বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টারে তৈকর
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টারে তৈকর

তৈকর ও বনকাঁকরোলের কথা 

ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই দশকের বেশি সময় ধরে যাওয়া আসা। দীর্ঘ সময়ের এই পরিভ্রমণে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানান উদ্ভিদ-তৃণলতার সঙ্গে দারুণ সখ্য গড়ে উঠেছে। সেখানকার উদ্ভিদ-উদ্যান এবং জার্মপ্লাজম সেন্টারে গিয়েছি সবচেয়ে বেশি। এই দুটি প্রাঙ্গণে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন প্রজাতি যুক্ত হচ্ছে। এই লেখায় এমন দুটি ফল বা সবজির কথা জানাব, যার নাম হয়তো অনেকে শুনেছেন কিন্তু ছবি দেখেননি। দুটি ফলই জার্মপ্লাজম সেন্টারে দেখা। এর একটি তৈকর, অন্যটি গ্যাক বা বনকাঁকরোল। 

সম্প্রতি জার্মপ্লাজম সেন্টারে গিয়েছিলাম সেখানকার ফলবৈচিত্র্যের হালনাগাদ তথ্য–উপাত্ত জানতে। ভেতরে ঢুকেই ডান পাশের অফিস ঘরের বারান্দায় টেবিলে ফল দুটি দেখতে পেয়ে গাছের অবস্থান জানতে চাইলাম। কর্মরত বাগানিরা দেখালেন গাছ। তবে ফলের অবস্থান এতটাই ওপরে যে মুঠোফোন ছাড়া আলাদা ক্যামেরা না থাকায় ভালোভাবে ছবি তোলা সম্ভব হচ্ছিল না। অগত্যা গাছতলায় পড়ে থাকা ফলের ছবিই তুলতে হলো!

তৈকর

ফলটি স্থানীয়ভাবে তিকুল বা তিকুর নামেও পরিচিত। মাঝারি আকৃতির পাতাঝরা বৃক্ষ, ১৮ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। দেহকাণ্ড খাঁজকাটা, বাকল গাঢ় ধূসর থেকে গাঢ় বাদামি ও মসৃণ। শাখা খাটো ও ছড়ানো। পাতা সরল, প্রতিমুখ, ৫ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার লম্বা, দীর্ঘায়ত ও পুরু। পরিপক্ব ফলের রং হলুদ, রসালো, ওজন ৭০০ থেকে ৭৫০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। বীজ ৮ থেকে ১০টি, রসালো। ফলের স্বাদ টক-মিষ্টি।

তৈকরগাছ থেকে বছরে দুবার ফলন পাওয়া যায়। প্রথমবার আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর এবং দ্বিতীয়বার ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে এ গাছে ফুল আসে। প্রথমবার ফল সংগ্রহের উপযোগী হয় নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে এবং দ্বিতীয়বার ফল সংগ্রহের উপযোগী হয় এপ্রিল থেকে মে মাসের দিকে। একটি পরিণত গাছে ৩০০ থেকে ৩৫০টি ফল হয়। হেক্টরপ্রতি ফলন ৭০ থেকে ৭৫ টন হতে পারে। বৃহত্তর সিলেট তৈকর চাষের জন্য সম্ভাবনাময়। সেখানে স্থানীয়ভাবে এ ফল বেশ জনপ্রিয়। সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় তরকারিতে কচি ফল ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া আচার, জ্যাম জেলি তৈরি করেও খাওয়া হয়। তা ছাড়া কচি সবুজ ফল ফালি ফালি করে কেটে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায়। 

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টারে বনকাঁকরোল

তৈকর (Garcinia pedunculata) সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু চিরহরিৎ অরণ্যে জন্মে। বাংলাদেশে রংপুর ও সিলেট জেলায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। এ ফল আঠা ও রং তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। কাঠ তক্তা, কড়িকাঠ ও গৃহ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের আসাম রাজ্যে এই ফলের চাষ হয়। শুষ্ক ফল লেবুর বিকল্প হিসেবে ভারতের অনেক স্থানে ব্যবহৃত হয়। 

তৈকর একটি অপ্রচলিত ফল হলেও এটি রপ্তানিযোগ্য ফলগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৯৬ সালে বারি তৈকর-১ নামে একটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। এটি মূল্যবান পুষ্টি ও ঔষধি গুণসমৃদ্ধ ফল। ফলটি বিবিধ রোগ নিরাময়ের পাশাপাশি মুখে রুচি তৈরি করতেও সাহায্য করে। 

বনকাঁকরোল

বনকাঁকরোল দেখতে সাধারণ কাঁকরোলের মতোই। তবে আকারে দ্বিগুণ বা তিন গুণ বড়। একসময় বনবাদাড় বা গ্রামীণ ঝোপঝাড়ে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মাত। বর্তমানে প্রাকৃতিক আবাসে দুষ্প্রাপ্য। প্রতিটি বনকাঁকরোলের ওজন আধা কেজির মতো। কোনো কোনোটি এর চেয়ে বড় হতে পারে। সাধারণ কাঁকরোলের সঙ্গে এই কাঁকরোলের পার্থক্য কেবল ওজন আর পুষ্টিগুণে। এই কাঁকরোল দেশি জাতের মধ্যে সবচেয়ে বড়। প্রায় বিলুপ্ত হতে যাওয়া এই কাঁকরোল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক চকরিয়া এলাকার ফাঁসিয়াখালী বনভূমিতে খুঁজে পেয়েছেন। এটি সংরক্ষণে উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁরা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত ২২ জাতের কাঁকরোল সংরক্ষণ করেছে। এর মধ্য থেকে তিনটি উন্নত জাত উদ্ভাবনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে তাদের কাছে বড় জাতের এই কাঁকরোল নেই।

বনকাঁকরোল (Momordica cochinchinensis) একটি লতানো উদ্ভিদ। সাধারণত বাগানের বিভিন্ন বড় গাছে বেয়ে ওঠে। ১৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। আকর্ষী বেশ শক্ত। স্বাদের দিক থেকে হালকা তেতো। পাতার বোঁটা মজবুত এবং ৫ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। পাতা হৃৎপিণ্ডাকৃতি বা প্রশস্ত ডিম্বাকার, কিনারা ঢেউখেলানো, দাঁতানো এবং আগা সুচালো বা ক্রমশ সরু। ফুলের রং হলুদ থেকে সাদা; পাপড়িগুলো ডিম্বাকার থেকে আয়তাকার।

সবজি রান্নার পাশাপাশি ক্যানডি ও জ্যাম তৈরিতে বনকাঁকরোল কাজে লাগে। বীজের চারপাশে থাকা লাল ও তৈলাক্ত শাঁস (অ্যারিল) বীজের সঙ্গেই রান্না করা হয়; যা ‘জোই গ্যাক’ নামে ভারতের কোনো কোনো অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবার। অভিন্ন পদ্ধতির রান্না ভিয়েতনামে বিয়েসহ বিভিন্ন উৎসব–অনুষ্ঠানে পরিবেশন করা হয়।

মোকারম হোসেন, প্রকৃতি পরিবেশবিষয়ক লেখক