জাতীয় সংসদের আজ বুধবারের অধিবেশন
জাতীয় সংসদের আজ বুধবারের অধিবেশন

হামে মৃত্যু ও টিকার ঘাটতিতে পরিস্থিতি ভয়াবহ বললেন রুমিন, সামাল দেওয়ার কথা শোনালেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

হামে শিশুমৃত্যু, টিকার ঘাটতি, স্বাস্থ্যকর্মীদের বকেয়া বেতন নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেছেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে তৈরি হওয়া শূন্যতা, টিকা পরিবহনকারীদের ৯ মাসের বেতন বকেয়া, বিভিন্ন জেলায় জনবলসংকট ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে।

আজ বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশে রুমিন ফারহানা এ কথা বলেন। সকাল সাড়ে ১০টায় স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।

রুমিন ফারহানার নোটিশের জবাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ভ্যাকসিনের ঘাটতি ছিল ঠিকই, তবে সরকার তা সামাল দিয়েছে। মজুত এখন ‘স্থিতিশীল’ এবং জরুরি টিকাদান কর্মসূচিও শুরু হয়েছে। ৫ এপ্রিল থেকে হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে, এডিবির অব্যবহৃত ৬০৪ কোটি টাকা পুনর্বিন্যাস করে নতুন টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই সারা দেশে কর্মসূচি চালু করা হবে।

রুমিন ফারহানা বলেন, ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে হামের পুনরুত্থান বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু-এর মতে একটি জনপদে হামের মহামারি রুখতে হলে ৯৫ শতাংশের বেশি শিশুকে দুই ডোজ এমআর (হাম–রুবেলা) টিকা দিতে হয়। তিনি বলেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেই সুযোগ নিচ্ছে ভাইরাসটি। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে নতুন করে টিকার অর্ডার দেওয়া হয়নি, আর টিকা পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা গত ৯ মাস ধরে বেতন পাননি। প্রায় ৩৫টি জেলায় টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের ঘাটতি আছে।

ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতার কথা তুলে ধরে রুমিন ফারহানা বলেন, বিশ্বজুড়ে হামের সংক্রমণ ৭৯ শতাংশ বেড়েছে এবং বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে ঢাকা, আশপাশের এলাকা ও ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে বস্তি এলাকা এখন হামের হটস্পটে পরিণত হয়েছে।

জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সংসদ সদস্যের উদ্বেগের অনেকটাই যৌক্তিক, তবে সরকার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এটা সত্য, পোর্টাররা গত ৯ মাস আগে থেকে বেতন পান না। তবে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে বৈঠক হয়েছে। পোর্টারদের বেতন দেওয়া দুই–এক দিনের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শুরু হবে বলে জানান তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্য খাতে কর্মীসংকট থাকলেও মাঠপর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি চালানোর মতো সক্ষমতা রয়েছে। সরকার নতুন করে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের দিকেও যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকাকে হামের হটস্পট বলার বিষয়ে কিছুটা দ্বিমত জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তালিকায় পুরো ঢাকা শহর নয়, ১৮ জেলার কিছু কিছু উপজেলা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে বরগুনা, বরিশাল, ঝালকাঠি, চাঁদপুর, কক্সবাজার, মুন্সিগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গাজীপুর, যশোর, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, পাবনা, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর এবং ঢাকার নবাবগঞ্জ রয়েছে।

মন্ত্রী জানান, ৫ এপ্রিল থেকে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মসূচি চালানো হবে। ৩ মে থেকে সারা দেশে এই কর্মসূচি শুরুর কথা থাকলেও তা এগিয়ে আনা হয়েছে। ইউনিসেফ থেকে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা সম্ভব হওয়ায় কর্মসূচি আগানো গেছে বলে মন্ত্রী জানান।

সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বীকার করেন, টিকা সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত, ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং আগের সময়ের ব্যর্থতায় সম্প্রতি ভ্যাকসিনের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। এখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমি এই সংসদকে আশ্বস্ত করছি যে ভ্যাকসিনের মজুত এখন স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে।’

মন্ত্রী জানান, ভ্যাকসিন সংরক্ষণ ও পরিবহনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী কোল্ড চেইন বজায় রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সিঙ্গেল ডোজ ভায়াল থেকে মাল্টিডোজ ভায়ালে যাওয়া হচ্ছে, যাতে সংরক্ষণ সহজ হয়। সরকারি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কোভিডকালীন এডিবির মহামারি তহবিলের অব্যবহৃত ৬০৪ কোটি টাকা হাম-রুবেলাসহ জরুরি টিকা কেনার জন্য পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, ইউনিসেফের মাধ্যমে ৪১৯ কোটি টাকার ভ্যাকসিন ক্রয় প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে ২০০ কোটি টাকার চালান পাওয়া গেছে। টেন্ডার আহ্বান না করে সরাসরি ইউনিসেফের কাছ থেকে টিকা নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, টেন্ডারে সময় লাগে, দুর্নীতি হয়। সে জন্য সরাসরি ইউনিসেফের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে।

সংসদে টিকা বিতরণের হিসাবও দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, উচ্চ সংক্রমণ এলাকাগুলোতে সর্বশেষ ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ডোজ বিতরণ করা হয়েছে। প্রতি ভায়ালে ১০ ডোজ করে রয়েছে। আর হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের জন্য গ্যাভির মাধ্যমে সরকার প্রায় ২ কোটি ১৯ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে বলেও জানান তিনি।

সম্পূরক প্রশ্নে রুমিন ফারহানা বলেন, মন্ত্রী ‘অত্যন্ত সেনসিটিভ’ হয়ে গেছেন। মন্ত্রী ‘রোগীকে ভয় না দেখানোর’ যে কথা বলেছেন, তার জবাবে রুমিন বলেন, ‘আমি তো জানতাম, আমি ৩০০ জন সংসদ সদস্যের সামনে কথা বলছি। ৩০০ জন হামের রোগীর সামনে তো মাননীয় স্পিকার আমি কথা বলছি না।’ এরপর তিনি হামে শিশুমৃত্যুর পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ১৫ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ৯৮ জন শিশুর সন্দেহজনক হামে মৃত্যু হয়েছে, আর নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের।

এ প্রসঙ্গে একটি সংবাদপত্রের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, শুধু হাম নয়, ১০ রোগের টিকার সংকট দেখা দিয়েছে; ইপিআইয়ের কেন্দ্রীয় গুদামে কয়েকটি টিকার মজুত শূন্য, কিছু টিকার মজুত জুন পর্যন্ত চলবে।

জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, মৃত্যুর পরিসংখ্যান নিয়ে ‘ক্রসচেক’ করা দরকার। আপনার মুখেই কিন্তু একটু কন্ট্রাডিক্টরি বলেছেন। একখানে ৯৮টা মৃত্যুর কথা বলেছেন আবার নিশ্চিত মৃত্যুর কথা বলেছেন।’

মন্ত্রী দাবি করেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের যৌথ সমীক্ষায় এ পর্যন্ত ৪১ জনের মৃত্যু হামের কারণে নিশ্চিত হয়েছে।

আলোচনার এক পর্যায়ে মন্ত্রী আরও বলেন, মহাখালীর সংক্রামক রোগ হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের ওয়ার্ড পরিদর্শনে গিয়ে প্রথম শিশুমৃত্যুর পর তিনি কেঁদেছিলেন। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ টিকার মজুত নিয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার ‘শূন্য’ মজুত থেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে শুরু করেছে। তবে এখন অর্থের সংস্থান হয়েছে, মন্ত্রিসভায় ৬০৪ কোটি টাকা অনুমোদন হয়েছে এবং তা এডিবি হয়ে ইউনিসেফের কাছে যাবে বলেও সংসদকে জানান তিনি।