
উদ্ভিদচর্চায় আমার অভিষেকের সময়ে প্রথম চিনেছি ঝুল দেবদারু। নিসর্গী বিপ্রদাশ বড়ুয়া প্রজাতিটির নাম রেখেছেন ‘ক্রন্দসী দেবদারু’। গাছটি দেখে কখনো স্বস্তি অনুভব করিনি। কারণ, গাছগুলোকে কখনো সোজাসাপটা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখিনি। মূল কাণ্ডটাই হেলেদুলে পড়ছে অন্য গাছের ওপর বা কোনো ব্যস্ততম সড়কে।
তবু মানুষ নির্বিকার। যত্রতত্র রোপণ করছে গাছটি। নেই পরিচর্যার বালাই। আসলে পরিচর্যার সুযোগ না থাকলে এই গাছ রোপণ করা সমীচীন নয়। প্রতিবছরই মাথা মুড়িয়ে সোজা রাখার কসরত করতে হবে। সৌন্দর্য বাড়াতে এটি বিভিন্ন সড়কদ্বীপে প্রচুর পরিমাণে রোপণ করা হলেও আদতে গাছটি খুব একটা বড় হয় না।
ঝুল দেবদারু আমাদের দেশে এসেছে কয়েক দশক আগে। অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মার শ্যামলী নিসর্গ বইয়ের ভূমিকা থেকে এ বিষয়ে সূত্রও পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, ‘এভাবেই আমরা খুঁজে পাই ঢাকার একমাত্র তমালগাছটি জয়কালী মন্দিরে, ঝুল–দেবদারু পুরোনো বিমানবন্দরের উল্টো দিকের এক বাগানবাড়িতে।’ এই তথ্য আশির দশকের। এর বাইরেও যে দেশে আরেক প্রকার দেবদারু আছে, সেটা জানা হলো আরও বেশ পরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মোটা কাণ্ডের উঁচু আকৃতির কিছু গাছ দেখে খানিকটা দ্বিধায় পড়ি। বইপুস্তক দেখে নিশ্চিত হই এই দেবদারু আমাদের চারপাশে অনেক আগে থেকেই জন্মে। গড়নের দিক থেকেও রাজসিক। একসময় পরিকল্পিত সড়কগুলোয় পথতরু হিসেবেও রোপণ করা হয়েছিল।
আমাদের দেশে যে কটি রাজসিক গড়নের গাছ দেখা যায়, তার মধ্যে দেবদারু অন্যতম। খাড়া এবং দীর্ঘ কাণ্ড, পরিমিত ডালপালা এবং শৈল্পিক গড়নের পাতা এ গাছের মূল আকর্ষণ। এসব কারণেই দেবদারু অনেক দূর থেকে আলাদা করে চেনা যায়। শহরের কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা বা গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে এ গাছ বেশ মানানসই। কারণ, গাছটির অঙ্গসৌষ্ঠব ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। স্নিগ্ধশোভার এই গাছটির সৌন্দর্য প্রশ্নাতীত।
শ্যামলী নিসর্গ বইয়ে দ্বিজেন শর্মা আমাদের এ কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘দেহের সৌষ্ঠবে দেবদারুর শ্রী অনন্য। সরল, উন্নত, আকাশচুম্বী উদ্ধত এমন ভঙ্গির তুলনা এ দেশের তরুরাজ্যে সহজলভ্য নয়।’ রবীন্দ্রনাথও দেবদারুর প্রশংসা করেছেন অকৃপণভাবে, ‘চেয়ে চেয়ে মনে হলো, ওই একটি দেবদারুর মধ্যে যে শ্যামল শক্তির প্রকাশ, সমস্ত পর্বতের চেয়ে তা বড়ো, ঐ দেবদারুকে দেখা গেল হিমালয়ের তপস্যার সিদ্ধিরূপে। মহাকালের চরণপাতে হিমালয়ের প্রতিদিন ক্ষয় হচ্ছে, কিন্তু দেবদারুর মধ্যে যে প্রাণ, নব নব তরুদেহের মধ্যে দিয়ে যুগে যুগে তা এগিয়ে চলবে।’
আমাদের দেশে দেবদারুর কোনো বন না থাকলেও কোনো কোনো স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে দু-এক সারি গাছ চোখে পড়ে। বাংলা একাডেমির সামনে সীমানাদেয়াল লাগোয়া এক সারি দেবদারু বেশ দৃষ্টিনন্দন। দেবদারুর (Monoon longifolium) কাণ্ডের রং ধূসর, অমসৃণ ও রুক্ষ ধরনের। পাতার রং গাঢ় সবুজ, গড়নের দিক থেকে বর্শার ফলার মতো তীক্ষ্ণèএবং কিনারা কিছুটা আন্দোলিত।
শীতকালে গাছের সব পাতা ঝরে যায়। বসন্তের শুরুতে কচি পাতার ঝালর অপরূপ আলোকিত দেখায়। আর তখন কচি পাতার রং হলুদ মেশানো সবুজে আশ্চর্য উজ্জ্বল এবং প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। নতুন পাতার পরপরই গাছে ক্ষুদ্র আকৃতির সাদামাটা ধরনের সবুজাভ ফুলগুলো ফুটতে শুরু করে।
কিন্তু উজ্জ্বল পাতার ভিড়ে ফুলের সৌন্দর্য ও সুগন্ধ অনেকটাই নিষ্প্রভ হয়ে ওঠে। ছয়টি মুক্ত দলে গড়া প্রতিটি ফুল যেন একেকটি তারকা। ফুলের গর্ভকেশর মুক্ত এবং সংখ্যায় অনেক বেশি। এ কারণে পরিণত সময়ে একটি ফুল থেকে একগুচ্ছ ফল হয়। দেবদারুর পাকা ফলের রং বেগুনি-হলুদ। ফল বাদুড়ের খুব পছন্দ। রাতে ওরা ফল খাওয়ার জন্য ভিড় করে। এ গাছের কাঠ খুব বেশি মূল্যবান নয়। কাঠ থেকে সাধারণ মানের বাক্স–পেটরা, পেনসিল ইত্যাদি তৈরি করা যায়। বাকল থেকে সংগ্রহ করা যায় নিম্নমানের আঁশ।
গবেষণায় দেখা গেছে, ১ হেক্টর পরিমাণ মাঝারি বন প্রায় ১০ ডেসিবেল শব্দদূষণ প্রতিরোধ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে দেবদারু প্রজাতির গাছ কৃত্রিম শব্দ শুষে নিয়ে পরিবেশকে কোলাহলমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। তীব্র থেকে তীব্রতর শব্দও বাধা পড়ে এ গাছের পাতার ঘনত্বে। পরিবেশবিদেরা শহরাঞ্চলে শব্দদূষণ রোধে রাস্তার দুই পাশে বেশি করে এই গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
একসময় ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দেবদারু দেখা যেত। নানা কারণে এই পরিণত গাছগুলো কাটা পড়েছে। আমাদের পথতরু হিসেবে গাছটি আবার ফিরে আসুক—এই প্রত্যাশা রাখি।
মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক