ময়মনসিংহ শহরের জিরো পয়েন্ট থেকে একটি রাস্তা ডান দিকে সোজা চলে গেছে পশ্চিমে। এ রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলেই ব্রহ্মপুত্র নদের কাছারিঘাট। ঘাটমুখী পথের দুই ধারে সারি সারি চায়ের দোকান। এই পথের ধারেই রয়েছে একটি নার্সারি। প্রতিদিন সকালে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে হাঁটতে গেলে ফেরার পথে প্রতিদিনই ঢুঁ মারি এই নার্সারিতে। দেখি, নতুন কোনো উদ্ভিদ এল কি না বা কোনো উদ্ভিদে ফুল ফুটল কি না।
এ মাসের শুরুর দিকে নার্সারিতে ঢুকে চোখ পড়ল কড়িফুলের মতো ফুটে থাকা গুল্মজাতীয় এক উদ্ভিদের দিকে। গায়ে সাদা সাদা তারা বা তুষার কণার মতো ফুল। দেখতে সিঙ্গেল টগর বা কড়িফুলের মতো। ভালো করে দেখে বুঝতে পারলাম এটি আর্কটিক স্নো বা উইন্টার হোয়াইট চেরি ফুল। এ ফুল কুটজা, শ্বেতদূতী, অম্বিকা, ভুটান জুঁই ইত্যাদি নামে পরিচিত।
‘কুটজা’ শব্দটি সংস্কৃত। এর অন্য ইংরেজি নামগুলো হচ্ছে মিল্কিওয়ে, স্নো ফ্লেক, হোয়াইট অ্যাঞ্জেল ইত্যাদি। উদ্ভিদটির আদি নিবাস শ্রীলঙ্কা। তাই এটি শ্রীলঙ্কান জেসমিন নামেও পরিচিত। যদিও জেসমিন বা জুঁইয়ের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। দুটি ফুল আলাদা গোত্রের।
উদ্ভিদটির বৈজ্ঞানিক নাম রাইটিয়া অ্যান্টিডিসেনটারিকা। এটি অ্যাপোসাইনেসি পরিবারের একটি উদ্ভিদ। টগর ও করবীও একই গোত্রের উদ্ভিদ। স্কটিশ চিকিৎসক ও উদ্ভিদবিদ উইলিয়াম রাইটের (১৭৩৫-১৮১৯) নামানুসারে উদ্ভিদটির গণের নাম রাইটিয়া হয়েছে। এই উদ্ভিদবিদ বহু বছর ধরে জ্যামাইকায় কাজ করেছেন। শত শত স্থানীয় উদ্ভিদকে শ্রেণিবিন্যস্ত করেছেন তিনি।
কুটজা একটি বহুবর্ষজীবী শোভাময় আধা-পর্ণমোচী ছোট গুল্ম। এটি দেড় মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। বয়স বেড়ে গেলে এই উদ্ভিদের শাখা হয়ে যায় চকলেট বাদামি রঙের। এটি সারা বছর ধরে অবিরাম ফোটে। পাতাগুলো উপবৃত্তাকার, চকচকে ও গাঢ় সবুজ। পাতা দেড় থেকে ছয় সেন্টিমিটার লম্বা। প্রস্থে দেড় থেকে আড়াই সেন্টিমিটার। ফুল সুগন্ধি, সাদা ও নলাকার। পাপড়ি পাঁচটি। ফুলের ব্যাস আড়াই থেকে সাড়ে তিন সেন্টিমিটার। কেন্দ্রে হলুদ রঙের পুংকেশর থাকে। দলনল খুবই সরু, যা দুই থেকে আড়াই সেন্টিমিটার লম্বা। ফুল জন্মায় শাখা ও প্রশাখার প্রান্তে। থাকে ফলিকল। এক প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট গর্ভাশয়যুক্ত যে ফল পরিপক্ব হওয়ার পর সংযোগস্থল বরাবর ফেটে যায়, তাকে ফলিকল বলে।
কুটজার ভেষজগুণও রয়েছে। এই গাছের বাকলে রয়েছে জীবাণু ও প্রদাহবিরোধী গুণাগুণ। এর বাকল থেকে নিষ্কাশিত রস মুখের ঘায়ের জন্য ব্যবহার করা হয়। ত্বকের প্রদাহজনিত বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় এর পাতা।
গাছটি লম্বা হয়ে গেলে হালকা ছাঁটাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। যদি বেশি ছাঁটাইয়ের প্রয়োজন হয়, তাহলে বসন্তের শুরুতে তা করা উচিত। এটাই উপযুক্ত সময় ছাঁটাইয়ের।
মহাকবি কালিদাসের মেঘদূত কাব্যে কুটজা ফুলের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেখানে বিরহী যক্ষ কুটজা ফুল উপঢৌকন দিয়ে মেঘের কাছ থেকে প্রিয়ার খোঁজ জানতে চেয়েছেন।
চয়ন বিকাশ ভদ্র, অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ