়াম, লাল বাটনা, মাসজুত, চিকরাশি, কস্তুরি, জাদাচুয়া, ডালিয়া গর্জন, সিধা জারুল, ঢলি বাটনা, রক্তন, লক্ষ্মী আম, বাঁশপাতা, নালি জাম, সিভিট, শৈলা, শোগান ও লানা আছার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে কেলি কদম—৮৮টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যা ৭৪টি পাওয়া গেছে নালি জাম ও ডেউয়াগাছ। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৬৬টি পাওয়া গেছে মাসজুতগাছ। সর্বোচ্চ উচ্চতার ৮৫ দশমিক ৬ মিটার (২৮১ ফুট) মা গাছ পাওয়া গেছে রামুতে, উখিয়ায় রয়েছে সর্বনিম্ন ৫ দশমিক ২ মিটার উচ্চতার গাছ।

গবেষণায় প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেছেন সিএনআরএসের রফিকুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচ মাস ধরে গবেষণা চালিয়ে মা গাছের এ সংখ্যা পেয়েছেন তাঁরা। সবচেয়ে বেশি মা গাছ পাওয়া গেছে উখিয়া উপজেলায়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মা গাছ আছে টেকনাফ অঞ্চলে।

জরিপে পাওয়া ২০ প্রজাতির মা গাছের মধ্যে রয়েছে কেলি কদম, বৈলাম, ডেউয়া, উরিয়াম, লাল বাটনা, মাসজুত, চিকরাশি, কস্তুরি, জাদাচুয়া, ডালিয়া গর্জন, সিধা জারুল, ঢলি বাটনা, রক্তন, লক্ষ্মী আম, বাঁশপাতা, নালি জাম, সিভিট, শৈলা, শোগান ও লানা আছার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে কেলি কদম—৮৮টি।

কেন মা গাছ কমছে

গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, কক্সবাজার অঞ্চলে মা গাছ বা দেশীয় প্রজাতির বনজ গাছ কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণ রয়েছে। বন থেকে অতিরিক্ত মাত্রায় কাঠ ও অন্যান্য সম্পদ আহরণ এবং নির্বিচার গাছ কাটার কারণে দেশীয় প্রজাতির গাছগুলো উল্লেখযোগ্য হারে হারিয়ে যাচ্ছে। দুর্বল প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদনও মা গাছে কমে যাওয়া আরেকটি কারণ।

অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে বনভূমি ও গাছের প্রাকৃতিক বাসস্থান সংকুচিত হয়ে পড়ছে। স্থানীয় মানুষ ধীরে ধীরে বনভূমির গাছ কেটে ফেলছে এবং সেই জমিকে সবজি ও ফলের বাগানে পরিণত করছে, যা মা গাছ কমে যাওয়ার একটি কারণ।

কক্সবাজারের এই বনাঞ্চলে আগে কতটি মা গাছ ছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। তবে মা গাছের অতীত ও বর্তমান অবস্থার একটি ধারণা পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগ থেকে যেসব বনজ প্রজাতির মা গাছ থেকে সহজেই বীজ সংগ্রহ করা হতো, সেগুলো এখন ওই অঞ্চলে হুমকির সম্মুখীন বা বিপন্ন। বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা বলেছেন, বেশ কিছু প্রজাতি এখন ওই অঞ্চলে বিরল। সেখান থেকে বীজ সংগ্রহ করা ক্রমে কঠিন হয়ে পড়ছে।

এমন পরিস্থিতিতে আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস। জাতিসংঘ ঘোষিত এ দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘স্থানীয় উদ্যোগ, বৈশ্বিক প্রভাব’।

স্থানীয় নার্সারির মালিকেরা তাঁদের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাও জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, বনাঞ্চলে মা গাছের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। যেমন বৈলাম গাছের উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। একসময় কক্সবাজারে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া গেলেও এ গাছ বর্তমানে বিলুপ্তির মুখে। বনে এখন খুব কমসংখ্যক পরিণত মা গাছ অবশিষ্ট আছে। জরিপে মাত্র ১১টি বৈলামগাছ শনাক্ত করা হয়েছে।

২০২৪ সালে প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন কক্সবাজারের বনাঞ্চলে চারটি প্রজাতিকে কম ঝুঁকির বৃক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ এগুলো প্রকৃতিতে পাওয়ার কথা। কিন্তু জরিপে দেখা গেছে যে কক্সবাজারে এই প্রজাতিগুলোর টিকে থাকার মতো গাছের সংখ্যা খুবই বিরল। গবেষকেরা বলছেন, বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় মা গাছের বড় ভূমিকা রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস। জাতিসংঘ ঘোষিত এ দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘স্থানীয় উদ্যোগ, বৈশ্বিক প্রভাব’। স্থানীয় উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবেশ ও বনের জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী পালন করা হচ্ছে দিবসটি।