শীতকাল ছোট হচ্ছে, ৭০ বছর পর কেমন হবে

কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এই শতাব্দীর শেষে শীতকাল প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে যেতে পারে।

মাঘের শীতে বাঘ পালায়, এমন একটি কথা চালু আছে। এখন মাঘ মাস চলছে। কিন্তু সেই ‘বাঘ পালানো’ শীত কোথায়? নিকট অতীতের কথা স্মরণ করে কেউ বলতেই পারেন, এই তো ডিসেম্বরের শেষ থেকে হাড়কাঁপানো শীত গেল। হ্যাঁ, শীত ছিল বটে। কিন্তু কয় দিন স্থায়ী ছিল?

না, শীত স্থায়ী হচ্ছেও না। এমনটাই মনে করেন দেশের সর্ব উত্তরের জনপদ পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা শহরের পুরাতন বাজার এলাকার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক জাহিদুল ইসলাম (৭১)। এ জনপদে শীত আগেই শুরু হয়, থাকেও দীর্ঘদিন। এখানকার হাড়কাঁপানো শীত সর্বজনবিদিত। কিন্তু এবার তেমন শীতের স্থায়িত্ব ছিল কম।

জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘একটা সময় আমরা দেখেছি আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি সময়ে শীতের আবহ শুরু হয়ে যেত। আর কনকনে শীত থাকত ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত। একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমরা গায়ে শীতের কাপড় জড়িয়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে যেতাম। পৌষ-মাঘ মাসে কুয়াশা আর শীতে ঘর থেকে বের হওয়াটাই কঠিন ছিল। কিন্তু এখন মাঘ মাসেই মনে হচ্ছে শীত চলে যেতে শুরু করেছে।’

বাংলাদেশ গরমপ্রধান দেশ। এখন গরমের ধরন বদলাচ্ছে—এটা আর শুধু কয়েক সপ্তাহের তাপপ্রবাহের গল্প নয়। গরমের ব্যাপ্তি দীর্ঘ হচ্ছে, রাতের তাপ কমছে না। আর শীত—যে ঋতু একসময় ‘কুয়াশা-শৈত্যপ্রবাহ’ হিসেবে পরিচিত ছিল, তা ক্রমেই ছোট হয়ে যাচ্ছে। এমন চলতে থাকলে শতাব্দীর শেষে শীত অনেকটাই
কমে যেতে পারে। গড়পড়তা যেখানে ৮ থেকে ১০টি শৈত্যপ্রবাহ হয়, তা হতে পারে দু–চারটি। শীতের দিনের সংখ্যা কমে যেতে পারে। কৃষি, স্বাস্থ্যসহ নানা ক্ষেত্রে এর বিরূপ প্রভাবের ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ।

নরওয়ের মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণাভিত্তিক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ‘দ্য ফিউচার ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ’ অনুযায়ী, শীতের ব্যাপ্তি কমে যাওয়ার প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। ২০৪১ থেকে ২০৭০ এবং ২০৭১ থেকে ২১০০ সাল পর্যন্ত পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে দুই বছরব্যাপী চলা এ গবেষণায়। এটি প্রকাশিত হয়েছে গত বছরের নভেম্বর মাসে।

এই গবেষণার আলোকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জলবায়ুর সবচেয়ে স্পর্শকাতর দুই দিক—তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং শীত কমে যাওয়া—বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি কোন অঞ্চলে গরম বাড়বে বেশি, কোথায় শীত সবচেয়ে দ্রুত কমবে, আর কোন জেলায় ‘শৈত্যপ্রবাহ’ প্রায় হারিয়ে যেতে পারে, সেই চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে।

একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমরা গায়ে শীতের কাপড় জড়িয়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে যেতাম। পৌষ-মাঘ মাসে কুয়াশা আর শীতে ঘর থেকে বের হওয়াটাই কঠিন ছিল। কিন্তু এখন মাঘ মাসেই মনে হচ্ছে শীত চলে যেতে শুরু করেছে।
তেঁতুলিয়ার বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম

প্রতিবেদনটিতে ভবিষ্যৎ অনুমানের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে নাসা সেন্টার ফর ক্লাইমেট সিমুলেশনের তৈরি কাপল্‌ড মডেল ইন্টারকম্পারিজন প্রোজেক্ট ফেজ–৬ (সিএমআইপি–৬) মডেল। জলবায়ু পরিবর্তন–সংক্রান্ত আন্তসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও এ মডেলটি ব্যবহৃত হয়েছে। উচ্চ রেজোল্যুশনের তথ্য–উপাত্তকে সুবিধার জন্য কম রেজোল্যুশন বা ছোট স্কেলে ব্যবহার করা হয়েছে। বৈশ্বিক প্রতিবেদনের তথ্য বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। জলবায়ুর স্বাভাবিক ওঠানামা (এল নিনো, প্রাকৃতিক পরিবর্তন ইত্যাদি) ৩০ বছরের ব্যবধানে বিশ্লেষণ করা হয়। তাই প্রতিবেদনে তিনটি সময়খণ্ড ধরা হয়েছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ১৯৮৫–২০১৪, মধ্যশতাব্দী: ২০৪১–২০৭০ এবং শতাব্দীর শেষ: ২০৭১–২১০০।

ভবিষ্যতে শীতকালের ব্যাপ্তি কমে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রবিশস্য। ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করছেন কৃষক। মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর

কেন এই গবেষণা

মো. বজলুর রশীদ, গবেষক

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ দেশি–বিদেশি ছয় গবেষকের এ গবেষণায় নেতৃত্ব দেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আবহাওয়া অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আমরা গত প্রায় অর্ধশতাব্দী আগের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণার কাজ করছিলাম। এর আগে আমরা বাংলাদেশের তাপপ্রবাহের বিষয়টি দেখেছি এবং আগামী দিনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি তুলে ধরেছি। তখনই আমরা শীত কমে আসার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করি। অতীতের এসব উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে আমরা বিভিন্ন মডেল ধরে এ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এটা নীতিনির্ধারকদের একটা গুরুত্বপূর্ণ দলিল হতে পারে। কার্বন নিঃসরণ পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তবে বাংলাদেশের শীত ঋতু সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। এর প্রভাব ভীতিকর ও সুদূরপ্রসারী।’

শীত শেষ হয়ে আসছে। তাই অনেকেই তুলে রাখছেন গরম কাপড়

চার ধরনের পরিস্থিতি

প্রতিবেদনে ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিস্থিতি বা শীতের কমা–বাড়ার হিসাব করতে একাধিক নিঃসরণ-পরিস্থিতি ধরা হয়েছে। সেগুলো হলো স্বল্প, মধ্যম, উচ্চ এবং অতি উচ্চ নিঃসরণ পরিস্থিতি।

স্বল্প নিঃসরণ পরিস্থিতি: এ ক্ষেত্রে ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরণ একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এমন পরিস্থিতি হলে শতাব্দীর শেষে বৈশ্বিক উষ্ণতা হতে পারে ১ দশমিক ০ থেকে ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। এতে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে সীমিত রাখার লক্ষ্য পূরণ হলেও ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির লক্ষ্য অর্জিত হবে না।

মধ্যম নিঃসরণ পরিস্থিতি: এই পথে চললে শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ২ দশমিক ১ থেকে ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।

উচ্চ নিঃসরণ পরিস্থিতি: এ ক্ষেত্রে ২১০০ সালের মধ্যে কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরণ প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বাড়তে পারে ২ দশমিক ৮ থেকে ৪ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত।

অতি উচ্চ নিরঃসরণ পরিস্থিতি: এটিকে চরম নিঃসরণ পরিস্থিতি হিসেবে ধরা হয়। এ পরিস্থিতিতে ২১০০ সালের মধ্যে কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরণ তিন গুণে পৌঁছাতে পারে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যেতে পারে ৩ দশমিক ৩ থেকে ৫ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত।

এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত নরওয়েজিয়ান মেটোওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটের গবেষক হান্স ওলাভ হাইজেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘চারটি স্তরের মধ্যে উচ্চ নিঃসরণের ধারণাটিকেই আমরা বাস্তবসম্মত বলে মনে করি। কারণ, ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্য হয়ে যাবে, এটা প্রায় অসম্ভব। আবার এটি চরম মাত্রায় পৌঁছাবে, সেটাও এখন পর্যন্ত বলা যায় না।’

বাংলাদেশে ঋতুচক্র ও বর্তমান অঞ্চলভিত্তিক উষ্ণতার মানচিত্র

বাংলাদেশের জলবায়ুকে গবেষণায় চারটি ঋতুতে ভাগ করা হয়েছে: প্রাক্-বর্ষা (মার্চ–মে), বর্ষা (জুন–সেপ্টেম্বর), পর-বর্ষা (অক্টোবর–নভেম্বর) এবং শীত (ডিসেম্বর–ফেব্রুয়ারি)। রেফারেন্স সময় (১৯৮৫–২০১৪) ধরে দেখা যায়—প্রাক্-বর্ষায় এপ্রিল–মে মাস দেশের সবচেয়ে গরমকাল। এ সময়ে দৈনিক গড় তাপমাত্রা অঞ্চলভেদে প্রায় ২৫ থেকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়। দৈনিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা গড়ে ২৯ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠে। সর্বোচ্চ তাপ দেখা যায় দেশের উত্তর-পশ্চিম এবং দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে।

ন্যূনতম (রাতের) তাপমাত্রার তুলনা করলে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়—দক্ষিণে তুলনামূলক উষ্ণ, উত্তরে তুলনামূলক শীতল। দিনে পশ্চিমে তীব্র গরম, রাতে দক্ষিণে বেশি উষ্ণ—দুটি মিলিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমে সামগ্রিক ‘হিট লোড’ বেশি। এই প্রাথমিক মানচিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভবিষ্যৎ পরিবর্তন ‘সব জায়গায় একই’ হবে না। একই দেশে অঞ্চলভেদে প্রভাব ভিন্ন হবে।

প্রতিবেদনটির অন্যতম প্রধান বার্তা—বাংলাদেশে সব ঋতুতেই উষ্ণতা বাড়বে। উচ্চ নিঃসরণ পরিস্থিতি ধরে যে চিত্র পাওয়া যায়, তা হলো— মধ্যশতাব্দীতে (২০৪১–২০৭০) দৈনিক গড় তাপমাত্রা প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। শতাব্দীর শেষে (২০৭১–২১০০) এই বৃদ্ধি ঋতু ও অঞ্চলভেদে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

বর্ষা: উষ্ণতা বাড়বে, কিন্তু তুলনামূলক কম

এ গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্ষায় উষ্ণতা বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম। তবে বর্ষার বড় ঝুঁকি তাপমাত্রা নয়—আর্দ্রতার সঙ্গে যুক্ত ‘উষ্ণ রাত’। এ অবস্থায় ঘাম শুকায় না, শরীর ঠান্ডা হতে পারে না। এ ধরনের আবহাওয়ায় ‘হিট স্ট্রেস’ বাড়বে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যশতাব্দীতে সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণতা বৃদ্ধি হতে পারে। মধ্যশতাব্দীতে বর্ষা–পরবর্তী সময়ে দৈনিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি—প্রায় ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। যেটা একসময় আরাম ও স্বস্তির মৌসুম হিসেবে ধরা হতো, তা ভবিষ্যতে ‘নতুন গরমের শুরু’ হয়ে উঠতে পারে।

শীত: শতাব্দীর শেষে সবচেয়ে বড় ধাক্কা

সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তন আসতে পারে শীতে। শতাব্দীর শেষে শীতকালে দৈনিক গড় তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত
বাড়তে পারে। অর্থাৎ, শীতই হবে উষ্ণতার সবচেয়ে বড় শিকার।

বাংলাদেশে সাধারণত টানা তিন দিন বা তার বেশি সময় ধরে দৈনিক সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে তাকে শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর শৈত্যপ্রবাহকে তিনটি স্তরে ভাগ করেছে—মৃদু (৮–১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস), মাঝারি (৬–৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ও তীব্র (৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে)। এ ধরনের নিম্ন তাপমাত্রা কেবল শীত মৌসুমেই দেখা যায়।

এই গবেষণায় শৈত্যপ্রবাহ নিরূপণে একটি সরল সূচক ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট একক দিনের শৈত্যপ্রবাহ পরিস্থিতি গণনা করা হয়েছে। টানা কয়েক দিনের হিসাব ধরলেও গবেষণার সামগ্রিক সিদ্ধান্ত বা জলবায়ু প্রবণতায় বড় কোনো পার্থক্য হতো না।

বাংলাদেশে প্রতি শীতে গড়ে আট দিন শৈত্যপ্রবাহ পরিস্থিতি (দৈনিক সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে) দেখা গেছে। এর মধ্যে পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর–পূর্বাঞ্চলে প্রতি মৌসুমে ১০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত শৈত্যপ্রবাহ হয়েছে, যা এসব অঞ্চলের তুলনামূলকভাবে শীতল শীতকালীন জলবায়ুর প্রতিফলন। অন্যদিকে দেশের বাকি অংশে শৈত্যপ্রবাহের দিন তুলনামূলকভাবে কম—সাধারণত প্রতি মৌসুমে ০ থেকে ১০ দিন।

কনকনে ঠান্ডা থেকে বাঁচতে কাগজে আগুন জ্বালিয়ে উত্তাপ নেওয়ার চেষ্টা করছে শিশুরা। নূরনগর, খুলনা, ৪ জানুয়ারি

শৈত্যপ্রবাহের দিনের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি রেকর্ড করা হয়েছে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায়। এতে শীতকালে এসব এলাকাকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। শৈত্যপ্রবাহের এই আঞ্চলিক পার্থক্যের পেছনে ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে স্বাস্থ্য ও জীবিকাজনিত ঝুঁকি কমাতে এসব এলাকায় স্থানভিত্তিক প্রস্তুতি ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয় গবেষণায়।

ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, মধ্যশতাব্দীতেই (২০৪১–২০৭০) শৈত্যপ্রবাহের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে, আর শতাব্দীর শেষভাগে তা প্রায় বিরল হয়ে উঠতে পারে। উচ্চ নিঃসরণ পরিস্থিতিতে মধ্যশতাব্দীতে শৈত্যপ্রবাহের দিন নেমে আসতে পারে প্রতি মৌসুমে ২ দিনে, আর শতাব্দীর শেষে তা আরও কমে এক দিনেরও কম হতে পারে।

সব ধরনের নিঃসরণ পরিস্থিতিতেই একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। স্বল্প নিঃসরণ পরিস্থিতিতে শৈত্যপ্রবাহের দিন কমে আসতে পারে প্রতি শীতে ০ থেকে ১০ দিনে। আর অতি উচ্চ নিঃসরণ পরিস্থিতিতে শতাব্দীর শেষে শৈত্যপ্রবাহ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—বছরে মাত্র ০ থেকে ২ দিন শৈত্যপ্রবাহ দেখা যেতে পারে।

প্রতিবেদন বলছে, উষ্ণতা বৃদ্ধির ধারা মোটামুটি সারা দেশে দেখা গেলেও পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে বেশির ভাগ ঋতু ও বেশির ভাগ পরিস্থিতিতে সামান্য বেশি উষ্ণতা বৃদ্ধি দেখা যায়। অর্থাৎ, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ঝুঁকির ‘হটস্পট’ শুধু পশ্চিম নয়—উত্তর–পূর্বাঞ্চলও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

প্রতিবেদনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—রাতের তাপমাত্রা দিনের তাপমাত্রার তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। এটি শুধু ‘উষ্ণতা’ নয়, মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বড় সতর্কতা। কারণ, মানুষ ও প্রকৃতি—দুটোই রাতে কিছুটা ‘ঠান্ডা’ হয়ে শরীর পুনর্জীবিত করে। রাতে গরম থাকলে শরীরের তাপ কমে না। ফলে ঘুম নষ্ট হয়ে হৃদ্‌রোগ ও শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ে। বাংলাদেশে এ ঝুঁকি বেশি, কারণ উচ্চ আর্দ্রতা এবং নগরে ঘনবসতি এলাকায় তাপ ‘আটকে’ থাকে।

নরওয়েজিয়ান মেটেওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের করা ‘চেঞ্জিং ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ’ নামক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯৮১ সালে নভেম্বর মাসেই রংপুরে শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিয়েছিল। ২০০৬ সালের আগে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই শৈত্যপ্রবাহ শুরু হতো। কিন্তু এরপর থেকে তা কমেছে। অর্থাৎ আগে নভেম্বর থেকেই শীতের শুরু হয়ে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হলেও এখন ব্যাপ্তি কমে এসেছে।

এ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত গবেষক আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, শৈত্যপ্রবাহের সংখ্যা দিয়েই শীতের প্রকোপ বোঝা যায়। আগে কয়েক মাস ধরে নির্দিষ্ট বিরতিতে শৈত্যপ্রবাহ হলেও এখন তার ব্যাপ্তি কমে এসেছে। ফলে শীতের ব্যাপ্তিও কমে যাচ্ছে।

নরওয়েজিয়ান মেটেওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের করা ‘চেঞ্জিং ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ’ নামক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯৮১ সালে নভেম্বর মাসেই রংপুরে শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিয়েছিল। ২০০৬ সালের আগে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই শৈত্যপ্রবাহ শুরু হতো। কিন্তু এরপর থেকে তা কমেছে।

শুধু ঢাকা নয়, অধিকাংশ বিভাগই তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে

প্রতিবেদনটি তাপপ্রবাহ নিয়ে আলাদা বিশ্লেষণ করেছে। রেফারেন্স সময়ের তুলনায় ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহের ঘনত্ব, সময় ও মৌসুমি বিস্তার—সবই বাড়বে।

ঢাকায় তাপপ্রবাহ প্রধানত প্রাক্-বর্ষায় (মার্চ–মে) ঘটত, কিছুটা জুন পর্যন্ত গড়াত। কিন্তু ভবিষ্যৎ অনুমান বলছে—কম কার্বন নিঃসরণেও তাপপ্রবাহের সংখ্যা বাড়বে। মাঝারি নিঃসরণে আরও ঘন ঘন তাপপ্রবাহ হবে, যা বছরজুড়ে বিস্তার লাভ করতে পারে। উচ্চ ও অত্যধিক নিঃসরণ পরিস্থিতিতে চিত্র আরও উদ্বেগজনক; তাপপ্রবাহ বর্ষা ও বর্ষা–পরবর্তী সময়েও বাড়বে। আশঙ্কার কথা হলো প্রতিবেদনে শীতের মাস (ডিসেম্বর–ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত তাপপ্রবাহের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে—যা মৌসুমি ‘স্বাভাবিকতা’ ভেঙে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

হান্স ওলাভ হাইজেন, গবেষক

নরওয়েজিয়ান মেটেওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটের গবেষক হান্স ওলাভ হাইজেন বলেন, তাপমাত্রা যদি এভাবে বাড়তে থাকে, তবে ঢাকা থেকে এ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে শীত দুর্লভ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এখানে কিছু ‘যদি’ অবশ্যই আছে। যদি এখনো উন্নত নগর–পরিকল্পনা করা হয়, সবুজের আচ্ছাদন বাড়ানো যায়, জলাশয়গুলো উদ্ধার করা হয়, তবে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। পুরো বিষয়টিই আসলে নির্ভর করছে আগামী দিনে এ দেশের নীতিনির্ধারকেরা ঢাকাকে কীভাবে দেখতে চান এবং সে অনুযায়ী তাঁরা কতটুকু কী করতে পারেন, তার ওপর।

বিভাগভিত্তিক ঝুঁকি

আবহাওয়া অধিদপ্তরের গবেষণা বলছে, ঢাকা ছাড়া বাংলাদেশে বাকি সাতটি বিভাগেও একই প্রবণতা দেখা যাবে। তবে তীব্রতার পার্থক্য আছে। রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা—এই তিন বিভাগকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রাখা হয়েছে। মাঝারি থেকে উচ্চ নিঃসরণে এখানে তাপপ্রবাহের সংখ্যা ও স্থায়িত্ব সবচেয়ে বেশি বাড়তে পারে। বরিশাল ও চট্টগ্রামে এখন তুলনামূলক কম তাপপ্রবাহ থাকে। সমুদ্র ও স্থলের পারস্পরিক প্রভাব এ অঞ্চলগুলোর আবহাওয়াকে কিছুটা ‘মডারেট’ করেছে। কিন্তু উচ্চ নিঃসরণ পরিস্থিতিতে শতাব্দীর শেষ দিকে এই দুই বিভাগেও তাপপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। সিলেট ও ময়মনসিংহে বর্তমানে প্রাক্-বর্ষা ও বর্ষায় বেশি বৃষ্টি হওয়ায় তাপপ্রবাহ তুলনামূলক কম। তবু ভবিষ্যতে এখানে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়বে—অর্থাৎ, ‘কম ঝুঁকির অঞ্চল’ বলে আর স্বস্তি নেওয়া যাবে না।

প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। মশারি টানিয়ে চলছে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা। বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে

কৃষির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

শীত কমে গেলে সবার আগে আঘাত আসতে পারে শীতকালীন ফসলের ওপর। গম, আলু, শর্ষে, বিভিন্ন শাকসবজি—এগুলো নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সবচেয়ে ভালো হয়। শীতকালের ব্যাপ্তি কম দিন হলে ফলনের সময়সূচি বদলাতে পারে। রোগ ও পোকার আক্রমণ এবং সেচব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়তে পারে বলে এ গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা—এই তিন বিভাগকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রাখা হয়েছে। মাঝারি থেকে উচ্চ নিঃসরণে এখানে তাপপ্রবাহের সংখ্যা ও স্থায়িত্ব সবচেয়ে বেশি বাড়তে পারে। বরিশাল ও চট্টগ্রামে এখন তুলনামূলক কম তাপপ্রবাহ থাকে।

বাড়তি তাপের প্রভাব ইতিমধ্যে পড়তে শুরু করেছে, বিশেষ করে শীতকালীন ফসলের ওপর। গমের আবাদে শীত বেশি দরকার পড়ে। কৃষিবিদদের মতে, অন্তত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চাই মোটামুটি ঠান্ডা আবহাওয়া। কিন্তু এখন জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকেই শীত উধাও হয়ে যাচ্ছে অনেক এলাকা থেকে।

আত্রাই নদে জেগে ওঠা চক গোপাল চরের গমখেত। দিনাজপুর সদর উপজেলার বনতাড়া চক গোপাল এলাকায়

বাংলাদেশ গম গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মো. মাহফুজ বাজ্জাজ প্রথম আলোকে বলেন, গমের ক্ষেত্রে দিনের বেলা তাপ বেশি থাকলে সমস্যা নেই। সমস্যা হয় যদি রাতে তাপ বেড়ে যায়। দিনে তাপের মাধ্যমে উদ্ভিদ তার খাদ্য গ্রহণ করে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কিন্তু রাতে সেই সঞ্চিত খাবারই তাকে ভেঙে খেতে হয়। তখন যদি তাপ বেড়ে যায়, তাহলে সেই সঞ্চিত খাবারের ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে যায়। শস্যের দানা বৃদ্ধির সময় দীর্ঘায়িত হয়।

এমনটা ইতিমধ্যে ঘটছে এবং ভবিষ্যতে তা বাড়তে পারে। এসব বিষয় মাথায় রেখে এখন থেকে তাপসহনশীল গমের প্রজাতি তৈরির দিকে নজর দিচ্ছে গম গবেষণা ইনস্টিটিউট। মহাপরিচালক মাহফুজ বাজ্জাজ বলেন, ‘এখন আমাদের গবেষণার একটি বড় অংশজুড়েই আছে তাপের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকবে এমন প্রজাতির উদ্ভাবন। বারি–৩০ থেকে বারি–৩২ পর্যন্ত একাধিক জাত এমন তাপসহনশীল। এটা আমরা এখনকার তাপ মোকাবিলায় তৈরি করেছি। কিন্তু আবহাওয়া অধিদপ্তর যেভাবে ভবিষ্যতের তাপ পরিস্থিতির বৃদ্ধির কথা বলছে, তাতে করে আমাদের গমের আবাদ ভয়ানক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।’

ইতিমধ্যেই গমের আবাদে প্রভাব ফেলছে আবহাওয়া। দিনাজপুরের বিরল উপজেলার মঙ্গলপুর এলাকার কৃষক ইয়ারুল ইসলাম জানান, একসময় প্রতিবছর গম আবাদ করতেন। কিন্তু এখন তাপমাত্রা একটা সমস্যা তৈরি করছে। এর ওপর আবার ভুট্টা এসেছে। শীত কমলে ভুট্টায় ক্ষতির আশঙ্কা কম থাকে। গমে ঝুঁকি বেশি।

‘ক্লাইমেট চেঞ্জ ইফেক্টস অন ফিশারিস অ্যান্ড ক্রপ প্রোডাকশন ইন বাংলাদেশ: অ্যান ইকনোমেট্রিক অ্যানালাইসিস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে কৃষির ওপর তাপমাত্রার প্রভাবের ফলে ঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৩ সালে সাউথ এশিয়ান জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচার সাময়িকীতে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়, সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্টভাবে নেতিবাচক। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত গরমের কারণে ফসল ও মাছের ওপর তাপজনিত চাপ সৃষ্টি হয়, পানির সংকট বাড়ায়, রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বৃদ্ধি করে এবং ফলন কমিয়ে দেয়। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, গমের ক্ষেত্রে অন্তত ৬০ দিন ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রা প্রয়োজন; কিন্তু গড়ে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়লে এই শীতল সময় কমে গিয়ে শস্যে বন্ধ্যত্বের ঝুঁকি তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৯ থেকে ২০২০ সময়ে জলবায়ুজনিত দুর্যোগে কৃষি ফসল খাতে মোট ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫৮ হজার ৪৬৬ কোটি টাকা, আর মৎস্য খাতে প্রায় ৭ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ব্রহ্মখোলা গ্রামের এস এম ইদ্রিস আলীর ধ্যানজ্ঞান কৃষি। চার দশকের বেশি সময় ধরে কৃষির সঙ্গে যুক্ত তিনি। ড্রাগন ফল, কমলাসহ নানা বিদেশি ফলের চাষাবাদ করেন। তিনি বলেন, ‘দুই দশক আগের সঙ্গে এখন মিল খুঁজে পাই না। বিদেশি ফল বা ফসলের নানা হাইব্রিড জাতের কারণে হয়তো সাময়িকভাবে শীত কমে যাওয়ার প্রভাব তত বেশি দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু জাম্বুরা ও লেবুজাতীয় ফলের ফুল আসা দীর্ঘায়িত হচ্ছে—এটা অভিজ্ঞতা থেকে দেখছি।’

মশাবাহিত রোগের যে সিজনাল প্যাটার্ন আছে, তা নষ্ট হয়ে সারা বছরই বিস্তৃত হয়ে যেতে পারে। এর বাইরেও অন্য রোগ যেমন ইয়েলো ফিভার, জিকা ভাইরাস, ওয়েস্টনাইল ভাইরাস ইত্যাদি বাংলাদেশে বিস্তৃত হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের কেইল ইউনিভার্সিটির মশাবাহিত রোগের গবেষক ও বাংলাদেশি বিজ্ঞানী নাজমুল হায়দার

স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব

রাতের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়লে ঘুমের ব্যাঘাত, হিট স্ট্রেস, পানিশূন্যতা, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোকের ঝুঁকি এবং কিডনি সমস্যার চাপ বাড়তে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। গরমে শ্রমক্ষমতা কমে। বিশেষ করে নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, পরিবহন খাতের শ্রমিকের মতো যাঁদের কাজ খোলা আকাশের নিচে, তাঁরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

তবে বিভিন্ন কীটবাহিত রোগবৃদ্ধির ক্ষতি এখনই দৃশ্যমান। এর মধ্যে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি বয়ে এনেছে মশাবাহিত ডেঙ্গু। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে যে পরিমাণ মানুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করেছে, তা আগের ২৩ বছরে হয়নি। বাংলাদেশে নতুন করে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব শুরু হয় ২০২০ সালে। এখন বাংলাদেশে ডেঙ্গু প্রায় সারা বছরের রোগে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে শীতের প্রায় ৪৫ দিন সময় পাওয়া যায়, যখন মশার বংশ বিস্তৃতি করা কঠিন হয়।

শীতের দিনে কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল এক পরিচিত দৃশ্য। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এমন দিনের সংখ্যা কমছে। ঢাকার ফরাশগঞ্জ, ১৩ জানুয়ারি

শীত যদি আরও কমে আসে, তাহলে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার বংশবৃদ্ধির প্রবণতা আরও বেড়ে যাবে। ফলে সারা বছর একই রকমসংখ্যক ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ হতে পারে বলে মনে করেন যুক্তরাজ্যের কেইল ইউনিভার্সিটির মশাবাহিত রোগের গবেষক ও বাংলাদেশি বিজ্ঞানী নাজমুল হায়দার। তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া অধিদপ্তরের গবেষণাটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। গবেষণায় দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশের দৈনিক সর্বনিম্ন তাপমাত্রা গড়ে প্রায় ২ থেকে ৩ ডিগ্রি বৃদ্ধি পাবে। শীতের দিন কমে যাবে। মশাবাহিত রোগের যে সিজনাল প্যাটার্ন আছে, তা নষ্ট হয়ে সারা বছরই বিস্তৃত হয়ে যেতে পারে। এর বাইরেও অন্য রোগ যেমন ইয়েলো ফিভার, জিকা ভাইরাস, ওয়েস্টনাইল ভাইরাস ইত্যাদি বাংলাদেশে বিস্তৃত হতে পারে।’


[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোর দিনাজপুর প্রতিনিধি রাজিউল ইসলাম এবং পঞ্চগড় প্রতিনিধি রাজিউর রহমান]