প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খুব নিবিড়। তারপরও চোখের সামনে থাকা কত গাছের নাম আমরা জানি না, চিনি না সেসব গাছের ফুল-ফল, জানি না সেগুলোর উপকারের কথাও। অথচ সেই গাছই হয়তো কোনো পাখির আশ্রয়, কোনো পতঙ্গের খাদ্য, মাটির রক্ষাকবচ কিংবা মানুষের লোকজ চিকিৎসার দীর্ঘদিনের সঙ্গী।
কুকুরচিতা তেমনই এক অবহেলিত বৃক্ষ। দেখতে খুব সাধারণ, পথের ধারে কিংবা ঝোপঝাড়ের মধ্যে অনায়াসে বেড়ে ওঠে। কিন্তু এই গাছেরও আছে নিজস্ব সৌন্দর্য, বৈশিষ্ট্য ও দীর্ঘ লোকজ ঐতিহ্য। বাংলাদেশে অঞ্চলভেদে এই গাছ মেন্দা, মেদা, খারাজোড়া, পিপুলটি কিংবা কারজুকিগাছ নামেও পরিচিত।
চলতি বছরের ২৪ জুন গিয়েছিলাম নরসিংদী সরকারি কলেজে। সেখানকার উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ যে ভবনে, তার সামনেই পেয়ে গেলাম কুকুরচিতার দেখা। গাছে ছোট ছোট গোলাকার ও সবুজ ফল ধরে আছে। ছবি তুলে ফেললাম ঝটপট। এর আগে গত ১০ এপ্রিল ময়মনসিংহ শহরের ব্রহ্মপুত্রতীরের কাছারিঘাট মসজিদের পেছনে একটি কুকুরচিতা গাছে ফুলের দেখা পেয়েছিলাম।
কুকুরচিতার বৈজ্ঞানিক নাম Litsea glutinosa। এই উদ্ভিদের প্রাকৃতিক বিস্তৃতি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। বাংলাদেশও এর স্বাভাবিক বিস্তৃতির অন্তর্ভুক্ত।
কুকুরচিতা মাঝারি আকৃতির একটি চিরসবুজ বৃক্ষ। এটি সাধারণত ৮ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। গাছের কাণ্ড সোজা এবং এর ছাল বা বাকল ধূসর ও সামান্য খসখসে হয়। এর পাতাগুলো সরল, একান্তর ও ডিম্বাকার বা বল্লমাকার। পাতার ওপরের অংশ মসৃণ ও গাঢ় সবুজ, তবে নিচের অংশ কিছুটা হালকা সবুজ এবং কচি পাতায় সূক্ষ্ম রোম দেখা যায়। পাতার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো হাত দিয়ে ডললে একধরনের আঠালো ও সুগন্ধি রস বের হয়। এই গাছের পাতা ও ছালে প্রচুর পরিমাণে মিউসিলেজ বা আঠালো পদার্থ থাকে, যা এটি চেনার একটি প্রধান উপায়।
সাধারণত গ্রীষ্মের শেষ ভাগে ও বর্ষার শুরুতে (মে থেকে জুলাই মাস) কুকুরচিতাগাছে ফুল ফোটে। ফুল আকারে বেশ ছোট ও হালকা হলুদ বা সাদাটে-সবুজ রঙের হয়। এগুলো পাতার কক্ষে গুচ্ছাকারে বা ছত্রমঞ্জুরিতে ফোটে। ফুলগুলো মৃদু সুগন্ধযুক্ত এবং মৌমাছি ও ছোট ছোট পতঙ্গকে আকৃষ্ট করে।
বর্ষার শেষের দিকে ফুল থেকে ফল ধরা শুরু হয়। ফলগুলো ছোট, গোলাকার এবং কাঁচা অবস্থায় সবুজ থাকে। শরৎ বা হেমন্তকালে ফল যখন পাকে, তখন তা টকটকে লাল বা কালচে-বেগুনি রং ধারণ করে। এই ফলগুলো বনের পাখি ও কাঠবিড়ালির অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য। ফলের ভেতরে একটি শক্ত বীজ থাকে, যার মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবেই এর বংশবিস্তার ঘটে।
লোকজ ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় কুকুরচিতার পাতা ও ছাল বহুল ব্যবহৃত। শরীরের কোনো স্থান কেটে গেলে এর পাতার রস রক্তপাত বন্ধে সাহায্য করে। ডায়রিয়া, আমাশয়, বদহজম ও পেটব্যথার চিকিৎসায় এর বাকল বা ছালের রস বেশ কার্যকর।
কুকুরচিতার পাতা বা ছাল বেটে প্রলেপ দিলে ফোড়া দ্রুত পেকে যায় এবং ক্ষতস্থান তাড়াতাড়ি শুকায়। মচকানো বা আঘাতপ্রাপ্ত স্থানেও এর পাতার পেস্ট ব্যবহার করা হয়। এর ফল থেকে একধরনের সুগন্ধি তেল পাওয়া যায়, যা বাতের ব্যথা ও বাত উপশমে মালিশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জন্ডিস ও প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া উপশমের জন্য কিছু অঞ্চলে চিনির সঙ্গে কুকুরচিতা পাতার রস মিশিয়ে খাওয়ার চল আছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই উদ্ভিদে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি (প্রদাহরোধী) ও অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান রয়েছে। এই গাছের ছাল ও পাতায় থাকা আঠালো উপাদানের কারণে গ্রামীণ এলাকায় এটি দিয়ে ধূপ বা আগরবাতি তৈরির মণ্ড প্রস্তুত করা হয়। ছাল গুঁড়া করে একসময় মসলা বা অন্যান্য আঠালো কাজে ব্যবহারের প্রচলন ছিল। মাটির ক্ষয়রোধ ও বনে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এই গাছ সাহায্য করে। এর ঘন পাতা পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় দেয় এবং এর ফল বন্য প্রাণীদের খাদ্যের জোগান দেয়।
কুকুরচিতা আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোকজ চিকিৎসার একটি বড় অংশ। আধুনিকায়ন ও বন উজাড় হওয়ার কারণে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এই মূল্যবান ঔষধি গাছটি আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। আমাদের চারপাশের এই প্রাকৃতিক সম্পদকে টিকিয়ে রাখতে এবং এর ঔষধি গুণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে কুকুরচিতাগাছ সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
* চয়ন বিকাশ ভদ্র: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি কলেজ, ময়মনসিংহ