হেমন্তেও গরম, অক্টোবরে ৭ বছরের মধ্যে বেশি তাপমাত্রার রেকর্ড

মো. বজলুর রশীদ
ছবি: সংগৃহীত

হাফিজ উদ্দিনের (৬১) মনে হয়, প্রকৃতির অনেক কিছুই ‘উল্টোপাল্টা’ হয়ে গেছে। গত সোমবার সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের মাথায় রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে ঘামছিলেন তিনি। সকালের রোদ তখনো প্রখর হয়নি, তারপরও গায়ে ঘাম। তা মুছতে মুছতে তিনি বলছিলেন, ‘এহন কার্তিক মাস। ছোটবেলায় দেখছি, এলাকায় এ সুময় শীত পড়্যা য্যাতো। এখন তেমন হয় না। ঢাকায় আছি ১২–১৩ বছর ধইর‍্যা। এত গরম আগে দেহি নাই।’

হাফিজ উদ্দিনের বাড়ি সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে। রাজধানীতে রিকশা চালানোর আগে কৃষিকাজ করতেন। তাঁর ভাষ্য, এ বছরই শুধু নয়, ছয়–সাত বছর ধরেই অক্টোবর–নভেম্বরে এমন গরম দেখতে পাচ্ছেন।

হেমন্তের এ সময়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের কোথাও কোথাও কুয়াশা আর ঠান্ডা হাওয়া বইছে। কিন্তু রাজধানীসহ অনেক এলাকায় দিনের বেলায় গরমের অস্বস্তি কাটেনি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী অক্টোবরে দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট আট দিন তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। ২০২০ সালের পর কোনো বছরের অক্টোবর মাসে এত দিন তাপপ্রবাহ ছিল না। গত অক্টোবরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে আগের সাত বছরের মধ্যে ছিল সর্বোচ্চ। বৃষ্টি হয়েছে স্বাভাবিকের তুলনায় ৬৮ শতাংশ কম। এটাও রেকর্ড।

এভাবে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ও বৃষ্টির ঘাটতির কারণে কৃষির উৎপাদনশীলতা, পানির প্রাপ্যতা, জনস্বাস্থ্য এবং প্রতিবেশব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন আবহাওয়া, কৃষি ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষকেরা। অক্টোবর মাসের গরম ও কম বৃষ্টি শুধু একটি মাসের বিচ্ছিন্ন পরিস্থিতি নয়; বরং এটি আবহাওয়ার ধারাবাহিক পরিবর্তনের একটি নমুনা বলেই মনে করছেন তাঁরা।

এবারের অক্টোবরে তাপপ্রবাহ বেশি, তাপমাত্রাও বেশি

দিনে প্রচণ্ড গরম, রাতে কিছুটা স্বস্তিদায়ক আবহাওয়া। আবহাওয়ার এমন পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়েই ঠান্ডা ও জ্বরে পড়েছেন সিলেট নগরের আম্বরখানা এলাকার নির্মাণশ্রমিক রাহুল আহমদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দুপুরের দিকে রোদে কাজ করা খুব কষ্টকর। এমন গরম তিনি গরমের মাস এপ্রিল বা মে মাসেও দেখেননি বলে জানান।

এই সিলেটে গত ২৬ অক্টোবর চলতি বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। এর আগে গত ২৮ সেপ্টেম্বর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৩৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এপ্রিল–মের প্রখর গ্রীষ্মের দিনেও এবার উত্তর–পূর্বের এ জনপদে এত গরম পড়েনি।

শুধু সিলেটে নয়, গত মাসে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক গরম পড়ে। এর মধ্যে ২৮ অক্টোবর ৩৯ জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। অক্টোবর মাসে এত এলাকাজুড়ে তাপপ্রবাহের রেকর্ড অন্তত গত সাত বছরে নেই।

এ কে এম সাইফুল ইসলাম

গত মাসে মোট আট দিন তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। এর আগে ২০২০ সালেও আট দিন তাপপ্রবাহ বয়ে গিয়েছিল। কিন্ত গড় তাপমাত্রা এবারের মতো এত বেশি ছিল না বা বৃষ্টিও এত কম হয়নি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদের ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ থেকে এ চিত্র পাওয়া গেছে। সেই পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের অক্টোবরে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এটি গত সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২০ সালের অক্টোবরে গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। ২০২৫ সালে এ তাপমাত্রা ১ দশমিক ৩, ২০২৪ সালে ১ দশমিক ২, ২০২৩ সালে ১ দশমিক ১, ২০২২ সালে ১ দশমিক ৫ এবং ২০২১ সালে ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।

আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, সাত বছরের মধ্যে অক্টোবরে এত দিন তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে দেখা যায়নি। এবারের গড় তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়েছে অক্টোবরে। এটি কয়েক দশকের মধ্যে বেশি হতে পারে।

বৃষ্টি কম, গরমের অস্বস্তি বেশি

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৬৮ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। সব বিভাগেই বৃষ্টিপাত ছিল স্বাভাবিকের নিচে। চট্টগ্রাম বিভাগে বৃষ্টির ঘাটতি ছিল সবচেয়ে বেশি—৮০ দশমিক ৬ শতাংশ। ঢাকা বিভাগে ঘাটতি ছিল ৭৯ দশমিক ৯ শতাংশ।

সাধারণত বৃষ্টি হলে বাতাস ও ভূপৃষ্ঠ কিছুটা ঠান্ডা হয়। বৃষ্টি কম হলে সেই স্বস্তি কমে যায়। এবার তা হয়নি, আর তাতেই এত গরম। অথচ গত বছর অক্টোবরে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৩ শতাংশ বেশি এবং ২০২৪ সালে স্বাভাবিকের চেয়ে ২৯ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছিল।

গত অক্টোবরে দেশের সব বিভাগে কম বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে কম হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে, ৮০ শতাংশের বেশি। ঢাকা বিভাগে কম বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ৭৯ শতাংশ।

হেমন্তে তাপপ্রবাহ কেন

এ বছর যে গরম মানুষকে হেমন্তেও ভোগাবে কিংবা শীতকালেও শীত কম পড়তে পারে, তার পূর্বাভাস ছিল বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) পূর্বাভাসে। ডব্লিউএমওর গত ৩ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেপ্টেম্বর–নভেম্বর ২০২৬ এবং ডিসেম্বর ২০২৬–ফেব্রুয়ারি ২০২৭—উভয় সময়েই এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। বছরের শেষ দিকে এটি খুব শক্তিশালী রূপ নিতে পারে।

এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরের একটি বায়ু পরিস্থিতি। এর প্রভাবে বৃষ্টি কমে যায়, উষ্ণতা বাড়ে। এবারের এল নিনো কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। এর প্রভাবে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রার নতুন রেকর্ডও তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ও উল্লেখযোগ্য বৃষ্টির ঘাটতির কারণে কৃষির উৎপাদনশীলতা, পানির প্রাপ্যতা, জনস্বাস্থ্য এবং প্রতিবেশব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এসব পরিস্থিতি বাংলাদেশে জলবায়ুর পরিবর্তনশীলতা ও চরম আবহাওয়ার প্রভাব মোকাবিলায় ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের বিষয়টিও সামনে আনছে।

কৃষিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের আশঙ্কা

মাঠে এখন রোপা আমন ধান রয়েছে। রয়েছে শীতকালীন শাকসবজি। সাধারণত আমন ধানে সেচ কম লাগে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলে আমনেও সেচের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে।

উত্তরের বরেন্দ্র এলাকার জেলা নওগাঁ। জেলাটি ধানের জন্য বিখ্যাত। এবারের আমন মৌসুমে কম বৃষ্টির জন্য এ জেলায় স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকটি সেচ বেশি লেগেছে বলে জানান জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান। তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, সেচে বেশি লাগায় কৃষকের খরচ বেড়েছে। এর কিছুটা প্রভাব ধানের দামেও পড়তে পারে।

বরেন্দ্র এলাকার চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি বৃষ্টি হয় যমুনাপারের জেলা সিরাজগঞ্জে। সেখানে এবারের আমন চাষে পাঁচ থেকে ছয়টি সেচ বেশি লেগেছে বলে জানান জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম মনজুরে মাওলা। তিনি বলেন, গরম বেশি হওয়ায় ধান কিছু ক্ষেত্রে অপরিপক্ব হতে পারে।

এবারের কম বৃষ্টি এবং গরমের পরেও সার্বিকভাবে আমন ভালো হবে বলে আশাবাদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম। তিনি বলছিলেন, অসময়ে দিন দিন গরম বৃদ্ধি কৃষির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত একটা বাস্তবতা।

(তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন মানাউবি সিংহ, সিলেট)