পিৎজার সেই অরিগ্যানোগাছ

খুলনার ডালিয়া নার্সারি থেকে সম্প্রতি তোলা অরিগ্যানোগাছের ছবি
ছবি: লেখক

পিৎজার যাঁরা প্রবল অনুরাগী, অরিগ্যানো তাঁদের না চেনার কথা নয়। পিৎজাকে যা অনন্য স্বাদু আর সুগন্ধময় করে, সেটা অরিগ্যানোগাছের শুকনো পাতার গুঁড়া। এটাই উত্তম পিৎজার জাদুকরি মসলা। বলতে গেলে যখন থেকে এ দেশে ‘পিৎজা কালচার’ শুরু হয়েছে, তখন থেকেই এ দেশে অরিগ্যানোর প্রবেশ ঘটেছে। বিভিন্ন সুপারশপে অরিগ্যানোর শুকনো পাতার ২০ গ্রাম গুঁড়া মসলা কৌটায় করে দেদার বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। বিদেশ থেকে তা আসছে, আর আমরা কিনে ব্যবহার করছি। এ দেশেও যে এর জীবন্ত গাছের দেখা মিলবে, ভাবিনি।

প্রায় কয়েক মাস হলো লালমাটিয়ায় বি ব্লকের একটা বাড়ির প্রবেশপথের দুই ধারে বেশ কটি অরিগ্যানোগাছ দেখে আসছি। গাছগুলো অযত্নে রয়েছে, তবে বেশ তাগড়া। রোজই একবার অরিগ্যানোর ফুল দেখার কৌতূহল নিয়ে ওগুলোর দিকে তাকাই। যথারীতি ব্যর্থ হই। মাঝেমধ্যে পাতার একটা টুকরা ছিঁড়ে দুই আঙুলে পিষে ঘ্রাণ শুঁকতে শুঁকতে হেঁটে যাই। পুদিনা আর তুলসীর মিলিত ঘ্রাণে ফুল না দেখার কষ্টটা ভুলে যাই। ঘ্রাণটাই বা ওদের মতো হবে না কেন?

অরিগ্যানো তো তুলসী আর পুদিনার আরেক ভাই। একই পরিবারের গাছ ওরা, পরিবার ল্যামিয়েসি। অরিগ্যানোর আরেক ইংরেজি নামের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে পুদিনার ইংরেজি নাম। এ গাছের আদি নিবাস আফ্রিকা, আরব দেশগুলোর কিছু অংশ ও ভারতবর্ষ হলেও এর অন্য ইংরেজি নাম মেক্সিকান মিন্ট, কিউবান অরিগ্যানো বা ফ্রেঞ্চ থাইম। এ গাছ প্রধানত দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপে বেশি ব্যবহার করা হয়।

প্রকৃত ইতালিয়ান অরিগ্যানো থেকে এ প্রজাতির গাছ একটু ভিন্ন, প্রজাতিও ভিন্ন। তবে ঘ্রাণে ও স্বাদে এটা ওটার চেয়ে কম নয়। এ প্রজাতির উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Coleus amboinicus। এ প্রজাতির গাছ এ দেশে ছিল না, কয়েক বছর হলো এসেছে। খুলনার ডালিয়া নার্সারির আবু মাসুদ বলেন, ‘কীভাবে কখন যে এ গাছ আমার হাতে এসে পড়ল, তা মনে করতে পারছি না। তবে তেমন যত্ন না নিয়েও দেখছি গাছগুলো আগাছার মতো বেয়াড়াভাবে বাড়ছে। তবে এর পাতা কী করে শুকাতে হয়, তা জানতে পারিনি।’

অরিগ্যানোর পাতা কোমল ও মখমলের মতো পশমি, পুরু আর নরম। ডালপালাও রোমশ, ডাল নলাকার ও হালকা সবুজ। পাতা ধূসর সবুজ। আকৃতি অনেকটা গোলাকার থেকে অবডিম্বাকার। কিনারা করাতের দাঁতের মতো খাঁজকাটা। অগ্রভাগ সুচালো। পাতা গোড়ার দিক থেকে আগার দিকে ধীরে ধীরে সরু হয়। পাতা ৫ থেকে ৭ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ৪ থেকে ৬ সেন্টিমিটার চওড়া। পাতার পিঠে থাকা সূক্ষ্ম রুপালি পশমগুলোয় আলোর ঝিলিক পড়লে চকচক করে ওঠে, দেখে মনে হয় পাতার ওপরে হালকা বরফকুচি মেখে আছে।

পাতার বোঁটা ২ থেকে ৫ সেন্টিমিটার লম্বা। গাছ ১ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। খাটো পুষ্পমঞ্জরিতে ছড়ায় ছোট ছোট হালকা বেগুনি রঙের ফুল ফোটে, অনেকটা তুলসী ফুলের মতো। বীজের দানা মসৃণ ও হালকা বাদামি। এর পাতার তেল মশা–বিতাড়ক।

তাজা পাতা প্রকৃত অরিগ্যানোর বিকল্প হিসেবে পিৎজা তৈরি এবং মাছ-মাংস রান্নায় ব্যবহার করা হয়। শোভাবর্ধক গাছ হিসেবে এখন কোনো কোনো বাড়িতে টবে লাগানো হচ্ছে। এই গাছ দ্রুতবর্ধনশীল। ডাল কেটে মাটিতে পুঁতে দিলেই নতুন গাছ জন্মে। আবার বীজ থেকেও চারা তৈরি করা যায়। বছরের যেকোনো সময় চারা লাগানো যায়। তবে বর্ষার আগে বা পরে লাগানো ভালো। গাছ রোদ পছন্দ করে।

সারা বছরই এ গাছ থেকে পাতা তুলে খাওয়া যায় বা শুকিয়ে গুঁড়া করে কৌটায় ভরে রাখা যায়। প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া যেভাবে এ দেশে বাড়ছে, তাতে বিদেশ থেকে অরিগ্যানো আমদানি না করে দেশেই এর চাষ করা যেতে পারে, খেতে বা টবে এ গাছ লাগানো যায়। সম্প্রতি এ দেশে নতুন আসা এ গাছের চাষপ্রযুক্তি ও ঔষধি গুণ নিয়ে গবেষণা করা যেতে পারে।

  • মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদপ্রকৃতিবিষয়ক লেখক