১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার পেছনে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়া, বয়সে বড় ছেলেদের সঙ্গে ‘অসম বন্ধুত্ব’, টিকটক ভিডিও তৈরির প্রলোভনের ঘটনাসহ নানা কারণ সামনে আসছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এসব কারণ নিয়ে আলোচনার চেয়ে প্যারেন্টিং বা সন্তান লালন-পালনে অপ্রতিমের মা–বাবা অবহেলা করেছেন, এটাই আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ফেসবুকে যে যাঁর মতো করে প্যারেন্টিং নিয়ে পরামর্শও দিচ্ছেন তাঁদের।
কিশোর ছেলের হাতে মা–বাবা কেন আইফোন দিলেন? সে মোটরবাইক কীভাবে চালাত? টিকটক ভিডিওতে ছেলে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করছে, তা মা–বাবা দেখেননি? কিশোর গ্যাং বা বখাটেদের সঙ্গে ছেলে মিশছে, তা কেন খেয়াল করেননি মা–বাবা? অনলাইন গেমের আসক্তির কথা জানতেন না? যখন জানতে পেরেছিলেন যে ছেলে বখে গেছে, তখন ছেলেটিকে নিয়ে তাঁরা কুমিল্লা ছাড়লেন না কেন বা দেশের বাইরে চলে গেলেন না কেন? এমন নানা প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে সদ্য সন্তান হারানো মা–বাবার দিকে।
ফেসবুকে শুধু অপ্রতিমের মা–বাবা নন, ছেলেটিরও নানা ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। বয়সের তুলনায় ছেলেটি কতটা পাকনা ছিল, কতটা বখাটে ছিল, এসব নিয়েও চলছে বিশ্লেষণ। এসব আলোচনার ভিড়ে সন্তান লালন-পালনে মা–বাবার অবহেলা থাকলে বা কোনো কিশোর বখাটেদের সঙ্গে মিশলেই তাকে হত্যা করা যায় কি না, এ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হারিয়ে যাচ্ছে।
অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সংকটের প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেও অনেকে ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন। অবশ্য গত রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পুলিশের প্রশংসা করে বলেছেন, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পারিপার্শ্বিক সব তথ্য-উপাত্ত দ্রুততম সময়ে উদ্ধার করা হয়েছে।
শিশু-কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, কিশোর অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড শুধু আইফোনের কারণে বা প্যারেন্টিংয়ের কারণে হয়েছে, এভাবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে অনেক কারণ দায়ী। তবে প্যারেন্টিং গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ‘ই’ প্রত্যয় যুক্ত করে বা মা–বাবার ঘাড়ে দোষ চাপানো যাবে না। বলা যায়, একেক সন্তানের জন্য একেক ধরনের প্যারেন্টিং প্রয়োজন হয়। কোনো পদ্ধতিকেই শতভাগ নির্ভুল বলার উপায় নেই। অর্থাৎ সবার জন্য একই সূত্র প্রযোজ্য হবে না। অথচ ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের মতো করে এই মা–বাবাকে দায় বা দোষ দিচ্ছেন, পরামর্শ দিচ্ছেন। ফেসবুক ব্যবহারকারীদের কেউ কেউ সদ্য সন্তান হারানো অপ্রতিমের মা–বাবাকে যেভাবে সন্তানের হত্যার জন্য দায়ী করছেন, অপমান করছেন, তা কোনো সভ্যতার মধ্যেই পড়ে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল অপ্রতিম। মা–বাবাও জানতেন যে ছেলে মায়ের আইফোন নিয়ে বাইরে যাচ্ছে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে। পরে ছেলে আর বাসায় ফেরেনি। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শনিবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিম মোবাইল অ্যাকসেসরিজের ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ছিল। মা–বাবার সঙ্গে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকায় থাকত সে।
রোববার দুপুরে এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান তাঁর কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে অভিভাবকদের আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সন্তান কখন, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কখন বাড়িতে ফিরছে—এসব বিষয়ে মা-বাবাকে খোঁজ রাখতে হবে। বিশেষ করে অল্পবয়সী সন্তানদের হাতে ফোন ও বিভিন্ন ডিভাইস দেওয়ার ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মায়ের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে অপ্রতিমকে জঙ্গলে নেওয়া হয়। ফোন নিতে বাধা দিলে বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়।
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর ফেসবুকে তার মা ছেলের সন্ধান চেয়ে পোস্ট দিয়েছিলেন। নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করতে কাজ করা সংগঠন ‘মুন অ্যালার্ট’ থেকেও অপ্রতিমের ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ফেসবুকে অসংখ্য মানুষ ছবিটি শেয়ার করে তাকে খুঁজে পেতে সহযোগিতা চান। থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন কিশোরের বাবা। তবে অপ্রতিমকে জীবিত খুঁজে পাওয়া যায়নি। অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় দেশের মানুষ বিশেষ করে মা–বাবারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। যদিও প্রতিনিয়তই অপ্রতিমের মতো নিখোঁজ হয়ে পরে হত্যার শিকার হচ্ছে শিশু–কিশোরেরা।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭ মাসে দেশে শিশু নিখোঁজ হওয়ার ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে (সবাইকে জীবিত উদ্ধার কি না, তা স্পষ্ট করা হয়নি)। এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশু নিখোঁজ। নিখোঁজ শিশুরা বেঁচে আছে কি না, সে তথ্য জানা নেই কারও।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে ৩৬ নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
শনিবার অপ্রতিমের লাশ উদ্ধারের আগে মুঠোফোনে কথা হয়েছিল অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগমের সঙ্গে। তখনো তিনি আশাবাদী ছিলেন যে ছেলে ঘরে ফিরবে। বলছিলেন, চাকরিসূত্রে কুমিল্লায় এসেছেন। ছেলে দুই বছর বয়স থেকে এখানে বড় হয়েছে। এই মায়ের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এ এলাকার কেউ তাঁর ছেলের কোনো ক্ষতি করবে না।
নাহিদা বেগম বুঝতে পারছিলেন যে ছেলের কিছু বাজে বন্ধু হয়েছে। ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্যও ছেলেকে বকা দিয়েছিলেন। ছেলেকে বাজে বন্ধুদের হাত থেকে বাঁচাতে বাসায় দুজন শিক্ষক রেখেছিলেন, যাতে ছেলে বাসায় বেশি সময় থাকে। তিন মাস ধরে ছেলের মধ্যে পরিবর্তনও লক্ষ করছিলেন। খুব একটা বাইরে যেত না। ভেবেছিলেন, সব বিপদ কেটে গেছে।
ছেলের মরদেহ উদ্ধারের পর এই মা বলেছিলেন, ‘তোরা আইফোন নিয়ে যেতি, কিন্তু আমার ছেলেকে খুন করলি কেন?’
বর্তমানে কিশোর বয়সী সন্তানকে অনেক মা–বাবা ভয় পান বা দূরত্ব তৈরি হয়, এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, একসময় এ বয়সী সন্তানকে নিয়ে মা–বাবার ভয় ছিল, কিছু বললে যদি আত্মহত্যা করে! আর এখন উদ্বেগের পাশাপাশি মা–বাবা ভয়ে থাকেন, সন্তান তাঁদের কোনো ক্ষতি বা শারীরিকভাবে আঘাত করবে কি না। আচরণগত পরিবর্তন ব্যাপকভাবে দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া সন্তানের মুখের ভাষা খারাপ হওয়া, রাতে না ঘুমানো, পড়াশোনা না করা, মুঠোফোনে আসক্তি ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে মা–বাবারা অস্থির হয়ে থাকছেন।
এই চিকিৎসকের মতে, জন্মের পরই সন্তানের সঙ্গে ভয়ের সম্পর্ক বা দূরত্ব তৈরি হয় না। সম্পর্কটা তৈরি হয় কোনো বিপর্যয়ের কারণে। তাই এ ধরনের সম্পর্ক তৈরির আগেই তা প্রতিরোধ করতে হবে। আর যদি সম্পর্কটা খারাপ হয়েই যায়, তখন সন্তানকে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে কাউন্সেলিং করানো প্রয়োজনে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে।
সন্তানদের বখে যাওয়া রুখতে সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোকে মজবুত করার পরামর্শ দিলেন চিকিৎসক হেলাল উদ্দিন আহমেদ। সার্বিকভাবে প্রতিটি শিশুর নিরাপদে ঘর থেকে বের হওয়া এবং নিরাপদে ফিরে আসার নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কিশোর সন্তানের হাতে প্রযুক্তি দেওয়া যাবে না, তা বলার উপায় নেই উল্লেখ করে হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, অনেক সময় সন্তানের পড়াশোনা, নিরাপত্তাসহ নানা কারণেই তাদের হাতে মুঠোফোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি তুলে দিতে হচ্ছে। তবে তার আগে তা পরিচালনা বা ব্যবহার করার জন্য সন্তানের সক্ষমতা আছে কি না, তা দেখতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারে সন্তান কতটুকু নিরাপদ, তা–ও দেখতে হবে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে ও পরে গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে গত রোববার স্থানীয় কবরস্থানে অপ্রতিমকে দাফন করা হয়। ছেলেকে শেষবিদায় দেওয়ার সময় বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘আর কাউকে যেন আমার মতো সন্তান হারাতে না হয়। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ কতটা কষ্টের, সেটা আজ বুঝতে পারছি।’ ছেলে হত্যার সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার চেয়েছেন এই বাবা।
গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে যখন অপ্রতিমের জানাজার প্রস্তুতি চলছিল, তখন প্রথম আলোর কুমিল্লা প্রতিনিধি আবদুর রহমান অপ্রতিমের সহপাঠী ইসমাইল হোসেনের কাছে সপ্তম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীসংখ্যা জানতে চেয়েছিলেন। ইসমাইল হোসেন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেছিল, ‘এখন ৫৩ জন, একজন তো কমেই গেল’।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ফাতেমা রেজিনা ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সন্তান হারানোর পর মা–বাবা কষ্ট পাচ্ছেন। এই মা–বাবার পাশে আমরা কয়জন দাঁড়াতে পেরেছি? অথচ ফেসবুকে একেকজন বিচারকের ভূমিকায় বসে আছেন। অনেকে ফেসবুকে মা–বাবার বিচার করা শুরু করেছেন, যা মোটেই ঠিক হচ্ছে না। বর্তমানে কোনো ঘটনা ঘটলেই ফেসবুক ব্যবহারকারীদের অনেকে এমন আচরণ করছেন। ভুক্তভোগী পরিবারের কষ্ট কমাতে না পারি, তারা আরও বেশি কষ্ট পাক, তা করা তো উচিত নয়।’