
দেড় বছরে নতুন করে দেড় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে। ৩৩ আশ্রয়শিবিরে মোট রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৪ লক্ষাধিক।
মিয়ানমারের রাখাইনে গণহত্যা থেকে প্রাণে বাঁচতে ৯ বছর আগের এই দিনে বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল রোহিঙ্গাদের ঢল। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে কয়েক সপ্তাহে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছিল।
এ দীর্ঘ সময়ে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। উল্টো গত দেড় বছরে নতুন করে ১ লাখ ৫৪ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা এই স্রোতে যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে মোট রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৪ লাখের বেশি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, কর্মহীনতা এবং অন্তহীন হতাশার সুযোগ নিয়ে উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ঘেরা জনবহুল ক্যাম্পগুলো কেবল বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়ের ঠিকানা নয়, এগুলো এখন পরিণত হয়েছে ভয়াবহ অপরাধের রাজ্যে। ৯ বছরে আশ্রয় শিবিরগুলোয় ঘটেছে ২৯২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। ১০টির বেশি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তার, টার্গেট কিলিং, অপহরণ, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান এবং মুক্তিপণ–বাণিজ্যে জিম্মি হয়ে পড়ছে স্থানীয় জনপদ।
এ অপরাধের আঁচ কেবল ক্যাম্পের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, এটি স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী ও উন্নয়ন সহযোগীদের ওপরও গভীর ছায়া ফেলেছে। ক্যাম্পের ভেতরের অপরাধ চক্রগুলোর বেপরোয়া চলাফেরার কারণে উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় সাধারণ মানুষের জীবন নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে। রাতে ক্যাম্পের আশপাশের সড়কে চলাচল সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাশাপাশি শরণার্থী সেবা কার্যক্রমে যুক্ত অর্ধশতাধিক দেশি-বিদেশি এনজিও কর্মকর্তা-কর্মচারী চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। প্রাণনাশের আশঙ্কা ও চাঁদাবাজদের হুমকির কারণে এনজিও কর্মীরা বিকেল চারটার আগেই ক্যাম্প এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা দীর্ঘ মেয়াদে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, আশ্রয়শিবিরে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীদের টার্গেট কিলিং ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। সন্ত্রাসীদের দমনে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলমান। প্রায় প্রতিদিনই অস্ত্রসহ সন্ত্রাসীরা ধরা পড়ছে। তবে যত দিন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ মাতৃভূমি রাখাইনে সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা না যাবে, তত দিন এ সংকট পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হবে না।
খুনোখুনি ও আধিপত্যের লড়াই
আশ্রয়শিবিরগুলোয় বর্তমানে মিয়ানমারের চারটি বড় সশস্ত্রগোষ্ঠীর পাশাপাশি পাঁচ-ছয়টি ছোট দল সক্রিয় রয়েছে। এদের মূল উদ্দেশ্য শিবিরের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের মুঠোয় রাখা, ইয়াবা-আইস ও অস্ত্রের রুট সচল রাখা এবং অর্থনৈতিকভাবে ফায়দা লুটা।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, গত ৯ বছরে ক্যাম্পগুলোয় ৫ হাজার ৬০৩টি মামলায় ১৫ হাজার ১৩৭ রোহিঙ্গাকে আসামি করা হয়েছে। কিন্তু মামলার সংখ্যা বাড়লেও থামেনি রক্তপাত। পুলিশ ও রোহিঙ্গা নেতারা জানান, আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে গত দুই বছরে তাদের মধ্যে অন্তত ১৯টি বড় সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় পক্ষের কমান্ডারসহ অন্তত ২৩ জন নিহত হয়েছে।
৯ বছরে ২৯২ খুন
২০১৭ থেকে চলতি বছর পর্যন্ত ক্যাম্পের অপরাধের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে নেপথ্য সংস্কৃতির ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়। ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গা ঢল শুরু হওয়ার পর প্রথম এক বছরে ক্যাম্পে কিছুটা শৃঙ্খলা বজায় থাকলেও পরের বছরে রোহিঙ্গা সশস্ত্রগোষ্ঠীর মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সূত্রপাত ঘটে এবং ওই সময় খুন হয় ২৩ জন। ২০১৯ সালে মাদক ব্যবসা (বিশেষ করে ইয়াবা) এবং সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর আধিপত্য বিস্তার শুরু হলে খুনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২–এ।
২০২০ সালে করোনার সময়েও সন্ত্রাসী তৎপরতা থামেনি, ওই বছর খুন হয় ১৬ জন। ২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে আরসা সন্ত্রাসীদের গুলিতে খুন হন রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা এবং ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ)’ চেয়ারম্যান মুহিবুল্লাহ। এর পরদিনই একটি মাদ্রাসার ৬ শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়। ওই বছর মোট ৩০ জন প্রাণ হারায়।
২০২২ সালে চাঁদাবাজি ও অপহরণ ব্যাপক রূপ নিলে খুনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪। আর ২০২৩ সাল ছিল ক্যাম্পের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত বছর—আরসা এবং আরএসওর মধ্যে ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নজিরবিহীন রক্তক্ষয়ী সংঘাতে নিহত হয় ৮৩ জন। ২০২৪ সালে ২২, পরের বছর ৩০ এবং চলতি বছরের ২০ আগস্ট পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২–তে। সব মিলিয়ে গত ৯ বছরে সরকারি নথি অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ২৯২।
তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, অনেক হত্যাকাণ্ডের পর ভয়ে বা দুর্গম পাহাড়ের আঁধারে মরদেহ লুকিয়ে ফেলার কারণে বহু গুম ও খুনের ঘটনা মামলা পর্যন্ত গড়ায় না। প্রকৃত অর্থে গত ৯ বছরে খুনের শিকার মানুষের সংখ্যা ৩২৫ ছাড়িয়ে যাবে।
অপরাধ তদন্ত ও বিশ্লেষণ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো জানিয়েছে, অপরাধের ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন আর শুধু চাঁদাবাজি নয়, শিশু অপহরণ এবং আধুনিক মোবাইল ব্যাংকিং প্রযুক্তি (বিকাশ ও নগদ) ব্যবহার করে মুক্তিপণ আদায়ের প্রবণতাও বেড়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স ফোরাম কক্সবাজার শাখার সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল শুক্কুর বলেন, গত ৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব না হওয়ায় তৈরি হয়েছে চরম হতাশা। আর এ থেকে জন্ম নেওয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অপরাধ সাম্রাজ্য ভেঙে দিতে না পারলে কক্সবাজারের এই জনপদ দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে পড়বে। প্রশাসনিক ও সামরিক কঠোর অভিযানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলের কূটনীতিকে সক্রিয় করে দ্রুততম সময়ে টেকসই প্রত্যাবাসনের পথ উন্মুক্ত করাই এই রক্তপাত ও অপরাধের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ।