সাভারে একটি নার্সারিতে শীতে ফুটেছে দিবা হাসনাহেনা ফুল
সাভারে একটি নার্সারিতে শীতে ফুটেছে দিবা হাসনাহেনা ফুল

সুরভিত দিবা হাসনাহেনা

বাহ্, উর্দু আর হিন্দিতে হাসনাহেনা ফুলটার কি উপাধিই না দেওয়া হয়েছে রাত কা রানি। কেনই–বা হবে না? এর প্রজাতিগত নাম যে Cestrum nocturnum, ইংরেজি নাম নাইট-ব্লুমিং চেস্ট্রাম। নকটারনাম মানে তো রাত। রাতে ফুল ফুটে তার সৌরভে আমোদিত করে বলেই তো এমন উপাধি। আর একটা গাছের এরূপ উপাধিও দেখলাম দিবা কা রাজা। একজন যদি রানি হয় তো আর একজন হলো রাজা। রাজার সুগন্ধ সব সময়ই রানির চেয়ে কম।

এই হাসনাহেনা ফুল দিনে ফোটে, তাই তাকে এমন উপাধি দেওয়া হয়েছে। রাতের রানির চেয়ে দিনের রাজার সুগন্ধ কম হলেও তাকে যখন সাভারের একটা নার্সারি থেকে কিনে ঘরে নিয়ে এলাম, সেটুকু সৌরভেই আমোদিত হয়ে গেলাম। দিনে এই হাসনাহেনা ফুল ফোটে বলে একে বাংলায় বলা হচ্ছে দিবা হাসনাহেনা, প্রজাতিগত নাম Cestrum diurnum–এর সঙ্গে মিল রেখে এমন নাম দেওয়া হয়েছে—ইংরেজি নাম ডে-ব্লুমিং চেস্ট্রাম। ডায়ুরনাম অর্থই দিন। এ দুই প্রজাতির হাসনাহেনাগাছই সোলানেসি গোত্রের, মানে আলু-বেগুনের ভাইবোন। কিন্তু কে তা বলবে? ওসব গাছের সঙ্গে হাসনাহেনার বিস্তর ফারাক। একটা সবজি, অন্যটা ফুলের গাছ। হাসনাহেনা ফুলগাছ এ দেশে জন্মাচ্ছে বহুকাল আগে থেকে। এ দেশের প্রাচীন আয়ুর্বেদ গ্রন্থ ও সাহিত্যগুলোতেও এ ফুলের নাম পাওয়া যায়। কিন্তু দিবা হাসনাহেনা ফুলগাছ সম্প্রতি এসেছে এ দেশে। এ গাছের জন্মভূমি ওয়েস্ট ইন্ডিজ, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশ।

দিবা হাসনাহেনা একটি চিরসবুজ কাষ্ঠল গুল্ম প্রকৃতির বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। গাছ দুই থেকে চার মিটার লম্বা হয়। গাছ বহু শাখায়িত হয়ে বেশ ঝোপাল হয়। প্রচুর পাতা বের হয়। কচি ডালে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বায়ু গ্রন্থি বা লেন্টিসেল থাকে, যেগুলো দেখতে ফুটি ফুটি বা ঘামাচির মতো দেখায়। পাতা সরল, চর্মবৎ, কিনারা মসৃণ, লম্বাটে-ডিম্বাকার, অগ্রভাগ সরু, পাতা ৫ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার লম্বা, ওপরের পিঠ সবুজ, নিচের পিঠ হালকা সবুজ। বোঁটা খাটো, প্রায় এক সেন্টিমিটার লম্বা। শাখা-প্রশাখার শীর্ষের অংশে পাতার কোল থেকে পুষ্পমঞ্জরিতে থোকায় কয়েকটি করে ফুল ফোটে। ফুলের বোঁটা লম্বা থাকায় তা দোলায়মান দেখায়। ফুল প্রায় বোঁটাহীন, প্রতিটি পুষ্পগুচ্ছকে পাতার মতো একপ্রকার বৃতি ধরে রাখে। পুষ্পনল সরু। ফুলগুলো ছোট হলেও দেখতে বেশ সুন্দর, পাপড়ি পাঁচটি খাঁজযুক্ত, সাদা ও সুমিষ্ট সুগন্ধযুক্ত। দুপুরের পর ফুলের চেহারা মলিন হতে শুরু করে, হলদেটে হয়ে যায়। এই ফুল পরাগায়নকারী অনেক পতঙ্গকে আমন্ত্রণ জানায়। আবহাওয়াভেদে ফোটা ফুল গাছে দু–এক দিন থাকে। ফুল ও ফল ধরার সময় হলো বসন্ত থেকে হেমন্ত। তবে শীতেও দেখলাম গাছে দিব্যি ফুল ফুটছে। ফুল ফোটা শেষ হলে প্রায় গ্লোবাকার ফল হয়, ফলের রং কালো। বীজ থেকে চারা হয়। শাখা কলম করেও চারা তৈরি করা যায়। ভালো বৃদ্ধি ও ফুলের জন্য রোদ দরকার।

দিবা হাসনাহেনা প্রধানত ফুলের গাছ, আলংকারিক উদ্ভিদ হিসেবে বাগানে লাগানো হয়। এর সুগন্ধি ফুলের কারণে বাড়ির বাগান, বিশেষ করে জানালার ধারের অংশের বাগানে, বারান্দায় ও ঝুলবারান্দায় টবে লাগানোর জন্য উপযুক্ত। তবে বারান্দা বা ব্যালকনিতে লাগানো গাছ মাঝেমধ্যে বের করে রোদ খাওয়াতে হবে।

দিবা হাসনাহেনাগাছের কিছু ঔষধি গুণ আছে। আদি আয়ুর্বেদিক সংস্কৃত গ্রন্থ চরক সংহিতায় এ গাছের উল্লেখ রয়েছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা জেনেছেন, দক্ষিণ ভারতে ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে আঠারো শতকে স্থানীয় লোক চিকিৎসায় এ গাছ ব্যবহার করতেন। এ গাছের কাঁচা পাতা ও তাজা ফুল প্রধানত ঔষধার্থে ব্যবহৃত হয়। কাঁচা ফুল-পাতার রস ও শুকনো অবস্থায় ফুল-পাতার গুঁড়ো ব্যবহার করা হয়। এতে রয়েছে কুমারিন, স্টেরয়ডাল সাবোনিন, গ্লাইকোঅ্যালকালয়েড, ডায়ুরনিন ইত্যাদি রাসায়নিক উপাদান; যা বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে কাজ করে। এ গাছের পাতায় ভিটামিন ডি৩ আছে বলে গবেষণায় জানা গেছে। তামিলনাড়ুতে স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে লোকসংস্কার রয়েছে যে বয়স্ক নারীরা সেখানকার গ্রীষ্মকালীন উৎসবের সময় অত্যধিক তাপ থেকে রেহাই পেতে এ ফুল খোঁপায় ও চুলের মালায় ধারণ করেন।

১৯১২ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্রিটিশ সার্জন এফ আর কিংডম এর তিতা পাতার সাহায্যে স্থানীয় ক্যারিবীয় সম্প্রদায়ের লোকদের জ্বর সারাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ত্রিনিদাদে স্থানীয় বৈদ্যরা বিছার দংশন জ্বালা ও পাচনতন্ত্রের খিঁচুনি কমাতে এ গাছ ব্যবহার করেন। গাছের কোনো কোনো অংশ বিষাক্ততা সৃষ্টি করতে পারে। সে জন্য এ গাছ ব্যবহারে সতর্ক থাকা উচিত। এ গাছের জাত উন্নয়ন ও ভেষজ গুণ নিয়ে এ দেশে গবেষণা হতে পারে। বাগানেও সম্প্রসারিত হতে পারে।

  • মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদপ্রকৃতিবিষয়ক লেখক