বাজারে এলপি গ্যাসের সংকট। মাটির চুলায় রান্না করছেন অনেকেই। গতকাল ডেমরায়
বাজারে এলপি গ্যাসের সংকট। মাটির চুলায় রান্না করছেন অনেকেই। গতকাল ডেমরায়

এলপিজির আমদানি বাড়াতে চেয়ে অনুমতি পাননি ব্যবসায়ীরা

চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি কমিয়ে দেয় কিছু কোম্পানি। পরে কিছু কোম্পানি আমদানি বন্ধ করে দেয়। তবে সক্রিয় কিছু কোম্পানি আমদানি বাড়াতে চেয়ে বারবার আবেদন করেও সরকারের অনুমতি পায়নি। ফলে এখন তৈরি হয়েছে সরবরাহ–সংকট।

এক সপ্তাহ ধরে বাড়তি টাকা দিয়েও এলপিজি পাচ্ছেন না গ্রাহক। চলমান এ সংকটের জন্য সরকারের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলছেন, তাঁদের বাড়তি আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়নি। আমদানি বাড়াতে পারলে সংকট তৈরি হতো না।

এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সূত্র বলছে, দেশে ২৮টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসা করে। এর মধ্যে ২৩টি কোম্পানির আমদানির অনুমোদন আছে। যদিও এখন মূলত ছয়টি কোম্পানি বেশির ভাগ এলপিজি আমদানি করে। আরও চারটি সীমিত পরিসরে আমদানি করে। অন্যগুলো গত ডিসেম্বর মাসে এলপিজি আমদানি করেনি। কোনো কোনো কোম্পানি চলছে ধুঁকে ধুঁকে। ব্যাংকঋণের কিস্তি শোধেও হিমশিম খাচ্ছে তারা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রতিটি কোম্পানির জন্য এলপিজি আমদানির পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। এর চেয়ে বেশি আমদানির সুযোগ নেই। তাই সক্ষমতা থাকলেও আমদানি বাড়াতে পারছে না তারা। আবার অনুমোদিত বরাদ্দের চেয়ে কম আমদানি করছে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে দেড় বছর ধরে বড় একটি কোম্পানির আমদানি অনেক কমেছে। আর ব্যাংকের লেনদেনজনিত জটিলতায় এলপিজি আমদানি করতে পারছে না আরও কয়েকটি কোম্পানি।

গতকাল রাতে যোগাযোগ করা হলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান প্রথম আলোকে বলেন, এলপিজির সংকট নেই। খুচরা বিক্রেতারা বাজারে সংকট তৈরি করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ভ্রাম্যমাণ অভিযান চালানো হবে। আর ব্যবসায়ীদের আমদানি বাড়ানোর অনুমতি দেবে বিইআরসি।

ট্রাক থেকে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার নামাচ্ছেন শ্রমিকেরা। শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বর, রাজশাহী

দুই বছরও অনুমতি পাওয়া যায়নি

প্রায় দুই বছর ধরে বাড়তি আমদানির অনুমতি পেতে জ্বালানি বিভাগে ঘুরছে শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ এলপিজি। এ কোম্পানির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, সিলিন্ডারে এলপিজি ভর্তি করতে তাঁদের চারটি প্ল্যান্ট আছে। এর মধ্যে মেঘনাঘাটের বৃহৎ প্ল্যান্টের জন্য বছরে আড়াই লাখ টন এলপিজি আমদানির অনুমতি আছে। এখানে আরও এক লাখ টন আমদানি করা সম্ভব। এর বাইরে মোংলায় ৯০ হাজার টন, বগুড়া ও ভালুকায় ৬০ হাজার করে দুটি এলপিজির প্ল্যান্ট আছে। প্রাথমিক অনুমোদন নিয়ে এ তিন প্ল্যান্টে সীমিত পরিসরে এলপিজি আনা হচ্ছে। ল্যাবরেটরি নেই বলে আমদানির চূড়ান্ত অনুমতি দিচ্ছে না সরকার।

৬০ হাজার টন থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ৩০ হাজার টন আমদানির অনুমতি চেয়েছে ডেল্টা এলপিজি লিমিটেড। তবে গত ১২ নভেম্বর জ্বালানি বিভাগ থেকে ওই কোম্পানিকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, বার্ষিক আমদানি বা উৎপাদন ক্ষমতা উন্নীতকরণের বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ না থাকায় ডেল্টার আবেদনটি বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলছে, নীতিমালা অনুসারে এলপিজি প্ল্যান্টে মান পরীক্ষার ল্যাবরেটরি বানাতে হবে। এটি না থাকায় নতুন প্ল্যান্টে আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তবে লোয়াব বলছে, দেশের কোনো প্ল্যান্টে ল্যাব নেই। ল্যাব ছাড়াই আগে সবাই অনুমতি পেয়েছে। দুই বছর ধরে এটি কঠোর করা হয়েছে। আর একই কোম্পানির প্রতিটি প্ল্যান্টে ল্যাব করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। একটি ল্যাব করতে অন্তত তিন কোটি টাকা খরচ হয়; বরং দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাধ্যমে সবার জন্য ল্যাব করা যেতে পারে। এসব ল্যাবে নিরপেক্ষ পরীক্ষা হবে।

এলপিজির সংকট নেই। খুচরা বিক্রেতারা বাজারে সংকট তৈরি করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ভ্রাম্যমাণ অভিযান চালানো হবে। আর ব্যবসায়ীদের আমদানি বাড়ানোর অনুমতি দেবে বিইআরসি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান
এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার

২৮টির মধ্যে আমদানি করে ১০ কোম্পানি

লোয়াব সূত্র বলছে, আমদানির জন্য ২৩টি কোম্পানির নিজস্ব টার্মিনাল আছে। গত ডিসেম্বরে আমদানি করেছে মাত্র ১০টি কোম্পানি—ফ্রেশ, ওমেরা, আই গ্যাস, যমুনা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি, টোটাল গ্যাস, সেনাকল্যাণ, ডেল্টা ও লাফস। ব্যাংক লেনদেনজনিত জটিলতায় আমদানি করতে পারছে না ওরিয়ন, বেক্সিমকো, এনার্জিপ্যাকের জি-গ্যাস, নাভানা ও এস আলম গ্রুপের ইউনিগ্যাস।

এলপিজি আমদানি বাড়ানোর আবেদন অনুমোদন করতে জরুরি অনুরোধ জানিয়ে গত বছরের ২১ আগস্ট জ্বালানি বিভাগে সর্বশেষ চিঠি দিয়েছে লোয়াব। তবে জ্বালানি বিভাগ এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর কিছু কোম্পানি একসঙ্গে এলপিজি আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। তাই যারা সক্রিয় আছে, তাদের আমদানি বাড়ানোর জরুরি অনুমতি দরকার, যাতে ভোক্তার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অব্যাহত থাকে। তাই দ্রুত অনুমোদনের জন্য অনুরোধ করা হয় চিঠিতে।

লোয়াবের সেক্রেটারি জেনারেল আহসানুল জব্বার প্রথম আলোকে বলেন, যথাসময়ে অনুমতি পেলে আমদানি আরও বাড়ানো যেত। যদিও বেশ কিছু কারণে বর্তমানে সরবরাহ–সংকট তৈরি হয়েছে। আর খুচরা বিক্রেতারা এর সুযোগ নিচ্ছেন।

বৈঠক শেষে জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, জাহাজসংকট—সব মিলিয়ে সরবরাহ কমেছে। সব অপারেটর সক্রিয় নয়, কেউ কেউ গত দেড় বছরে আমদানি কমিয়েছে। তাদের অনুমোদিত বরাদ্দ অন্যদের দিলে তারা আমদানি বাড়াতে পারবে।
গ্যাসের সংকট থাকায় বাড়ির আঙিনায় মাটির চুলায় রান্না করছেন এক গৃহিণী। দেওভোগ আখড়া, নারায়ণগঞ্জ

লোয়াবের সঙ্গে জ্বালানি বিভাগের বৈঠক

এলপিজির চলমান সংকট সমাধানে গতকাল রোববার বিকেলে লোয়াবের সঙ্গে বৈঠক করেছে জ্বালানি বিভাগ। এতে এলপিজি আমদানি নিয়ে সমস্যার কথা তুলে ধরেন ব্যবসায়ীরা। বৈঠক সূত্র বলছে, আমদানি বাড়ানোর অনুমতি চাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ও আমদানি পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) না রাখার প্রস্তাব করেছেন ব্যবসায়ীরা। তবে আমদানি পর্যায়ে ১৫ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছে জ্বালানি বিভাগ।

বৈঠক শেষে জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, জাহাজসংকট—সব মিলিয়ে সরবরাহ কমেছে। সব অপারেটর সক্রিয় নয়, কেউ কেউ গত দেড় বছরে আমদানি কমিয়েছে। তাদের অনুমোদিত বরাদ্দ অন্যদের দিলে তারা আমদানি বাড়াতে পারবে। এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্র খোলায় (এলসি) অগ্রাধিকার দিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে আরও আলাপ–আলোচনা করে ভ্যাটের বিষয় ঠিক করা হবে।

ভোক্তা পর্যায়ে বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম কেজিতে বাড়ল ৪ টাকা ৪২ পয়সা। চলতি জানুয়ারিতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা। গত মাসে দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা; অর্থাৎ জানুয়ারিতে ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ৫৩ টাকা।

রাতে লোয়াবের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শীতের জন্য জাহাজভাড়া বৃদ্ধি, ইউরোপে জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি ও কিছু কারণে সরবরাহ বিঘ্ন ঘটেছে। তবে বর্তমান মজুত সন্তোষজনক। আমদানি পর্যায়ে সর্বোচ্চ সীমা থাকবে না বলে জ্বালানি বিভাগের সঙ্গে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এদিকে কিছু খুচরা বিক্রেতা সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করছেন। এতে ভোক্তারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তাঁরা।

বর্তমান পরিস্থিত নিয়ে জ্বালানি বিভাগের সঙ্গে গত শনিবার জরুরি বৈঠক করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এরপর জ্বালানি বিভাগ থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, খুচরা পর্যায়ে এলপিজির বাজার স্বাভাবিকের চেয়ে ঊর্ধ্বমুখী। বর্তমানে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুত আছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নভেম্বরের চেয়ে ডিসেম্বরে এলপিজি আমদানি বেড়েছে। তাই এলপিজি সরবরাহ কমার যৌক্তিক কারণ নেই। এলপিজির দাম বাড়তে পারে; এটি জেনে খুচরা বিক্রেতারা এ সংকট তৈরি করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে স্থানীয় প্রশাসনকে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া ইতিমধ্যে এলসি সহজ করা, ভ্যাট কমাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংস্থাটি প্রতি মাসেই এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির কাজে। তবে এক সপ্তাহ ধরে প্রতি সিলিন্ডারে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি দাম নিচ্ছেন বিক্রেতারা।

এলপিজির নতুন দাম ১৩০৬ টাকা

ভোক্তা পর্যায়ে বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম কেজিতে বাড়ল ৪ টাকা ৪২ পয়সা। চলতি জানুয়ারিতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা। গত মাসে দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা; অর্থাৎ জানুয়ারিতে ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ৫৩ টাকা। গতকাল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ দাম ঘোষণা করেন বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। গতকাল সন্ধ্যা ছয়টা থেকে নতুন দর কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে।

সরকারি কোম্পানির সরবরাহ করা এলপিজির সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অন্যদিকে গাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজির (অটো গ্যাস) দাম প্রতি লিটার ৫৯ টাকা ৮০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মাসে তা ছিল ৫৭ টাকা ৩২ পয়সা।

সংস্থাটি প্রতি মাসেই এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির কাজে। তবে এক সপ্তাহ ধরে প্রতি সিলিন্ডারে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি দাম নিচ্ছেন বিক্রেতারা।

বাড়তি দামের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিইআরসির চেয়ারম্যান বলেন, ব্যবসায়ীরা বলেছেন, উৎপাদন পর্যায়ে তাঁরা নির্ধারিত দামেই পরিবেশকের কাছে বিক্রি করছেন। খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দামের বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালাচ্ছে। উৎপাদন পর্যায়ে বাড়তি দামের অভিযোগ এলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।