প্রথম আলো ফ্যাক্ট চেক

‘এখন অ্যাকশন নিতে পারছি না’—ভোক্তা অধিদপ্তরের কর্মকর্তার নামে ভুয়া বক্তব্য প্রচার

রমজানের আগের দিন পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারে অভিযানে গিয়ে ব্যবসায়ীদের তোপের মুখে পড়েছিলেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এই ঘটনার পর অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মণ্ডলকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ে। যাতে দাবি করা হয়, তিনি বলেছেন যে ব্যবসায়ীদের অবৈধ কাজের বিরুদ্ধে এখন আর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। তবে যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, এমন কোনো কথা তিনি বলেননি।

১৮ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজারে অভিযানকালে ছোলার দাম বেশি রাখার অভিযোগে দুই ব্যবসায়ীকে জরিমানা করতে গিয়েছিলেন ভোক্তা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তখন বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী ভুট্টো ও অন্য ব্যবসায়ীরা উত্তেজিত হয়ে হইচই শুরু করেন। তারপর ভোক্তা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা চলে আসেন।

সেই ঘটনার ভিডিওতে বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলীকে উত্তেজিতভাবে বলতে শোনা যায়, ‘আগের সভাপতি নেই, এখন সভাপতি আমি, আমরা জরিমানা দেব না, আপনার যা মন চায় করেন। আপনারা ব্যবসায়ীদের মানুষ মনে করেন না।’ আব্দুল জব্বার মণ্ডল বলছিলেন, ছোলার দাম বেশি রাখায় দুটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। তখন ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এসে হইচই শুরু করেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বললাম হইচই করার দরকার নেই, রমজানের আগের দিন দোকানপাটও বন্ধ করার দরকার নেই।’

এই ঘটনার পর আব্দুল জব্বার মণ্ডলকে নিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে একাধিক ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ে। তাতে আব্দুল জব্বারকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় স্বাধীনভাবে অবৈধ ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে অ্যাকশন নিতে পেরেছি, কিন্তু এখন আর পারছি না।’ আরেকটি ফটোকার্ডে অন্তর্বর্তী সরকারের জায়গায় আওয়ামী লীগ লিখে তা ছড়ানো হয়।

ফটোকার্ডগুলোতে সংবাদের কোনো সূত্র উল্লেখ করা হয়নি। জব্বার মণ্ডলের এমন বক্তব্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধান চালিয়ে আব্দুল জব্বার মণ্ডলের ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে ২১ ফেব্রুয়ারি একটি পোস্ট পাওয়া যায়। তাতে তিনি লেখেন, ‘আমার ছবির সঙ্গে আমার বক্তব্য বলে বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে, তা আমার নয়। এসব বক্তব্য আমি কোথাও কাউকে বলি নাই। এসব বক্তব্য বানোয়াট, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এই বক্তব্যগুলোর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’

প্রথম আলো জব্বার মণ্ডলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ফটোকার্ডগুলো তাঁর নজরে আসার পর তিনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে ফেসবুকে পোস্টটি দেন। অপতথ্য ছড়ানোর অভিযোগে ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি তেজগাঁও থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছেন।

হাসনাত আবদুল্লাহকে নিয়ে ভুয়া মন্তব্য প্রচার

‘পাকিস্তানকে ভালো লাগতেই পারে, ভারতকে ভালো নাই লাগতে পারে! উর্দু ভাষায় কথা বলতে শান্তি লাগে, তাই ইনকিলাব জিন্দাবাদ বলি’-জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠন, সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর নামে এমন একটি মন্তব্য ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ফটোকার্ড আকারে ফেসবুকে প্রচারিত এই দাবি টিকটকসহ অন্য প্ল্যাটফর্মেও দেখা যাচ্ছে। তবে যাচাই করে এর সত্যতা পাওয়া যায়নি।

হাসনাত আবদুল্লাহর ফেসবুক প্রোফাইলে ২১ ফেব্রুয়ারি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শিরোনামে একটি পোস্ট পাওয়া যায়। সেখানে পাকিস্তান, ভারত বা উর্দু ভাষা প্রসঙ্গে কোনো বক্তব্য নেই। ফটোকার্ডটির উৎস অনুসন্ধানে দেখা যায়, এটি বাংলাভিশনের ফেসবুক ফটোকার্ডের আদলে তৈরি একটি স্যাটায়ারধর্মী ফেসবুক পেজ ‘গজবভিশন’–এ প্রথম পোস্ট করা হয় ২২ ফেব্রুয়ারি। ‘গজবভিশন’ পেজের বর্ণনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে এটি একটি স্যাটায়ার পেজ এবং সেখানকার পোস্টগুলো নিছক বিনোদনের জন্য।

অর্থাৎ একটি স্যাটায়ার পেজের ব্যঙ্গাত্মক পোস্টকে হাসনাত আবদুল্লাহর বাস্তব বক্তব্য হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।

ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের নামে ভুয়া মন্তব্য প্রচার

ফেসবুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েমের নামে একটি ফটোকার্ড ছড়িয়েছে। সেখানে তাঁকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়েছে, ‘দাঁড়িপাল্লা হেরে যাওয়ায়, জুলাই হেরে গেছে। গোলাম আযমের ইনসাফের বাংলাদেশ আজ কাঁদছে।’

যাচাই করতে দাবি করা বক্তব্যের কি-ওয়ার্ড ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে এ–সংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদন মূলধারার কোনো সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়নি। সাদিক কায়েমের ফেসবুক আইডি পর্যালোচনা করেও এমন কোনো মন্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে থাকলে তা তাঁর ব্যক্তিগত আইডি বা গণমাধ্যমে প্রতিফলিত হওয়ার কথা। সুতরাং তাঁর নামে প্রচারিত মন্তব্যটি প্রামাণ্য নয়।

ছাত্রদল নেতা আবিদুলের নামে ভুয়া মন্তব্য প্রচার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খানকে উদ্ধৃত করে একটি মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়, তিনি বলেছেন, ‘ছাত্রদলে চাঁদাবাজি হয় এটা আমি অস্বীকার করছি না, তবে তাই বলে প্রজেক্টরের মাধ্যমে চাঁদাবাজির অভিযোগ দেখিয়ে এভাবে নোংরা রাজনীতি করা আমরা মেনে নেব না।’

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ‘Daily DUCSU’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে গত ২৮ জানুয়ারি প্রথম এই দাবি পোস্ট দেওয়া হয়। তবে পোস্টটিতে মন্তব্যটির উৎস, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বা কোনো ভিডিও/সংবাদসূত্র সংযুক্ত করা হয়নি। প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ করেও মূলধারার কোনো সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের বক্তব্যের সংবাদ পাওয়া যায়নি। আবিদুল ইসলামের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট পর্যবেক্ষণ করেও এমন কোনো মন্তব্যের অস্তিত্ব মেলেনি।

আবিদুল ইসলাম এমন কোনো বক্তব্য দিলে তা সংবাদমাধ্যমে আসার কথা। সুতরাং তাঁর নামে প্রচারিত মন্তব্যটি তথ্যনির্ভর নয়।