পুটনীর চরে বড়টিকি পানচিল। এ বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি
পুটনীর চরে বড়টিকি পানচিল। এ বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি

পাখি দেখতে পুটনীর চরে

ফাল্গুনের শেষ ভাগে এক অচেনা দুর্গম চরে গেলাম পাখি দেখতে। এর আগে কখনো এ চরে যাওয়া হয়নি। অজানা এই চরের নাম পুটনীর চর। চরটি আমাদের সুন্দরবনের সীমানার ভেতর। এখানে মানুষের চলাচল নেই বললেই চলে। এমনকি এই চরে বুনো প্রাণীরও কী অবস্থা, তা–ও আমাদের কাছে অজানাই বলে চলে।

সুন্দরবনের দক্ষিণ-পশ্চিমের শেষ প্রান্তে বঙ্গোপসাগরের বুকে পুটনীর দ্বীপ জেগে উঠেছে। দুবলার চর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার আর মোংলা থেকে এর দূরত্ব ১১০ কিলোমিটার। এই চরের পরই শুরু বিশাল সমুদ্র। পুটনীর চর থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে ৫০ কিলোমিটার গেলে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপটি পাওয়া যায়। মূলত শীতে হাজার হাজার জেলের আনাগোনা হয় দুবলার চরে। এখান থেকেই তাঁরা সমুদ্রে যান মাছ ধরতে। বেশির ভাগ মাছই শুঁটকি করে বিক্রি করেই তাঁদের জীবিকা চলে। দুবলা চর থেকে সাগরে যাওয়া নৌকাগুলো বেশ বড় ও শক্ত–সামর্থ্য। বিকেলবেলায় সেখান থেকে একটা নৌকা ভাড়া করলাম পুটনী যাওয়ার জন্য। এরপর খুব সকালে বের হওয়ার পরিকল্পনা হলো।

সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমাদের জাহাজটি বঙ্গবন্ধু চরে। সঙ্গে আছে ভাড়া করা সেই সাহসী নৌকাটি। এই চরে বিরল ইউরেশীয় ঝিনুকুমারের দেখা মিলল। সাম্প্রতিক সময়ে এই একটি দ্বীপেই মাত্র দুটি করে এই প্রজাতির পাখির দেখা পাওয়া যাচ্ছে। ভোরেই নাশতা সেরে উঠে পড়লাম নৌকায়। সাগরের বুক চিরে যেতে হবে পুটনীর চরে। কিছুক্ষণ চলার পরই আমাদের জাহাজ আড়াল হয়ে গেল। বিশাল বিশাল ঢেউ দেখে অনেকেই ভয় পেয়ে গেলাম। ঘুমানোর জন্য ভাড়া করা বড় জাহাজটি এই সাগরে চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আমরা জেলেদের নৌকা নিয়ে যাচ্ছি পুটনীর চরে।

সাগরের বুকে ঘণ্টাখানেক চলার পর দূর থেকে একটি গোলপাতাগাছ ভেসে যেতে দেখলাম। তার ওপর বসে আছে প্রায় ১০টি বড়টিকি পানচিল। এই পাখিগুলো সাগরের বুকে জেগে ওঠা চরেই কেবল দেখা যায়। শীতে এই পানচিল প্রজাতিটি আসে পরিযায়ী হয়ে। তবে খুব বেশি সংখ্যায় নয়। সব মিলিয়ে প্রতিবছর শ খানেক বড়টিকি পানচিলের দেখা মেলে। তাদের দেখা পেয়ে বেশ ভালো লাগল। মনে শান্তি পেলাম। ভয় কেটে গেল। ভাবলাম পুটনীর চর আর বেশি দূর নেই।

পুটনীর চরে নেমেই এক অদ্ভুত অনুভূতি পেলাম। একেবারেই নীরব। শুকনো মরা গাছগুলো পড়ে আছে। মানুষের বিচরণ কম বলেই চরটি দেখতে এত জীবন্ত। ভাটার সময় বিধায় চারপাশে বিশাল বালুচর চোখে পড়ছে। ভাবলাম, এ রকম চরে সৈকত পাখিতে ভরা থাকবে। কিন্তু তেমন কোনো সৈকত পাখির দেখা পেলাম না। কয়েক জোড়া জিরিয়া ও বাটানের দেখা মিলল।

পুরো চরটির চারপাশ আমরা দেখব বলে দুই দলে ভাগ হয়ে গেলাম। বালুময় চরে হাঁটতে গিয়ে প্রায় সব জায়গায় লাল কাঁকড়ার দলের ঘোরাফেরা চোখে পড়ল। তিন জাতের মাছরাঙার দেখা পেলাম। ধলাগলা মাছরাঙা আর কালাটুপি মাছরাঙা পাশাপাশি গাছে ছিল। বেশ জোরে ডাকাডাকি করছিল। মাথার ওপর দুই জাতের শিকারি পাখির ওড়াউড়ি দেখলাম। সবই পরিচিত পাখি। ধলাবুক ইগল তার মধ্যে একটি।

ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর চরের শেষ প্রান্তে গিয়ে বেশ গরম অনুভূত হলো। জোয়ার আসার সময় হয়ে গেছে। সাগরের পানিতে গা ভিজিয়ে নিলাম। বালুচরে দেখলাম বেশ কিছু সৈকত পাখি বিশ্রামের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। জোয়ারের সময় এই পাখিগুলো বিশ্রাম নেয় আর ভাটার সময় কাদাময় চরে খাবার খোঁজে। কিন্তু পুটনীর চরটি কাদাময় চর নয়। এর চারপাশে বালুচর। হয়তো এ কারণেই সৈকত পাখির সংখ্যা কম। জানুয়ারি মাসে এলে হয়তো এ চরে পরিযায়ী পাখির দেখা মিলবে।

এবার ফেরার পালা। জোয়ারের কারণে আমাদের নৌকা ভেসে অনেক দূর চলে গেছে। দুজন মাঝি নৌকায় ঘুমিয়ে পড়েছেন। ডাকাডাকিতে কোনো কাজ হবে না বুঝতে পারলাম। প্রায় এক ঘণ্টা পর তাঁদের ঘুম ভাঙল এবং বুঝতে পারলেন তাঁরা আসল জায়গায় নেই। তাঁদের ফিরে আসার আগেই চরটিকে আরও নিবিড়ভাবে দেখার সুযোগ হলো।