আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান
আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান

ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন

কারফিউ ঘিরে আন্দোলনকারীদের ‘শেষ করে দেওয়া’ নিয়েও ফোনে সালমানের সঙ্গে কথা বলেন আনিসুল হক

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় কারফিউ জারি করার আগে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের একটি ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেছে প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ)।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২–এ আজ সোমবার আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানের ফোনালাপের কথোপকথনের লিখিত সংস্করণ তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে করা মামলায় আজ চতুর্থ দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার। এ সময় আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানের কথোপকথন তুলে ধরেন তিনি।

১ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডের সেই ফোনালাপে আনিসুল হক বলেন, ‘হ্যালো, হ্যাঁ বলেন।’ ‘আপনি ফোন করছিলেন’—প্রশ্ন করেন সালমান এফ রহমান। এর জবাবে আনিসুল বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি ফোন করেছিলাম। এখন কথা হচ্ছে যে, টু স্কুল অব থটস। একটা হচ্ছে যে আজকে রাত্রেই কারফিউ দিয়ে ওদেরকে শেষ করে দেওয়া। আরেকটা হচ্ছে যে, শুনতে পান?’

সালমান বলেন, ‘একটু হোল্ড করেন।’

তখন আনিসুল বলেন, ‘কে হোল্ড করবে আমি? আমাকে হোল্ড করতে বললেন?...ব্যাপারটা হচ্ছে আমার মনে হয় এগুলো টেলিফোনে আর বলা উচিত না। আরেকটা হচ্ছে ইউ নো গো ফর দ্য রিয়েল হার্ম।’

তখন সালমান বলেন, ‘নো, দ্য ফার্স্ট অপশন ইজ ওয়ার্কিং, দ্যাটস হোয়াট ইউ শুড ডু (না, প্রথম অপশনটি কাজ করছে, এটাই করা উচিত)।’

পরে আনিসুল বলেন, ‘দেন, মাই কলিগ মিস্টার কামাল সেস দ্যাট, ইউ নো দ্যাট দেন দ্য নর্থ সাইড হ্যাজ টু গেট ইনভলভড (আমার সহকর্মী কামাল বলেছেন, উত্তরপাড়ার লোকদের সম্পৃক্ত হতে হবে)। বুঝতে পারছেন?’

জবাবে সালমান বলেন, ‘হ্যাঁ, বুঝতে পারছি। দ্যাটস হোয়াট হি টোল্ড মি অলসো (তিনি আমাকেও এ কথা বলেছেন)।’

‘ফেরদৌস, আরাফাত টাকা দিব তো দূরের কথা, টেলিফোনও ধরে না’

আজকের যুক্তিতর্কে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজমের মোবাইল কথোপকথনের লিখিত সংস্করণও উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন।

২০২৪ সালের ২১ জুলাইয়ের সেই কথোপকথনে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘কোথায় তুমি?’ এর জবাবে মির্জা আজম বলেন, ‘আমি বাসায়। আপনি প্রেসের ব্রিফিং করলেন না?’ তখন কাদের বলেন, ‘আমি দুই–এক দিন না করি।’ তখন আজম বলেন, ‘ওহ, আচ্ছা। এখন নির্দেশনা আছে?’ কাদের বলেন, ‘নির্দেশনা কারফিউ কন্টিনিউ (চলবে) করবে।’

এ সময় আজম বলেন, ‘এই কারফিউর মধ্যে আমাদের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত আরও। এর জন্য টাকা দরকার।’ কাদের তাতে ‘হ্যাঁ’ বলে সম্মতি দেন। আজম আরও বলেন, ‘কারফিউ চলাকালীন সময়ে আমাদের কিছু প্রিপারেশন থাকা দরকার যে আমাদের কাছে যা ফুয়েল-টুয়েল ছিল সেগুলা কিন্তু সবার প্রায় শেষ। আজকে শেষের দিকে খুব বেকায়দায় ছিল।’ তখন কাদের বলেন, ‘সালমান (সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান) তো বলল পাঠাবে, কই?’

তখন আজম বলেন, ‘ওয়ার্ড পর্যায়ে লোক রাখতে হইলে টাকা দিতে হইব। আর এমপিরা কেউ কোনো টাকা খরচ করে না।…নানক (সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক) ভাই এলাকায় টাকা খরচ করে। তারপরে হচ্ছে নিখিলও টাকা খরচ করে। কিন্তু এই আরও অনেক এমপি আছে, এগুলা ধারে–কাছে খবর নেয় না।’

তখন কাদের বলেন, ‘না, ও তো উল্টা টাকা চায়। ইয়ে ধানমন্ডির ফেরদৌস।’ আজম বলেন, ‘ফেরদৌস, আরাফাত এগুলা এলাকায় টাকা দিবো তো দূরের কথা, তারা কারও টেলিফোনও ধরে না।’ এ সময় ‘আরাফাত ওস্তাদ’ বলে মন্তব্য করেন কাদের।

আজম বলেন, ‘আজকে হানিফ ভাইরে কিন্তু ওই আরাফাতের এলাকা দেখভাল করার জন্য দায়িত্ব দিছি।… হানিফ ভাইরে কইছি টাকা-পয়সা লাগলে আপনিই খরচ কইরেন।’

ওবায়দুল কাদের ছাড়াও এই মামলার অপর আসামিরা হলেন মোহাম্মদ আলী আরাফাত, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ। এ মামলার সব আসামিই পলাতক।